২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

বিটিসিএল -এ ৬০ জন এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (টেকনিক্যাল) নিয়োগ এবং কিছু প্রাসঙ্গিক সমস্যার কথা

মামুন ম. আজিজ

Published : 04 Oct 2011, 11:24 AM

Updated : 03 Oct 2022, 05:02 PM

Image
বিজ্ঞপ্তি

উত্তরাধিকার সূত্রে বিটিটিবি হতে আগত ও সরকারী চাকুরীর স্ট্যাটাস অনির্ণীত বিপুল লোকবল এবং ব্যাপক স্থাপনার দিক দিয়ে দেশের সর্ববৃহৎ টেলিকম কোম্পানী ( যদিও ব্যবসার দিক দিয়ে নয়) –
বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানী লিমিটেড অতি সম্প্রতি এসিসট্যান্ট ম্যানেজার (টেকিনিক্যাল) পদে ৬০ (ষাট) জন
লোক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে।

বহিঃ দৃষ্টিকোণ থেকে এটা খুব স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া এবং আয়োজন মনে হলেও কোম্পানীটির বর্তমান বিরাজমান নানান জটিলতা ও অসমাধিত সমস্যা সমূহের সাথে হয়তো এই নিয়োগ নতুন করে জটিলতা ও সমস্যার মেঘ বাড়িয়ে তুলতেও পারে।

১/১১ এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জরুরী অবস্থার মধ্যে ২০০৮ সালের ১ জুলাই তৎকালীন বাংলাদেশ তার ও টেলিফোন বোর্ড (বিটিটিবি) এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিলুপ্ত হয়ে বিটিসিএলের যাত্রা শুরুর সময় তাদের ২ বছরের সময় বেঁধে দেওয়া হয়। ২০১০ সালের ৩০ জুনের মধ্যেই নিজস্ব কাঠামো অনুসারে বিটিসিএল পরিচালিত হওয়ার কথা। পরে এই অধ্যাদেশ নির্বাচিত সরকারের সময় ২০০৯ সালে সংসদে আইন হিসেবে পাসও হয়েছে। কিন্তু গত দুই বছরে কেনো তিন বছরেরর বেশী সময় পার হলেও ঐ সব শর্তের প্রায় কিছুই পূরণ হয়নি। এ বিষয়ে দীর্ঘ দিন ধরে বিটিসিএলের বিভিন্ন অফিসে ১০ হাজার+ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ-উত্তেজনা।

বিলুপ্ত বিটিটিবিতে বিএসএস (টেলিকম) ক্যাডারেরর অধীন প্রায় ৪০০ এর মত কমর্কতা নিয়োজিত ছিলেন। অধ্যাদেশ জারীর পর থেকে তারা অদ্যাবধী সরকারী ক্যাডার ভুক্ত কর্মকর্তা হয়েও সম্পূর্ণ অনিয়মতান্ত্রিকভাবে বিটিসিএল এ কাজ করে যাচ্ছেন। এই উদ্ভূত সমস্যা হতে মুক্তি পেতে কর্মকর্তারা ইতোপূর্বে আদালতের শরনাপন্ন হন। উচ্চ আদালতের রায়ও তাদের পক্ষে যায়। যে সম্পর্কে জাতীয় দৈনিক পত্রিকা প্রথম আলো এর ১৯-১-২০১১ এর এক রিপোর্ট থেকে দেখা যায় –

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাগ্য এখনো ফেরেনি। সরকারি সুবিধায় চাকরি বজায় রাখার জন্য এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী আদালতেও গিয়েছিলেন।
আদালতের রায় অনুযায়ী, আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তাঁদের সরকারি অন্যান্য টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানে পদায়ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ডাক ও টেলিযোগাযোগসচিব (ভারপ্রাপ্ত) এবং বিটিসিএলের চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি বোস প্রথম আলোকে বলেন, বিটিসিএল বিষয়ে উচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কারণ, আদালতের রায় অনুযায়ী, অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে তাঁদের প্রেষণে বা লিয়েনে পদায়ন করতে হলে আইনের নতুন ধারা তৈরি করতে হবে, যা খানিকটা সময়সাপেক্ষ বিষয়। তিনি জানান, ইতিমধ্যে বিটিসিএলের অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীই কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁদের 'অপশন লেটার' জমা দিয়েছেন। এ বিষয়টিও আদালতের কাছে আপিলে উল্লেখ করা হবে।

পরবর্তীতে ঐ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা করায় সমস্যার এখনো পর্যন্ত সমাধান হয়নি। বিষয়টি সম্পর্কে জানুয়ারী মাসের কোন এক দিন দৈনিক কালের কণ্ঠের এক রিপোর্টে দেখা যায়-

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সব টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পদে অগ্রাধিকার পাচ্ছেন বিসিএস (টেলিকম) ক্যাডারের কর্মকর্তারা। তাঁরাই বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল), টেলিটক, বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্ল্ কম্পানি লিমিটেড_এসব প্রতিষ্ঠান চালাবেন। সম্প্রতি এ বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা পুরোপুরি অনুসরণ করার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়। উচ্চ আদালতের নির্দেশ রয়েছে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই বিসিএস (টেলিকম) ক্যাডারের সব সদস্যকে ওইসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ চূড়ান্ত করতে।

এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব সুনীল কান্তি বোস কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমরা আদালতের নির্দেশনা ভালোভাবে পড়ে দেখেছি। আদালত যেভাবে বিসিএস (টেলিকম) ক্যাডার সদস্যদের সমস্যার সমাধান করতে নির্দেশনা দিয়েছেন,

আমরাও তা করতে চাই। সে কারণে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করব না। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজটি সম্পন্ন করা কষ্টকর হয়ে পড়বে কি না তা এখনো বলা যাচ্ছে না। তেমন হলে আদালতের কাছে আরো সময় চাওয়া যায় কি না সে বিষয়ে আইনজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হতে পারে।'

বিসিএস টেলিকম ক্যাডারের অধীন সর্বশেষ নিয়োগ দেয়া হয় ২০০৬ সালে ২৫তম বিসিএস এর মাধ্যমে। এর পর থেকে ঐ ক্যাডারে নিয়োগও বন্ধ রয়েছে যদিও ক্যাডারটি এখনো অ্যাবলিশও করা হয়নি।

যে কারনে কর্মকর্তাদের এন্ট্রি লেভেল অর্থাৎ সহকারী বিভাগীয় প্রকৌশলী / এসিসট্যান্ড ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার পদে লোকবল বর্তমানে খুবই সীমতি যার সংখ্যা ৬০ এর বেশী নয়। ফিল্ড লেভেলে টেকনিক্যাল সকল কাজ এই স্বল্প সংখ্যাক এডিইদের দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে। যেখানে বিটিসিএল এর প্রায় ৫০০ এর মত কেবল এক্সচেঞ্জই রয়েছে সারাদেশ জুড়ে। এডিই স্বল্পতার কারনে টেকনিক্যাল কাজে একজন এডিইকেই অনেকগুলো করে পদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

এ কারনে এডিই লেভেলে নতুন লোক নিয়োগের বিষয়টি বিটিসিএল এর সু্ষ্ঠ ও বাস্তবিক পরিচালনার জন্য খুবই জরুরী । কিন্তু বিসিএস ক্যাডারভূক্ত কর্মকর্তারা চাকুরীর সকল সুযোগ সুবিধা বেতন ভাতা পূর্বের সরকারী নিয়মের অধীনেই হচ্ছে। কোম্পানীর এমপ্লয়ি না হওয়ায় মূলত কোম্পানীর কোন পদের সাথে বিসিএস কর্মকর্তাদের কোন পদ সমাতুল্য সে সবও অনির্ধারিত। কোম্পানীর নিজস্ব অর্গানোগ্রাম , বেতন কাঠামো এসবও সকলের কাছে পূর্ণ অবগত করা হয়নি। বিটিটিবিতে বিসএসএস ক্যাডারের কর্মকর্তাদের এন্ট্রি লেভেল এডিই , এরপর এসডিই , তারপর ডিই, তারপর ডিরেক্টর, তারপর জিএম , তারপর মেম্বার–এইরূপ ছিল। বর্তমানে বিটিটিবি না থাকলেও সেই সব পদই বহাল আছে অদ্যাবধী।

বিসিএস ক্যাডারভূক্ত কর্মকর্তাদের বর্তমানে সরকারী চাকুরীর অবস্থান এবং কোম্পানীতে অবস্থান কোনটাই স্পষ্ট নয়।

গত ৯ই জুলাই দৈনিক প্রথম আলোর এক রিপোর্টে দেখা যায়-

বিটিসিএল চাকরি বিধিমালা ২০১১ সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানের বোর্ড চেয়ারম্যান বলেন, সরকারি চাকরির মতো করে কোম্পানি চাকরিতে সুবিধা দেওয়া হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি সুবিধা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

আন্দোলন-প্রতিবাদ: নতুন সাংগঠনিক কাঠামোতে জনবল কম রাখা এবং চাকরি বিধিমালায় কী ধরনের সুবিধা ও নিয়ম রয়েছে, তা স্পষ্ট না করায় এক বছর ধরে আন্দোলন করছে বিটিসিএলের শ্রমিক-কর্মচারীদের সংগঠনগুলো। প্রথমত, বিসিএস টেলিকম ক্যাডারের সদস্যরা সুযোগ-সুবিধাসংবলিত সরকারি চাকরি ছাড়তে চাচ্ছেন না। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন অধিকাংশ কর্মকর্তা। কারণ, সরকারি চাকরি ছেড়ে প্রত্যেককে কোম্পানির নতুন সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী বেসরকারি চাকরিতে যোগ দিতে হবে। এতে চাকরি-পরবর্তী সরকারি সুবিধা তাঁরা পাবেন না। পাশাপাশি বিসিএস টেলিকম ক্যাডারের সদস্যরা এভাবে একযোগে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিলে বিসিএস টেলিকম ক্যাডার সার্ভিস বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

বিসিএস টেলিকম সমিতির সাধারণ সম্পাদক এম এ তালেব বলেন, 'আইনত কোনো ক্যাডার সার্ভিস বিলুপ্ত হতে পারে না। সাংগঠনিকভাবে আমাদের সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত হয়ে রয়েছে। আমরা সরকারি চাকরি বা আমাদের ক্যাডার সার্ভিস ছেড়ে কোম্পানি বিটিসিএলে যোগ দেব না।'

এমন সব জটিলতায় হঠাৎ কোম্পানী নিজস্ব লোকবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করায় বিসিএস টেলিকম ক্যাডারভূক্ত কর্মকর্তা এবং বিটিটিবর পুরাতন সকল (প্রায় ১০ হাজার) কর্মচারী নতুন করে হতাশারমধ্যে নিমজ্জিত হয়ে পড়ার আশংকা করছে।

একই পরিবেশে একই কাজে দুই ধরনের লোকবল কাজ কিভাবে করবে সেটা সম্মুখে সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তারউপর বিসিএস ক্যাডার ভূক্ত এডিইগণ সরকারী স্কেলই বেতন পাচ্ছেন সেখানে নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এসিসট্যান্ট ম্যানেজার পদে প্রায় দিগুন বেতন স্কেল উল্লেখ করা হয়েছে। যা মানসিক অসমতা তৈরী করে কর্মক্ষেত্রে সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।

এ সকল কারনে ইতোপূর্বে বিসিএস টেলিকম সমিতির পক্ষ থেকে পিএসসির মাধ্যমে এডিই লেভেলে একই সমমর্যাদা এবং একই বেতন স্কেলে অ্যাডহোক ভিত্তিতে লোক নিয়োগ দেয়ার আবেদন জানানো হয়।

বতর্মানে মন্ত্রনালয় অনেকটা পাশের রাষ্ট্র ভারতের আদলে ডিপার্টমেন্ট অব টেলিকমিউনিকশেন্স বা ডট গঠন করে ভূতপূর্ব বিটিটিবির সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সেখানে অন্তর্ভূক্ত করার একটা উদ্যেগের উপর কাজ করছে বলে জানা যায়।

সেই সমাধান বা অন্য কোনরকম সমাধান না হওয়া অবধি নতুন করে কোম্পানী নিজস্ব আঙ্গিকে লোক নিয়োগ করলে এক গৃহে দুই পীর প্রবাদটির মত নানান সমস্যা নতুন করে মাথা চাড়া দেয়ার বিষয়টি একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায়না। যা রাষ্ট্রীয় একটি বিশাল প্রতিষ্ঠানের জন্য এবং দেশের জন্য মোটেও কাম্য হতে পারে না।