‘রয়েসয়ে’ চামড়া ছাড়ছেন পোস্তার আড়তদাররা, বেশির ভাগই ক্রেতার অপেক্ষায়
পুরান ঢাকার পোস্তায় মাহবুব অ্যান্ড ব্রাদার্সের আড়ত থেকে লবণ মাখানো চামড়া তোলা হচ্ছে ট্রাকে; গন্তব্য সাভারের বিএস ট্যানারি। দুটি ট্রাকে করে পর্যায়ক্রমে চামড়া নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
ঈদের চারদিন পর বৃহস্পতিবারই এ আড়ত কোরবানির পশুর চামড়ার ক্রেতা পেলেও বেশির ভাগ আড়ত এখনও দরদাম আর যোগাযোগের পর্যায়েই রয়ে গেছে।
কাঁচা চামড়া সংগ্রহকারী দেশের সবচেয়ে বড় আড়ত পোস্তা এলাকায় গত দুই দিন ঘুরে দেখা গেছে, সরবরাহ কম থাকায় কেনার সময় গতবারের চেয়ে এবার দাম একটু বেশি দিতে হয়েছে; যে কারণে ব্যবসায়ীরা বিক্রির বেলায় একটু রয়েসয়ে বাজার যাচাই করে চামড়া ছাড়ার চেষ্টায় আছেন।
ট্যানারির প্রতিনিধিরাও বিভিন্ন আড়তে গিয়ে দরদাম করছেন। দামে বনিবনা হলে সাভারের হেমায়েতপুরে শিল্পনগরীতে চামড়া নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু করেছেন। অনেকে আড়তদারদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে রাখছেন, নিয়মিত খবরাখবর নিচ্ছেন।
আড়তদারদের কেউ কেউ আবার সাভারে গিয়ে ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে দর নির্ধারণের বিষয়ে কথা বলছেন।
এরমধ্যে কিছু ট্যানারি গত বুধবার রাত থেকে কেনা শুরু করে। বৃহস্পতি ও শুক্রবার কিছু আড়ত থেকে চামড়া ট্রাকে তুলতে দেখা যায়।
তবে শুক্রবার দেশের বিভিন্ন এলাকায় চামড়ার বড় হাট বসায় ট্যানারিগুলোর নজর সেদিকেই ছিল বেশি। পোস্তার আড়তদাররা আশা করছেন, আগামী রোববার থেকে তাদের চামড়া দেখতে আসা শুরু করবেন ট্যানারি মালিকরা।
পোস্তার আড়তদারদের একজন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আফতাব খান। তিনি সাভারের এক রপ্তানিকারক ট্যানারির সঙ্গে বৃহস্পতিবার আলোচনা করে এসেছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ‘‘আশা করছি এবার চামড়ার দর নিয়ে খুব একটা ঝামেলা হবে না। সরকার যে দাম ঠিক করে দিয়েছে সেই রেট মোতাবেকই সবাই কিনবে। এতে সব পক্ষই লাভবান হবে।
শুধু দামে বাড়তি নয়, এবার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী পোস্তার আড়তদাররা চামড়া সংগ্রহ করতে পারেননি। ব্যবসায়ীরা দেড় লাখ গরুর চামড়া কেনার প্রস্তুতি নিলেও এখন পর্যন্ত প্রায় লাখ খানেক সংগ্রহ করতে পেরেছেন বলে জানিয়েছেন সংগঠনের নেতারা।
ঈদের দিন এবার গরুর চামড়া পাইকাররা কিনেছেন আকার ও অবস্থাভেদে গড়ে ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায়। ছোট আকারের গরুর চামড়া ৩০০ টাকাতেও বিক্রি হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় আকারের চামড়া বিক্রি হয় ৮০০ টাকায়।
কাঁচা চামড়া সংগ্রহের শেষের দিকে পোস্তায় চামড়া আসার পরিমাণ কমে যাওয়ায় ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হওয়ায় চামড়াটি আড়তদাররা কিনেছিলেন ১৩৫০ টাকা পর্যন্ত দরে।
পুরো বছরের চামড়া সংগ্রহের বড় একটা অংশের যোগান আসে কোরবানি পশুর চামড়া থেকে। তবে আড়তদার ছাড়াও ট্যানারিগুলো নিজেরাই এবং ফরিয়া ও মজুদদারদের কেউ কেউ লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ শুরু করায় দেশের সর্ববৃহৎ এ আড়তগুলোতে চামড়া আসছে কম। একই কারণে এবার বিভিন্ন জেলা ও আড়ত থেকেও চামড়া আসছে কম।
এরমধ্যে রোববার ঈদের দিনে বেশির ভাগ কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেন পোস্তার আড়তদাররা বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব টিপু সুলতান।
সরকারের বেঁধে দেওয়া দর অনুযায়ী, ট্যানারি ব্যবসায়ীদের এবার ঢাকায় লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া কিনতে হবে ৪৭ থেকে ৫২ টাকায়। আর ঢাকার বাইরে এই দাম হবে ৪০ থেকে ৪৪ টাকা। দুই ক্ষেত্রেই গতবারের চেয়ে দাম বেড়েছে ৭ টাকা।
এছাড়া লবণযুক্ত খাসির চামড়া সাড়া দেশে ১৮ থেকে ২০ টাকায় কিনবে ট্যানারি, যা আগেরবারের চেয়ে ৩ টাকা বেশি।
পোস্তার চামড়া যাচ্ছে অনেক দেরিতে
লালবাগে শুধু ঈদের মৌসুমে কাঁচা চামড়ার ব্যবসা করেন হাজী মো. সারোয়ার্দি। কাজী রিয়াজ উদ্দিন রোডে তার আড়তে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি লবণের বস্তা স্তুপ করে রাখা হয়েছে। চামড়ার সরবরাহ কমে যাওয়ায় কাজে লাগানো যায়নি। যতটুকু কাঁচা চামড়া মজুদ করা হয়েছে তা নিয়ে কর্মচারিরা বসে আছেন ট্যানারির ক্রেতার অপেক্ষায়।
২০২১ সালের ঈদে ১০ হাজার কাঁচা চামড়া কেনা আনোয়ারুল ওহাব অ্যান্ড ব্রাদার্সের পরিচালক তারিক ইবনে আনোয়ার এবার কিনতে পেরেছেন প্রায় চার হাজার।
ভালো দাম পাওয়ার আশায় আরও কয়েকদিন বাজার দেখেই বিক্রির সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান তিনি।
ব্যবসায়ীরা জানান, আগে সাধারণত ঈদের পর থেকে দুই মাসের মধ্যেই এখানকার চামড়া বিক্রি হয়ে যেত। দরদাম শুরু হয়ে যেত ঈদের পরপরই। দর চূড়ান্ত হলে ট্যানারিগুলো ধীরে ধীরে আড়ত থেকে লবণ মাখানো চামড়া নেওয়া শুরু করত।
আড়তদাররা বলছেন, গত কয়েক বছর এমন হচ্ছে না। পোস্তার চামড়া ট্যানারি মালিকরা কিনছেন একেবারেই শেষের দিকে।
এতে করে তারা দাম কম পান জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের কাছে চামড়া দুই মাসের বেশি সংরক্ষণ করা যায় না। কেননা এ সময়ের পর থেকে চামড়ার গঠন নরম হতে শুরু করে।
কাঁচা চামড়া সংগ্রহে ট্যানারি
এবার ঢাকার বাইরে মজুদ লবণ মাখানো চামড়া পোস্তায় খুব একটা আসেনি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
কারণ জানতে চাইলে অনেকের মত আড়ত ব্যবসায়ীদের সংগঠনের মহাসচিব টিপু সুলতান বলেন, ‘‘সাভারের ট্যানারি এলাকার আশপাশে কিছু মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া মজুদ করেছে। ট্যানারি মালিকরাও সরাসরি চামড়া কেনা শুরু করায় পোস্তায় চামড়া আসেনি ঈদের পর।’’
ট্যানারিগুলো বৃহস্পতিবার থেকে দেশের চামড়ার আড়ত এবং হাট থেকেও লবণযুক্ত চামড়া কেনা শুরু করেছে।
এবার ৯৯ লাখ ৫০ হাজারের বেশি পশু কোরবানি হয়েছে ঈদের প্রথম দিনে বলে জানিয়েছে প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তর।
দেশে সংগ্রহ করা চামড়ার মাত্র ২০ শতাংশ দেশীয় চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হয় জানিয়ে ব্যবসায়ী নেতা টিপু সুলতান বলেন, অবশিষ্ট ৮০ শতাংশই প্রক্রিয়াজাত করে ফিনিশড লেদার হিসেবে রপ্তানি করে ট্যানারিগুলো।
রপ্তানির তথ্য অনুযায়ী, মহামারীর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে প্রায় ১০২ কোটি ডলার আয় এসেছিল। পরের অর্থবছরে তা ৭৯ কোটি ৭৬ লাখ ডলারে নেমে যায়।
তবে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে এ খাতে আয় বেড়ে ৯৪ কোটি ১৬ লাখ ডলার হয়। আর গত ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ১২৪ কোটি ৫১ লাখ ডলারের চামড়া ও চামড়া জাতীয় পণ্য রপ্তানি হয়েছে; প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩২ শতাংশ।
