১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ডিমের বাজার ফের অস্থির, ‘দামের এসএমএস’ এখনও

“এটা (এসএমএস) আমাদের কেউ দেয় না, বরং এটা ধরার জন্য চেষ্টা করছি,” বলেন তেজগাঁও ডিম সমিতির সম্পাদক হানিফ।

আবুল বাসার সাজ্জাদ

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 26 Jun 2024, 12:31 AM

Updated : 10 Sep 2026, 12:09 PM

কোরবানির ঈদের সপ্তাহান্তে ডিমের দাম ফের চড়েছে। ব্যবসায়ীরা এর কারণ হিসেবে চাহিদা-যোগানের পুরনো তত্ত্ব হাজির করলেও খামারিরা দেখছেন ‘সিন্ডিকেটের’ হাত। 

ঈদের সময় ডিমের দাম ২ টাকা করে কমলেও এক সপ্তাহ পর দাম বেড়েছে দেড় টাকা করে। সোমবার একটি ডিম কিনতে ভোক্তাদের গুনতে হয়েছে সাড়ে ১৪ টাকা।

ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদের আগে ১০০ ডিমের দাম ছিল ১২৫০ টাকা। আর ঈদের সময় থেকে পরবর্তী পাঁচ দিন দাম নেমেছিল ১০৫০ টাকায়। তবে রোববার থেকে দুই দিনে ১০০ টাকা বেড়ে হয়েছে ১১৫০ টাকা।

ঢাকার তেজগাঁওয়ের তেজকুনিপাড়ায় ডজন হিসাবে ১৬০ টাকায় এবং হালি হিসাবে ৫৫ টাকা দরে ডিম বিক্রি করছেন ওয়াজউদ্দিন। 

তিনি বলেন, “এখন ডিমের দাম আগের মত একটু বাড়তেছে। তেজগাঁওয়ে পাইকারিতে লাল ডিম ডজন প্রতি বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়, আর সাদা ডিম ১৪০ টাকায়।”

তেজগাঁও রেলগেইট এলাকা থেকে বেছে বেছে ভাঙা ডিম খুঁজছিলেন আঁখি আক্তার। 

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ভালো ডিমের দাম তো বেশি। তাই ভাঙ্গা ডিম নিমু। একটু পরতা পরব। ফার্মগেটের এদিকে একটা মেসের জন্য ভাঙ্গা ডিম খুঁজতাছি। এগুলা আবার বেশিদিন রাখাও যায় না।”

আঁখি ৪৫টি ভাঙা ডিম কিনেছেন ৩৩০ টাকা দিয়ে। সেই হিসাবে প্রতিটি ডিমের দাম পড়ে সাড়ে সাত টাকা করে। 

আঁখি বলেন, “আগে ভালো ভালো ডিম কিনতে পারছি ৮ টাকা দিয়া। আর এহন ভাঙ্গা ডিম কিনি এই দামে। দাম আরও বাড়লে পরে ভাঙ্গা ডিমও মেসে দেওন যাইব না।”

পাইকারি ডিম বিক্রেতা আরিফ হোসেন বলেন, “আজ আর গতকাল দুই দিনে ১০০ ডিমের দাম ৮০ টাকার উপরে বাড়ছে। আর প্রতি ডিমে বাড়ছে ৮০ পয়সার উপরে। 

“ডজন হিসেবে বললে এখন বেচি ১৫০, আর দুই দিন আগে বেচছি ১৪০ টাকায়।” 

আরিফ বলেন, “ঈদের সময়ে মানুষ অনেক মাংস খাইছে। তখন ডিমের চাহিদা কম ছিল। আর এখন মাংসের চাহিদা শেষ। এবার ডিম খাচ্ছে মানুষ। তাই ডিমের দাম বাড়ছে। আমাদের কেনা পড়ছে বেশিতে, তাই বিক্রিও একটু বেশিতে করতে হচ্ছে।”

দাম কারা বাড়াচ্ছে- এমন প্রশ্ন শুনে তিনি বললেন, “যারা খামারিদের থেকে কিনে, মানে মিডিয়া বলা হয় যাদেরকে, তারাই দামটা বাড়ায় মূলত। আর যেসব বড় বড় কোম্পানি রয়েছে- এদেরও হাত থাকতে পারে।”

পাইকার আরিফের ভাষ্য, “ঈদের আগে ডিমের যে উচ্চ দাম ছিল সেটা এখনও ছোঁয়নি, তবে আগামী দুই দিনে ছুঁয়ে যেতে পারে।এখন ডিমের চাহিদা বাড়তেছে। হু হু করে দাম বাড়বে।”

কারওয়ান বাজারের ডিম বিক্রেতা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রতি হালি লাল ডিম ৫০ টাকা করে বিক্রি করছেন তিনি; সাদা ডিম ৪৮ টাকা করে। গত দুই দিনে হালিতে অন্তত ৩ টাকা বাড়ছে।

ডিমের দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার বলেন, “সব কিছুতে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে পণ্যের দাম বাড়ে। কিন্তু ডিমের দাম বাড়ে সিন্ডিকেটের কারণে। করপোরেটদের তো হাত আছেই। কিন্তু প্রধান দায় তেজগাঁও ডিম সমিতির। 

“তারা ঈদের পাঁচ দিন দাম কমিয়েছিল। আর এই কম দামে ডিম সংগ্রহ করে রেখেছিল। এবার দাম বাড়িয়ে তাদের সংগ্রহ করা ডিম বাজারে ছাড়তে শুরু করেছে।”

তেজগাঁও ডিম সমিতির হাতেই ‘ডিমের বাজারের নিয়ন্ত্রণ’ মন্তব্য করে সুমন বলেন, “বিভিন্ন জায়গার ব্যবসায়ীদের তারা শুধু জানিয়ে দেয় আজ এত টাকা, কাল এত টাকা। এখানের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তারা দিনে ও রাতে বাজার বসায়।

“দিনের বাজার ঠিক আছে। ঘোষণা অনুযায়ী ডিম বেচাকেনা হয়। কিন্তু রাতের বাজারে খামারির কাছ থেকে আনা ডিমের দাম তারা বসিয়ে দেয়।”

অভিযোগ অস্বীকার করে তেজগাঁও ডিম সমিতির সাধারণ সম্পাদক হানিফ মিয়া বলেন, “আমরা কখনও ডিমের দাম নির্ধারণ করি না। এই দাম ক্রেতারা নির্ধারণ করে। কেনাবেচার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।” 

তিনি বলেন, “খামারিদের থেকে গতকাল যে দামে কেনা হয়, সেটা আজ আমরা বিক্রি করি। আর কেনে তো সরবরাহকারীরা। তেজগাঁওয়ে সোমবার প্রতি ১০০ ডিম ১১২০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।”

‘মোবাইলে মেসেজ আসে’

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার খামারি নুরুল ইসলাম বলেন, “তেজগাঁও ডিম সমিতি থেকে প্রতিদিন মোবাইলে মেসেজ আসে যে আজ এতটাকা করে ডিমের দাম। আজ বাড়ছে বা কমছে। সেই মেসেজ অনুযায়ী সরবরাহকারীরা আমদের ডিম কেনে। মানে তারাই মেসেজ দেয়, তারাই কেনে। 

“দামটা তো তারাই ঠিক করে। আমরাও তাই মেনে চলি। কারণ এর বাইরে আর কোথায় যাব? তারা যা বলবে, সেটাই বাজার। যদি বলে আজ ১০০ টাকা কমছে, এটাই বাজার।”

নুরুল ইসলামের খামারে ৩৩০০ মুরগি আছে। প্রতিদিন সেখান থেকে গড়ে ২৭০০ ডিম পান তিনি।

ত্রিশালের মোক্ষপুরে ১০ হাজার লেয়ার মুরগির খামারে প্রতিদিন ৮ হাজার ডিম পান আনোয়ার হোসেন। তিনি সোমবার প্রতি ১০০ ডিম বিক্রি করেছেন ১১৩০ টাকায়। আগের দিন বেচেছেন ১০৫০ টাকায়।

আনোয়ার বলছেন, ডিমের দাম নতুন করে বাড়েনি। বরং ডিমের দাম বাড়তিই ছিল। কেবল ঈদের সময়ে একটু চাহিদা কমেছিল। তাই দামটা নেমেছেল। এখন চাহিদা স্বাভাবিক হয়েছে, তাই দাম আগের অবস্থানে এসেছে।

ডিমের দাম বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ার কথা বলেন আনোয়ার।

তিনি বলেন, “আগে ৩০ টাকায় বাচ্চা পেতাম, এখন কিনতে হয় ১০০ টাকা দিয়ে। আগে ফিড খাওয়াইতাম দু্ই হাজার টাকা বস্তা, এখন সাড়ে তিন হাজার টাকা। আগে যে ওষুধ কিনতাম ১০০ টাকায়, সে ওষুধ এখন কিনতে হয় ৪০০ টাকায়। ওষুধেই সবচেয়ে বেশি দাম বাড়ছে। তিনগুণ দাম। 

“এগুলোর কারণে আমাদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এগুলোর দাম কমলে উৎপাদন খরচ কমবে। আর আমরাও কমে বিক্রি করেও লাভবান থাকব।”

সৈয়দপুরের ডিম সরবরাহকারী সাইফুল ইসলাম সোমবার বলেন, “গতকালের তুলনায় আজ ডিমের দাম শতকে বাড়ছে ৫০ টাকা। আর গত দুই দিনে বাড়ছে ৬০ টাকা। এই টাকা খামারিরা পাচ্ছে।”

এই দাম কারা বাড়িয়েছে- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “ঈদের দিন থেকে পাঁচ দিন ডিমের দাম কমে আসছিল। এখন যেটুকু বাড়ছে তাও তো ঈদের আগের দামে আসে নাই। দাম কেউ বাড়ায় নাই। ঈদ শেষ তাই চাহিদা বাড়ছে, অটো ডিমের দাম বাড়ছে।”

কিশোরগঞ্জ থেকে ডিম সংগ্রহ করে ঢাকায় সরবরাহ করেন নাজিমুদ্দিন। তিনি বলেন, “আমাদের ডিমের রেট ঠিক করে দেয় তেজগাঁও ডিম সমিতি। এখন যে দামটুকু বাড়ছে, এটা সম্পূর্ণটাই খামারিরা পাচ্ছে। মূলত ঈদের সময় দাম কমে গিয়েছিল। এমনিতে দাম তো বেশিই ছিল।”

তবে ডিমের দাম ঠিক করে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তেজগাঁও ডিম সমিতির সাধারণ সম্পাদক হানিফ মিয়া।

মোবাইল ফোনে তেজগাঁও ডিম সমিতির নামে যে মেসেজ যায়, সেটি কারা দেয়-এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “এটা আমাদের কেউ দেয় না। বরং এটা ধরার জন্য চেষ্টা করছি। আমরা এটা নিয়ে জিডিও করেছি।”

ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, “এসব কারসাজির বিষয়ে আমরা দুই বছর আগেই কাজ শুরু করে সেই কাজ শেষ করে রিপোর্ট জমা দিয়েছি প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে। সব তো আমরা একা করতে পারব না।

“…এ বিষয়ে তেজগাঁওয়ের কয়েকজনের নামে মামলা করেছি। কয়েকটি কোম্পানির বিরুদ্ধে আমাদের রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে মামলা হয়েছে।”