‘রূপনগরের’ রূপের বাহার দেখি না

রোদেলা নীলারোদেলা নীলা
Published : 18 Nov 2016, 09:45 AM
Updated : 18 Nov 2016, 09:45 AM

মিরপুরের উইকিপিডিয়া ঘাঁটাঘাঁটি করলেই জানা যায়, মোঘল আমলে ঢাকার অনেক আভিজাত লোকের নামের আগে 'মীর' শব্দটি ব্যবহৃত হতো। ধারণা করা হয় কোন মীরের ভূ সম্পত্তির অন্তর্গত ছিল এলাকাটি, যা পরে 'মীরপুর' বা মিরপুর নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রায় ১,২০,৩২৯ সংখ্যক বসতবাড়ি নিয়ে সমগ্র মিরপুরের আয়তন ৫৮.৬৬ বর্গ কিলোমিটার। মিরপুরে কাজীপাড়া,  শেওড়াপাড়া, সেনপাড়া ও সেকশন ১,২,৬,৭,১০,১১,পল্লবী, ১২ , ১৩ রয়েছে।

২০১১ সালে যখন মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামের খনন কাজ আরম্ভ হলো তখন এদিকে জমির দাম গেল বেড়ে। জমিদারি যদিও দেখিনি কখনো, তবে বাড়ি করার সময় বুদ্ধিজীবীদের অনেক হাড়গোড় পাওয়া গিয়েছিল বলেই জেনেছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে সব ছাত্র-শিক্ষকদের ধরে আনা হয়েছিল তাদেরকে মিরপুর  শিয়ালবাড়িতেই গণকবর দেওয়া হয়েছিল ।

ঢাকার মিরপুর এলাকার মধ্যে অনেকগুলো এলাকা অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। প্রতিটি এলাকার নামকরণের আবার আলাদা আলাদা ইতিহাস রয়েছে। মিরপুরের একটি অংশ জঙ্গলাকীর্ণ ও মাটির টিলার মত স্থান ছিল। সেই কারনে এলাকাটি পর্বতা নামে পরিচিত ছিল। আবার অন্য একটি অংশে সেন পদবীধারী হিন্দুদের বসবাস ছিল। সেই স্থানটি সেনপাড়া বা সেন পর্বতা নামে পরিচিতি লাভ করেছে। মীরপুরের একটি অংশে কাজী পরিবার বা কাজী উপাধিধারীগণ বাস করতো। তাই সে এলাকার নাম হয় কাজীপাড়া। আবার একটি এলাকায় অনেক শেওড়াগাছ ছিল। সেই এলাকাটি শেওড়াপাড়া নামে পরিচিতি পায়। এভাবেই মিরপুরের বিভিন্ন এলকার নাম বিভিন্ন প্রেক্ষাপট অনুযায়ী রাখা হয়েছে।

কিন্তু রূপনগরের নামকরণ কী রূপ দেখে করা হয়েছিল তার কোন সঠিক ইতিহাস আজো উদ্ধার হয়নি। কারণ এখানে কেবল মরা কংকাল বা ঝিল ছাড়া আর কিছু ছিল না। যে পথটা পল্লবীর দিকে চলে গেছে সেখানে ছিল লাল মাটির টিলা।

নব্বইয়ের দিকের কথা যদি বলতে যাই তবে স্বীকার করতেই হয়  তখন পায়ে হেঁটে স্কুল-কলেজ করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। কেননা কাউকে মেরে গুম করার জন্যই রূপনগর বিখ্যাত ছিল । আর এর পেছনেই ঢাকার বোটানিক্যাল গার্ডেন, অনেকেই আসতে ভয় পেত সেই সময়। কিন্তু সময়ের পালাবদলে পাঁচ বছরে নগরের রূপ বদলে গেছে অনেক । ঘর থেকে নীচে পা বাড়ালেই রিক্সা, আবাসিক এলাকার প্রায় প্রতি মোড়েই ঝলমল করছে বাহারি দোকান। ভ্যানের উপর পশরা সাজানো ভ্রাম্যমান বিপনন। শাক-কলা-ডাব -মাছ -মুরগী কী নেই তাতে? কষ্ট করে আর পায়ে হেঁটে বাজার অব্দি যেতে হয় না। বাচ্চাকে স্কুলে ঢুকিয়ে দিয়েই  তার সামনে দাঁড়িয়ে আপনি অনায়াসে আস্ত একটা মুরগী কিনে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরে আসতে পারবেন ।

ঝুট ঝামেলা যা হবে তা হচ্ছে কেবল গাড়িগুলোর সাথে ধাক্কা খাওয়া । এই আবাসিক এলাকায় আবার গাড়িওয়ালাদের অভাব নেই কোন। যদিও এখানে কেবলমাত্র সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্যে বরাদ্দ করা সম্পত্তি ছিল কিন্তু তারা বাড়ি না করে অনেকাংশেই বিক্রি করে দিয়েছেন ব্যবসায়ীদের কাছে। যেখানে একটি সাধারণ মধ্যবিত্তদের আবাসন হতে পারতো, তা এখন গার্মেন্টসওয়ালাদের দখলে । পুরো শিয়ালবাড়ি জুড়ে আছে কয়েকশত গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি, তার সাথে বাচ্চাদের চেপেচুপে মানুষ করার কারিগর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বিইউবিটি এবং মনিপুর স্কুল। আর অভিভাবকরা যেন ক্লান্ত হয়ে না পড়েন তার জন্য লিংক রোডেই তৈরি করা হয়েছে বিপনি বিতান । আবাসিক এলাকার ভেতরে যদিও কোন অফিস করার সরকারি অনুমোদন নেই তবুও বেশ কয়েকটি অফিস মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে ব্যাপক ভাবেই।

স্টেডিয়ামের কাজ যখন শুরু হলো তখন বুকের ভেতর একটা তীব্র আকাংখা কাজ করছিল, আহা, ঢাকার এক কোনে একটি শহর না জানি কতো জৌ ‍ুশ বেড়ে যাবে এক নিমিষেই। জৌলুস অবশ্য বেড়েছে। টেস্ট খেলা আরম্ভ হবার সাথে সাথেই প্রশাসন নিরাপত্তা দেবার লক্ষ্যে সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে কেবল এক নম্বর দিয়ে ঢোকার রাস্তাটা খুলে রাখে। আর তখনি শুরু হয় ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যাম। উত্তরাগামী সমস্ত বাস চলতে শুরু করে মিরপুর দুই নম্বরের পথ ধরে । 'রূপের নগরে' তখন কোন সুস্থ মানুষের পক্ষে সহজে ঢোকা সম্ভব হয় না। ক্রিকেট নামক উল্লাসের কাছে পরাজিত হতে হয় হাজার হাজার অফিস ফেরত মানুষ আর অসুস্থ রোগীর গাড়ির বহরকে ।

আমরা এমনিতেই খুব আবেগপ্রবণ জাতি। টিকেট যারা পায় না তারা মাঠের বাইরে হা করে দাঁড়িয়ে কাল্পনিক খেলা দেখে। কেউ থাকে ওয়ালটন আউটলেটের এলসিডি মনিটরের দিকে চেয়ে । শিয়ালবাড়ির মুখে ঢুকতেই যে তিনটি ডাস্টবিন আপনাকে স্বাগতম জানাবে তা দেখে ভড়কে যাবেন না যেন, এর পরেই আছে অভিজাত কবরস্থান যা আজো ইতিহাস বহন করে রয়ে গেছে, এটা কোন দিন সরানো হবে কিনা সে সম্পর্কে কেউ বলতে পারেনা ।

এখন রাস্তার হাল দেখলে জন্ম থেকেই জ্বলছি সিনেমার মতোন মনে হয় সে বলে যাচ্ছে- জন্ম থেকেই 'খুঁড়ি' খাচ্ছি। গত ছয় বছরে এই রাস্তায় কতোবার যে খোঁড়াখুঁড়ি করা হয়েছে তার রেকর্ড স্বয়ং সিটি কর্পোরেশনের আছে কিনা সন্দেহ। একবার পানির লাইন, তারপর বিদ্যুতের, এরপর গ্যাসের।এখন আবার বিদ্যুতের।এই ভাবে রোস্টার পদ্ধতিতে খোঁড়াখুঁড়ি চলতেই থাকে। টেন্ডার যে পায় তার জন্যে এটা সাময়িক সমস্যা (আনন্দঘন), কিন্তু যারা এ পথ দিয়ে নিত্যদিন হাঁটে তার জন্য জীবন মরণ সমস্যা।

রূপনগর থেকে পল্লবী হয়ে মিরপুর ১২-তে গিয়ে একটি প্রশস্ত রাস্তা করা হয়েছে কিন্তু যার অধিকাংশকেই বলা যায় বাসস্ট্যান্ড। আসলে মিরপুর-১২ থেকে আরম্ভ করে আগারগাঁও অব্দি পুরোটাই বাসস্ট্যান্ড।এখান থেকে শহরের যে কোন প্রান্তে আপনি যেতে পারবেন তবে সেটা ধীর লয়ে। বাস থামবেনা এমন কোন জায়গা নেই, এমনো হতে পারে আপনি বাড়িতে বসে ড্রাইভারের নম্বরে একটা কল দিয়ে কিছুক্ষন অপেক্ষা করতে বললে সে ঠিকঠাক আপনাকে নিয়ে যেতে পারবে -কেবল  হাত উঁচু করলেই হয় । 'অরিজিন্যাল দশ' -এর পর একটি মাত্র ইউটার্ন রাখা হয়েছে মিরপুর ক্যান্টনমেন্টের আগে পল্লবীর মুখে। কেউ রিক্সা নিয়ে এপার থেকে ওপার যাবেন তার কোন পথ খোলা নেই, রাস্তা পার হতে হবে হেঁটেই। অবশ্য এটা খুব যুগোপযোগি, আজকালতো হাঁটাহাঁটি প্রায় ছেড়েই দিয়েছে এলাকার মানুষ। কিন্তু যখন মিরপুর-১২ তে এসে কন্সটেবল রিক্সা আটকে দেয় তখন বাকী পথ পায়ে হেঁটে পার হতে হয়।

জানা যায়, এখানে রাস্তাকে গ্যারেজ বানানো বাবত মাসে পাঁচ হাজার টাকা নেয়া হয়। এই ডিলিং স্বয়ং সিটি কর্পোরেশনের কিছু অসাধু (সাধুবাদ) কর্মকর্তার (বিসিএস হাতের মোয়া না) সাথে হয়ে থাকে পুলিশের বড় কর্তাদের সাথে । তাই নীচু পোস্টের কেউ এইসব অরাজকতা নিয়ে কোন টুঁ শব্দটিও করে না। পাছে আবার বান্দরবনের মশার কামড় খেতে হয়।

সেদিন এ নিয়ে কথা বলতে গেলে একজন এসআই বললেন, 'যে দেশের যেই ভাও, সেইভাবেই চলতে হয়। আমরা তো একটা নষ্ট জাতি। আমাদের গোড়া ভালো না,  আগায় পানি ঢেলে কী হবে?' সত্যিইতো!

বিশৃঙ্খল রূপনগরের পেছনেই সুশৃংখল সেনানিবাস, বাইরের কোন লোক পরিচয় ছাড়া ঢুকতে পারেনা। যেখানে হারিকেন ছাড়া রিক্সা প্রবেশ নিষেধ, যানজট নেই, সেখানে ডাস্টবিনে এখানকার মতো ময়লা উপচে পড়েনা, রাস্তার পাশে অযথা গাড়ি পার্ক করে রাখতে পারেনা কোনো অর্বাচীন গাড়ির মালিক, নেই বছর জুড়ে বিরহিতহীন খোঁড়াখুঁড়ি। এটাও তো বাংলাদেশেরই অংশ। তাহলে বাইরের চিত্রটা এমন হবে কেন? তবে কি পুরো জাতিকে মানুষ করতে হলে দেশজুড়ে মিলিটারি নামাতে হবে? তারা ঘরে ঘরে গিয়ে সবাইকে দেশপ্রেম -শৃংখলা আর নৈতিকতার বাণী সাপ্লাই দেবে। যদি এমনটাই হয় তাহলে আর গণতান্ত্রিক(?) রাষ্ট্র দিয়ে জাতির ফায়দাটা কী?

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক