‘অপরিকল্পিত নগরে’ ঝড়ে সড়কে ভেঙ্গে পড়ল সেই গাছ

বোরহান বিশ্বাস
Published : 22 May 2022, 08:50 PM
Updated : 22 May 2022, 08:50 PM

এই তো সেদিন ভোররাতে কালবৈশাখী বয়ে গেল রাজধানীতে। ওই ঝড়ে খিলগাঁও এলাকার বেশ কয়েকটি বড় গাছ ভেঙ্গে পড়ে; এর একটি জোড়পুকুর মাঠের কাছে বিশাল আকারের একটি গাছ।

২০১৯ সালের এপ্রিলে ব্লগ ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম সাইটে নাগরিক প্রতিবেদন লিখেছিলাম বিশেষ করে এই গাছটি নিয়েই।  বয়সী এই কড়ই গাছ তখন ঠিক পাশে একটি পিলারের সাথে তার দিয়ে কোনোরকমে বাঁধা ছিল। কিন্তু এভাবে কি নগরের গাছ রক্ষা করা যাবে?

এই আশংকাই বড় দুঃখজনকভাবে সত্যি হয়ে দেখা দিল।

ঝড়ে গাছটি উপড়ে সড়কে পড়ে গেলে যান চলাচলে অসুবিধা দেখা দেয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে রাস্তায় উপড়ে পড়া গাছটি কেটে নিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

সামান্য দূরে আনসার ক্যাম্প এলাকাতেও স্থানীয় আনসার ক্যাম্পের সামনে বড় দুটি গাছের ডাল ভেঙে পড়ে। তবে দুই জায়গাতেই কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

রাজধানীর খিলগাঁও রেলগেট সংলগ্ন জোড়পুকুর মাঠের সামনে ৮০ ফুটের চওড়া রাস্তা। সামান্য এগিয়ে গেলেই ফুটপাতের পাশে বেশ কয়েকটি বয়সী গাছ দেখা যায়; এরমধ্যে ভেঙে পড়া বয়সি কড়ই গাছটিও ছিল। গাছটির বড় বড় ডালপালা রাস্তার উপর দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই এর নিচ দিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে লোকজন চলাচল করতেন।

বিশালাকৃতির এই কড়ই গাছটি পড়ে যাবে এই ভয়ে এলাকাবাসী পাশের যে পুরনো বৈদ্যুতিক পিলারের সঙ্গে গাছটিকে বেঁধে দেয়। কিন্তু গাছের ওজনের চাপে ওই বৈদ্যুতিক পিলারটিতেও ফাঁটল দেখা দিয়েছিল। ফলে যে কোনো সময় বাঁধা তার ছিঁড়ে যাওয়ার আশংকাও স্থানীয়দের মাঝে।

প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত হাজার-হাজার মানুষ গাছটির নিচ দিয়ে যাতায়াত করেছে। কোমলমতি শিশুরা আতঙ্ক নিয়ে অভিভাবকদের হাত ধরে স্কুল যাওয়া-আসা করেছে।

ভেঙে পড়া সেই গাছটির ঠিক পেছনেই রঞ্জু আহমেদের বাসা। ভোরে ঝড়ের সময় তিনি জেগে ছিলেন।

তিনি বললেন,  "প্রচন্ড বাতাসে মুহূর্তেই গাছটি বৈদ্যুতিক তারসহ নুয়ে পড়ে রাস্তার উপর। ঝড় থামার পর ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় নিয়ে গাছটি কেটে টুকরো টকুরো করে সড়কে যান চলাচলের ব্যবস্থা করে।"

গাছটির বয়স আনুমানিক ১৭-১৮ বছর, ধারণা করে বলেন রঞ্জু আহমেদ।

"এর শেকড় যতদূর মনে হয় মাটির  গভীর পর্যন্ত পৌঁছায়নি। উপরের দিকে ছড়িয়ে ছিল।"

বিষয়টি তিনিসহ এলাকার সচেতন নাগরিকরা গত ছয় থেকে আট মাস ধরে বিভিন্ন সেবা সংস্থাকে জানিয়ে আসলেও কেউ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, পুরনো যে বৈদ্যুতিক পিলারের সঙ্গে গাছটি নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে স্থানীয়রা বেঁধে রেখেছিলেন, ঝড়ের সময় তা তেমন কোনো কাজে আসেনি।

বাতাসে বিদ্যুতের তার সেই পিলারসহ ছিঁড়ে ভেঙে রাস্তায় পড়েছিল। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) কর্মীরা এসে পুরনো পিলারের পাশে নতুন আরেকটি পিলার বসিয়ে কোনোমতে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা ঠিক রাখেন।

পরে জানতে পারি, গাছের সঙ্গে থাকা পুরনো পিলার সরিয়ে নেওয়ার সময় এক রিকশাওয়ালার উপর পড়লে তিনি মারা যান।

স্থানীয়দের ভাষ্যে, খিলগাঁও জোড়পুকুর মাঠ থেকে আনসার কোয়ার্টার পর্যন্ত এমন আরও বেশকিছু ঝুঁকিপূর্ণ গাছ রয়েছে।

২০১৬ সালে গাছ চাপায় মারা যান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত খ্যাতিমান নির্মাতা খালিদ মাহমুদ মিঠু। রাজধানীর ধানমণ্ডিতে আকস্মিকভাবে সড়কের পাশের মোটা একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ ভেঙে পড়ে তার ওপর। গত বছরও ধানমণ্ডিতে গাছের চাপায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান মারা যান। এর আগে ২০১৭ সালের ১৯ মার্চ গাছের নিচে চাপা পড়ে মারা যান মুজাহিদুল ইসলাম নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী।

ঝড়ের মওসুমে গাছ উপড়ে পড়ে নিহত-আহত কিংবা রাস্তা বন্ধ থাকার খবর দেখা যায়। কয়েক বছর আগে গাছ ভেঙে রাজধানীর রামপুরা, হাতিরঝিল, মিন্টু রোডের মন্ত্রিপাড়া, ধানমণ্ডি, গুলিস্তানের মহানগর নাট্যমঞ্চ এলাকা ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গাছ উপড়ে পিকআপের ওপর পড়ে দুজন আহত হওয়ার ঘটনাও গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছিল।

মোট আয়তনের যে পরিমাণ গাছ থাকার কথা তার সিকি ভাগ গাছ রয়েছে রাজধানীতে। সেগুলোও আবার সামান্য বাতাসে উপড়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ, পরিচর্যার অভাব, মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা না করা এবং দেখভালের জন্য সরকারি উদ্যোগ না থাকায় দমকা বাতাস হলেই গাছ উপড়ে পড়ার মতো ঘটনা ঘটছে।


উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, বৃক্ষরোপণের সময় খেয়াল রাখতে হবে কী ধরনের গাছ এবং কোথায় রোপণ করা হচ্ছে। মাটির গুণাগুণ বিবেচনা করে জায়গাটিতে গাছটি ভারসাম্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে কি না সেটিও বিবেচনায় আনতে হবে।

রাস্তার আইল্যান্ডে মাটি কম, সেখানে গাছের মূল গভীরে যেতে পারে না। তাই সেখানে যদি বড় প্রজাতির গাছ লাগানো হয় তাহলে হালকা বাতাসেই তা উপড়ে পড়বে। আবার যদি লালমাটি হয় সেখানে গাছ শক্তি পায় না। সামান্য বৃষ্টিতে মাটি খুব নরম হয়ে পড়ে, তখন ডালপালাও শক্তি হারায়, বাতাসে ভেঙে পড়ে। এজন্য মাটি পরীক্ষা করে উপযুক্ত স্থানে উপযুক্ত গাছ লাগানো উচিত।

গাছ লাগানো এবং বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি পুরনো গাছ সংরক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ গাছ অপসারণের ব্যবস্থা সিটি করপোরেশনকে নিতে হবে।

শুধু খিলগাঁও নয় পুরো নগরীর বয়সী গাছগুলোর দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন দ্রুত।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক