তরঙ্গ নিলামের আগে আলোচনা চায় মোবাইল অপারেটররা
সামনের দিনগুলোতে দেশে মোবাইল ইন্টারনেটের চাহিদা এখনকার কয়েকগুণ বাড়বে হিসাব দিয়ে অপারেটররা অনেকটা পাইকারি দরে বেশি পরিমাণে তরঙ্গের বরাদ্দ চাইছেন।
মোবাইল টেলিকম প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় স্পেকট্রাম বা তরঙ্গ নিলামের এক সপ্তাহ আগে এ বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেছে দেশের তিনটি শীর্ষ মোবাইল অপারেটর। কোম্পানিগুলো বলছে, নিলামের আগে তারা আরও আলোচনা চায়।
পাশাপাশি সামনের দিনগুলোতে দেশে মোবাইল ইন্টারনেটের চাহিদা এখনকার কয়েকগুণ বাড়বে হিসাব দিয়ে অপারেটররা অনেকটা পাইকারি দরে বেশি পরিমাণে তরঙ্গের বরাদ্দ চাইছেন।
দেশের মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন এমটব আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা এমন দাবি জানান। বুধবার রাজধানীর বনানীতে এমটব কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন- গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ, রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম এবং বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন এমটব মহাসচিব মোহাম্মদ জুলফিকার।
সংবাদ সম্মেলনে টেলিকম অপারেটরদের প্রতিনিধিরা তরঙ্গের মূল্য, মেয়াদ, বিনিয়োগ সক্ষমতা, নেটওয়ার্কের মান এবং গ্রাহকসেবার ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে একটি উপস্থাপনায় রবির সাহেদ আলম বলেন, “দেশের মোবাইল অপারেটরগুলোর আয় এক জায়গায় স্থির হয়ে আছে। এর মধ্যে স্পেক্ট্রামের দাম বেশি হলে অপারেটরগুলো তা কিনতে পারবে না এবং অনেক স্পেকট্রাম অব্যবহৃত থেকে যাবে। তখন অপারেটররা ইক্যুপমেন্ট বাড়িয়ে ওই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করবে। তাতে নেটওয়ার্কের মানও কমবে এবং দামও বেড়ে যেতে পারে।”
তার ভাষ্য, তরঙ্গের দাম কমালে অপারেটররা কিনবে বেশি (বাল্ক) পরিমাণে। তাতে সরকারের রাজস্ব উল্টো বেড়ে যাবে। আগামী দিনের ইন্টারনেট চাহিদা পূরণে অনেকটা পাইকারী দরে অপারেটরদের তরঙ্গ বরাদ্দ দেওয়ার কথাও তোলেন তিনি।
আগামী দশ বছরের মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেটের চাহিদা ৩০ গুণ বাড়বে এমন পূর্বাভাস দিয়ে সাহেদ আলম বলেন, “এক দেড় বছর আগেও আমাদের গ্রাহক প্রতি মাসে ইন্টারনেটের ব্যবহার ছিল ৬ দশমিক ৫ জিবি এখন যেটা ৯ জিবিতে চলে এসেছে। কারণ এখন মানুষ রিলস দেখছে, মাইক্রো নাটক, বিভিন্ন ধরণের এআই সলিউশন ব্যবহার করছে। আমাদের পূর্বাভাসটা হচ্ছে ২০৩৫ সাল নাগাদ ইন্টারনেট ডেটার ব্যবহার এখনকার চেযে ৩০ গুণ বৃদ্ধি পাবে। এখন প্রশ্নটা হচ্ছে এই চাহিদার জন্য আমরা প্রস্তুত কী না।”
তিনি একটি হিসাব দিয়ে বলেন, ১৮০০ ব্যান্ডের প্রতি মেগাহার্জ স্পেকট্রাম ১৫ বছরের জন্য বরাদ্দের দর ১৯৮ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে এটা অনেক বেশি। স্পেক্ট্রামের অতিরিক্ত দাম ছাড়াও টেলকো খাতের অন্যান্য কর ও শুল্কও অনেক অনেক বেশি। দেখা যাচ্ছে, টেলিকম অপারেটরদের প্রতি ১০০ টাকা আয়ে ৫৬ টাকা সরকারের কাছেই চলে যায়।
এমটব মহাসচিব মোহাম্মদ জুলফিকার বলেন, “প্রথমত বিটিআরসি একটা স্টাডি করে আমাদের সামনে একটা প্রাইজ নিয়ে এসেছে। আমরা এরকম স্টাডিকে স্বাগত জানাই। কিন্তু কোন যুক্তিতে, কীভাবে তারা এই প্রাইজে উপনীত হল সেটা আমরা জানি না। কারণ স্টাডিটা প্রকাশ করা হয়নি। তাই আমরা বলছি আমরা কিছু জানি না, আমরা এই দামটা নিয়ে কনসালটেশন (আলোচনা) চাচ্ছি।”
গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, “একটি উপযুক্ত মূল্যায়ন পদ্ধতির ভিত্তিতে আরও যুক্তিযুক্ত নবায়ন মূল্য এবং নমনীয় পরিশোধের শর্তাবলীর জন্য আমরা বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি। স্পেকট্রাম নবায়ন কেবল রাজস্ব আদায়ের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যতের জন্য একটি বিনিয়োগ।"
বাংলালিংকের তাইমুর রহমান বলেন, “সেবার মান, নেটওয়ার্কের ধারণক্ষমতা ও সারা দেশে কভারেজ নিশ্চিত করতে স্পেকট্রাম অপরিহার্য। বাংলাদেশ যখন ভয়েস থেকে ডেটার দিকে অগ্রসর হচ্ছে তখন স্পেকট্রামের চাহিদা সূচকীয় হারে বাড়ছে, অথচ অপারেটরদের রাজস্ব সেই অনুপাতে বাড়ছে না।”
টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে সবগুলো মোবাইল অপারেটর মিলে ৪৬৩ মেগাহার্টজ তরঙ্গ ব্যবহার করছে। এর মধ্যে আগামী নভেম্বরে গ্রামীণফোনকে ৩২ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ, রবিকে ২৯ দশমিক ৪ এবং বাংলালিংককে ২১ মেগাহার্টজ তরঙ্গ নবায়ন করতে হবে।
গত জানুয়ারিতে ৭০০ ব্যান্ডের ২০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ নিলামে তোলা হলেও চড়া দামের কারণে রবি ও বাংলালিংক নিলাম থেকে সড়ে দাঁড়ায়। শুধু গ্রামীণফোন ১০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ ২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকায় কিনে নেয়।
পরে অব্যবহৃত ১০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ প্রায় বিনামূল্যেই রাষ্ট্রায়ত্ত অপারেটর টেলিটককে বরাদ্দ দেয় সরকার। এ নিয়ে অপারেটরগুলোর মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নষ্ট হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তাদের দাবি, সরকার দাম না কমালে এবারও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ তরঙ্গ অবিক্রীত থেকে যেতে পারে। দাম কমালে তরঙ্গের ব্যবহার বাড়বে, যা সেবার মান ও পরোক্ষ রাজস্ব দুইই বাড়াবে।
