১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

শ্রদ্ধা ভালোবাসা স্মৃতিচারণায় সমরজিৎ রায়ের চিরবিদায়

শহীদ মিনারের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে শেষবারের মতো এই শিল্পী আসেন কফিনবন্দি হয়ে।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 10 Oct 2022, 06:40 PM

Updated : 10 Oct 2022, 08:40 PM

সহশিল্পী, ছাত্র আর সহকর্মীদের শ্রদ্ধা আর অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় চিরবিদায় নিলেন একুশে পদকজয়ী চিত্রশিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী।

সোমবার বেলা সাড়ে ১১টায় এই শিল্পীর কফিন নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যবস্থাপনায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধায় সিক্ত হন প্রয়াত এই শিল্পী। শ্রদ্ধা জানায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন।

শহীদ মিনারের আগে সকাল সোয়া ১০টায় এই শিল্পীর কফিন শেষবার নেওয়া হয় তার শিক্ষায়তন এবং কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে।

তাকে শ্রদ্ধা জানাতে আগে থেকেই সেখানে জড়ো হয়েছিলেন রফিকুন্নবী, হাশেম খানের মত দেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পীরা, ছিলেন চারুকলার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। চারুকলার এই শ্রদ্ধা নিবেদনের কাতারে যোগ দেন রাজনীতিবিদরাও।

আট দশকের জীবনে শিল্প বন্দনা ও সাধনায় ইতি টেনে চিত্রশিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী মারা যান রোববার। রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

রোমান্টিক ধারার এই শিল্পীর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। হৃদেরোগ ও ফুসফুসের জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।

চারুকলায় সমরজিৎ রায় উঠে আসেন শিল্পী রফিকুন্নবীর স্মৃতিচারণে। রফিকুন্নবী জানান ১৯৫৯ সালে তিনি যখন চারুকলায় ভর্তি হন, তখন সমরজিৎ পড়েন শেষ বর্ষে।

“আমি উনাকে ছাত্র হিসেবে এক বছর দেখেছি। পরে উনি শিক্ষক হয়ে জয়েন করলেন। তাকে শিক্ষক হিসেবেও দেখেছি। এত সিরিয়াস শিক্ষক কমই দেখেছি। তার মত ভালো মানুষও কম দেখেছি।

“তিনি গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের ছাত্র এবং শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু পেইন্টিং বিভাগেও তিনি অসাধারণ শিক্ষক ছিলেন। আমার সাথে উনার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তিনি কিছুটা অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু এভাবে চলে যাবেন ভাবতে পারিনি।"

বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান অলঙ্কৃত করার কাজে সমরজিৎ রায়ের সম্পৃক্ততার কথা উঠে আনে চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যপক নিসার হোসেনের কথায়।

"তিন যুগেরও বেশি সময় সমরজিৎ স্যারকে কাছ থেকে দেখেছি। পারিবারিক কারণেও উনার সান্নিধ্য পেয়েছি। বাহাত্তরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন, সেই সেই সংবিধান অলঙ্কৃত করার জন্য জয়নুল আবেদিন স্যারসহ একটি কমিটি করে দিয়েছিলেন। সেখানে সমরজিৎ রায় যুক্ত ছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি লগো, পোস্টার ডিজাইনে তিনি যুক্ত ছিলেন।"

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের চেয়ারম্যান রশীদ আমিন বলেন, “সমরজিৎ রায়ের যে দিকটি আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছে, তিনি আদ্যপান্ত একজন শিক্ষক ছিলেন। মেরুদণ্ড সোজা করে থাকা শিক্ষক। নিয়ম মেনে ক্লাসে আসা, ঝড়-বৃষ্টি কোনো কিছুই উনাকে থামাতে পারত না।

“শিক্ষক হিসেবে তিনি অসাধারণ ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে এখন নানা রকম সমালোচনা হয়। শিক্ষকতা পেশার সম্মান বৃদ্ধি করেছেন সমরজিৎ স্যার।"

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, "সমরজিৎ রায় চৌধুরী আজীবন নিরীক্ষাধর্মী ও সৃজনশীল সুকুমার শিল্পচর্চায় নিয়োজিত ছিলেন। তার মৃত্যুতে দেশের শিল্প-সংস্কৃতিতে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তা সহজে পূরণ হবার নয়।"

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শিল্পীর কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল। শ্রদ্ধা জানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরাও৷

চারুকলা থেকে কফিন নেওয়া হয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে; একে একে শ্রদ্ধা জানান সহশিল্পী থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি পেশার মানুষ।

পুরানো খবর:

শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরীর চিরবিদায়

শহীদ মিনারে সমরজিৎ রায় চৌধুরীর ছেলে তার বাবাকে একজন ‘নিভৃতচারী’ এবং ‘কাজপাগল’ মানুষ হিসাবে বর্ণনা করেন।

“বাবা শিক্ষকতা পেশাকে ভীষণ পছন্দ করতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা শেষ করে উনি শান্ত মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন হয়েছিলেন। পরে আবার ঢাবিতে শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষকতা পেশার প্রতি ভালো লাগার কথা বাবা প্রায়ই বলতেন।"

সমরজিৎ রায়ের কাজগুলো সংরক্ষণের জন্য পারিবারিক উদ্যোগে কিছু পরিকল্পনা করার কথা জানিয়ে সুরজিৎ রায় বলেন, "বাবা এই দেশের গুণী শিল্পী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সুপ্রিম কোর্ট, বিমান বাহিনীর লোগোসহ অনেক লোগো করেছেন। সংবিধানের একজন নকশাবিদও উনি।

“তার কাজ সংরক্ষণের জন্য আমরা পারিবারিকভাবে কিছু পরিকল্পনা অবশ্যই করব। সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। বাবার তেমন কোনো কিছু চাওয়া-পাওয়া ছিল না। কিন্তু উনার কাজ সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপকৃত হবে।"

নাট্যকার রামেন্দু মজুমদার বলেন, "শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী নীরবে তার কাজটা করে গেছেন। যেমনটা করেছিলেন শিল্পী কিবরিয়া, শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদ। সমরজিৎ রায় তাদের মতোই কর্মগুণে হয়ে উঠেছিলেন পথিকৃৎ।"

হাশেম খানের ভাষ্যে, সমরজিৎ রায় চৌধুরী ‘অনেক বড়’ মাপের শিল্পী ছিলেন । রঙ ও রেখায় অসাধারণ দৃশ্যকল্প এঁকেছেন। নিজস্ব এক শিল্পভাষা গড়তে পেরেছেন।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দছ বলেন, "তিনি কেবল চিত্রশিল্পী নন৷ তিনি আমাদের চেতনাকে জাগ্রত রাখার পথিকৃৎ। আমাদের সংবিধানকে অলংকৃত করেছেন। যতদিন আমাদের সংবিধান থাকবে ততদিন দিনে অমর থাকবেন।"

জাতীয় কবিতা পরিষদ, ঢাকা স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা বিভাগ, বন্ধু গ্রুপ, জাতীয় জাদুঘর, শান্তা মারিয়াম ইউনিভার্সিটি, শিল্পকলা একাডেমি, ঢাবি ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, চারুশিল্পী সংসদ, ঢাকা আর্ট কলেজসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকেও এ শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।

শহীদ মিনার থেকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় সবুজবাগের শ্রী শ্রী বরদেশ্বরী মহাশশ্মানে। সেখানে এই শিল্পীর শেষকৃত্য হয়।