মহামারীর এপিঠ-ওপিঠ

এস এম নাজমুল হাসান অনিক
Published : 29 August 2020, 12:15 PM
Updated : 29 August 2020, 12:15 PM

বর্তমান বিশ্ব এমন এক ভয়াবহ মহামারীর কবলে নিমজ্জিত হয়ে আছে যে সেখান থেকে উত্তরনের সুনির্দিষ্ট কোনো উপায় এখনো কেউ বলে উঠতে পারছে না।  চিকিৎসকরা নিজের জীবন বিপন্ন করে সেবা দিয়ে গেছেন রাত-দিন। কেউ কি কখনো ভেবেছিল এরকম দিনের কথা?

মহামারীর কথা ছোটবেলা থেকেই বইয়ের পাতায় পড়ে এসেছি। কিন্তু কখনো চোখে দেখেনি। একটা সময় ছিল যখন কলেরা বা ওলাওঠায় গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। এখন কলেরার ভ্যাকসিন আমরা নিতে পারছি। কিন্তু করোনাভাইরাসের থেকে সেরে ওঠার জন্য এখনও কোনো ভ্যাকসিন প্রয়োগ উপযোগী বলে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ভ্যাকসিন আসার আগ পর্যন্ত শঙ্কা ও সংক্রমণ নিয়েই কাটাতে হবে দিন।

আমাদের দেশে সেই মার্চ থেকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়। একসময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত সব বন্ধ করে দিতে হয়। দোকানপাট, হাটবাজারে শুরু হয় কড়াকড়ি। ঘরবন্দি হয়ে পড়ি আমরা।

এভাবে একের পর এক দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাস যায়। কিন্তু কখনো কি হঠাৎ করেও আমাদের একটু হলেও খেয়াল হয় না যে  ঘরেই তো বেশ আছি। মনে কি হয় না যে কত বছর পর বাবা-মা-ভাই-বোনের সাথে একসাথে সময় কাটাচ্ছি। ছোট থেকে একটা বয়স পর্যন্ত মানুষ বাবা-মায়ের ছায়ায় বড় হয়। একটা সময় জীবন ও জীবিকার সন্ধানে নেমে পড়তে হয়। বের হতে হয় ঘর ছেড়ে। সেই যে ঘরের বার  হওয়া, এরপর যেন আর কখনোই চারদেয়ালের সেই ঘরে ফেরা হয় না। পরিবারের সাথে কাটানো পুরনো দিনের মুহূর্তগুলো কিঞ্চিত মনের মধ্যে রোমাঞ্চ তৈরি করলেও ব্যাস্ত এই শহরের কর্মব্যাস্ততায় আর সে সময় কখনো ফিরে আসে না।

সেই সময় কি ফিরে আসেনি এখন? হ্যা, এসেছে। আমাদের সেই সুন্দর শৈশবের মধুর দিনগুলো সম্ভবত আবার ফিরে এসেছে। এই কয়েক মাসে আমরা পেয়েছি পরিবারের সান্নিধ্য, কাটিয়ছি কিছু অসাধারণ মুহূর্ত। আড্ডা দিয়েছি, মায়ের কাজে সাহায্য করেছি, বাবাকে সাহায্য করেছি, ভাই-বোনদের পড়িয়েছি। এর চেয়ে ভালো সময় কাটানো আর কি কখনো হবে পরিবারের সাথে?

আমরা দেখেছি এমন অনেক মানুষকে যারা এখনো তাদের মনুষ্যত্ব ধরে রেখেছে। বাড়িওয়ালা অথবা দোকান মালিকরা কোথাও কোথাও যেমন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে তাদের ভাড়াটিয়াদের, ঠিক তেমনি এমন অনেক মানুষের কথা জানা গেছে যারা মানবতার খাতিরে মওকুফ করে দিয়েছে বাড়িভাড়া, দোকান ভাড়া। অনাহারী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে অসংখ্য মানুষ। দু'বেলা অন্নের সংস্থান করে দিয়েছে এসব মানুষ অনেক দরিদ্রের।

আমাদের প্রতিদিনকার অভ্যাসগুলোয় কতই না পরিবর্তন এসেছে। ভালোভাবে হাত ধোয়া, মাস্ক পরিধান করা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, যত্রতত্র হাঁচি-কাশি না দেওয়ার  শিক্ষায় আমাদের এতদিন খুব অভাব ছিল। এক মহামারী এসে যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে আমাদের চলাফেরায় কতটা খুঁত আছে এবং আমরা সবসময় কী পরিমাণ রোগ এবং অসুখ-বিসুখের সাথে পাল্লা দিয়ে চলছি। হয়তো এই ধাক্কাটা না আসলে আমরা কখনোই সচেতন হতাম না।

আমরা এখন শিখে গিয়েছি কীভাবে নিজেদের রক্ষা করতে হয়। আমাদের তখনই আর কোনো বিপদের সম্ভাবনা থাকবে না যখন আমরা এই মহামারীকে টেক্কা দিয়ে টিকে থাকার জন্য নিজেদেরকে নিজেরা পরিশুদ্ধ করে ফেলব। নিজেদের প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিবর্তন আনব। মহামারীর প্রাদুর্ভাব থেকে বাস্তবিক শিক্ষা নিতে পারলে আমরা এই ভাইরাসকে দেশ ও বিশ্ব থেকে বিতাড়িত করতে পারব।

কিন্তু সে পর্যন্ত আমাদের সুস্থ থাকতে হবে। নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। ডাক্তারদের সহযোগিতা করতে হবে। সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। আমাদের বিপুল জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে আসতে হবে সুস্থ-সবল একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক