Published : 27 Aug 2025, 12:43 AM
লিফট ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এখন নিজস্ব উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে শিল্প গ্রুপ প্রাণ-আরএফএলের ব্র্যান্ড প্রপার্টি লিফটস।
শুরুতে বিদেশ থেকে আমদানি করা যন্ত্রাংশ দিয়ে লিফট তৈরি করলেও এখন ‘৮০ শতাংশ’ যন্ত্রাংশই নিজেরা উৎপাদন করছেন বলে আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরএন পাল জানিয়েছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “১৯৮৮ সালে লিফট আমদানির মাধ্যমে এ ব্যবসায় যাত্রা শুরু হলেও ২০১৮ সাল থেকে নরসিংদীর ডাঙ্গা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের নিজস্ব কারখানায় আন্তর্জাতিক সেফটি স্ট্যান্ডার্ড মেনে স্বল্প আকারে লিফট উৎপাদন শুরু করে প্রপার্টি লিফট। শুরুতে বিদেশ থেকে আমদানি করা ‘কম্পোনেন্ট’ দিয়ে লিফট তৈরি করলেও পরবর্তীতে ধীরে ধীরে কারখানায় বিনিয়োগ বাড়াই।
“মোটরসহ অন্যান্য কিছু দামি যন্ত্রাংশ চীন, স্পেন, জার্মানিসহ ইউরোপের কিছু দেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। ফলে ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের’ দিক থেকে মাত্র ৪০ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। আমরা মোটরসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ উৎপাদনের পরিকল্পনা করছি। তখন দেশেই লিফটের অধিকাংশ যন্ত্রাংশ তৈরি করা সম্ভব হবে।”
কোম্পানি কর্মকর্তারা বলছেন, ইতোমধ্যে নরসিংদীর কারখানাটিতে ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক মানের টেস্টিং ল্যাব, অ্যাসেম্বলিং প্যানেল ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছে। এতে কমেছে আমদানি নির্ভরতা, বেড়েছে উৎপাদনশীলতা এবং দামও সাশ্রয়ী হচ্ছে।

শনিবার ডাঙ্গা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে লিফট তৈরির প্যানেল ঘুরে দেখা যায়, সেখানে লিফটের কেবিন, হুইল বা চাকা, কালার কোটিংয়ের কাজ চলছে। একটি ল্যাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে কন্ট্রোল প্যানেলের দক্ষতা। সুইচ ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের মান যাচাইয়েও বেশ কয়েকটি ল্যাব সক্রিয় রয়েছে।
আর এন পাল বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে এ খাতে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি ক্রেতারা অবশ্যই বিশ্বমানের লিফট চান, যেখানে সেফটি সিকিউরিটি নিশ্চিত হবে, কিন্তু তারা এটাও চান কম দামে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী লিফট।
“একসময় লিফট বলতে কেবল আমদানিকৃত লিফটকেই বোঝানো হত। আমদানিকৃত লিফটের দাম যেমন বেশি, তেমনি পুরনো ভবনে কাস্টমাইজড লিফট বসানোর সুযোগও সীমিত ছিল। অনেকে ৪ তলা বাড়ি কিংবা ৩ তলা একটি মার্কেটের জন্য সাশ্রয়ী মূল্য লিফট চান। আমরা সেই বাস্তবতায় দেশে লিফট তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেই।”
এ কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের বিশ্বাস ছিল দেশে মূল্য সংযোজন বাড়িয়ে লিফট উৎপাদন করতে পারলে দাম কমে আসবে। লিফটের ব্যবহারও অনেকাংশে বেড়ে যাবে। এখন আমরা ভোক্তার পছন্দের কাস্টমাইজড লিফট সহজে সরবরাহ করতে পারছি। এটি সম্ভব হয়েছে দেশে কারখানা হওয়ার ফলে।”
বর্তমানে পায়রা থার্মাল পাওয়ার প্লান্ট, কোরিয়ান ইপিজেড, বে ইকোনোমিক জোন, ইউএন আইএলও অফিস, ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো লিমিটেড, পিডিএল পদ্মা রিসোর্ট, চট্টগ্রাম আর্মি মেডিকেল কলেজসহ অসংখ্য জায়গায় প্রোপার্টি লিফট ব্যবহার হচ্ছে বলে কোম্পানির পক্ষ বলা হচ্ছে।

বাংলাদেশে ব্যবহার হওয়া লিফটের প্রায় ৭০-৮০ ভাগ এখনও আমদানি করা। প্রপার্টি লিফটস ছাড়াও দেশে বর্তমানে লিফট তৈরি করছে ওয়ালটন। তবে দেশীয় কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড মেনে উন্নতমানের লিফট সরবরাহ করতে শুরু করায় বিদেশ থেকে আমদানির প্রবণতা ক্রমছে।
বাজারে এখন প্যাসেঞ্জার লিফট, কার্গো লিফট, হাসপাতাল লিফট, হোম লিফট, ক্যাপসুল লিফট, হাইড্রোলিক লিফট ও সিজার লিফট পাওয়া যায়। ধারণক্ষমতা ও ফিচারের ওপর ভিত্তি করে এসব লিফটের দাম ১৫ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত। ‘সমমানের’ আমদানিকৃত লিফটের তুলনায় দেশে উৎপাদিত লিফটের দাম কম।
দেশে লিফট উৎপাদন ছাড়াও বর্তমানে প্রপার্টি লিফটস বিশ্বসেরা ‘কোনে, ম্যাকপুয়ার্সা ও এসআরএইচ’ লিফটের একমাত্র বাংলাদেশি পরিবেশক। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছু ‘ইলেকট্রোমেকানিক্যাল’ উপাদান বাদ দিলে প্রায় সব কিছুই দেশে তৈরি সম্ভব, আর সেটি করলে উৎপাদন খরচও আরও কমে আসবে, চাহিদাও বাড়বে।
প্রপার্টি লিফটসের কারখানা ঘুরে দেখা যায়, সেখানে ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল দুই ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। লিফটের তার ছিড়ে গেলে বা গতি বেড়ে গেলে লিফটগুলো স্বয়ংক্রিয় ব্রেকিং সিস্টেম চালু হয়ে যায়। কারখানায় আধুনিক টেস্টিং টাওয়ার রয়েছে, সেকেন্ডে ৩ মিটার গতিতে সেখানে লিফট পরীক্ষা করা যায়। কারখানাটিতে বর্তমানে ২১০ জন কর্মী কাজ করছেন। ‘ইনস্টলেশন’ ও ‘সার্ভিসিংয়ে’ রয়েছেন হাজারো মানুষ।
প্রপার্টি লিফটসের চিফ অপারেটিং অফিসার মঈনুল ইসলাম বলেন, দেশের বাজার ছাড়াও রপ্তানির দিকে নজর দিচ্ছে প্রপার্টি লিফটস। এ বছর থেকেই জার্মানি, ইউরোপ ও আমেরিকার মেলায় অংশ নেবে কোম্পানিটি।