Published : 21 Feb 2023, 02:22 PM
পোশাকে শোকের কালো, শহীদের বুকের খুনে রাঙা ফুল হাতে হাতে; শ্রদ্ধায় নাঙ্গা পায়ে প্রতিটি পদক্ষেপে ভাষার অহঙ্কার। একুশ আলোর ভোর থেকে সব পথ যেন হেঁটে গেছে শহীদ মিনারে।
প্রভাতফেরির পথে পথে কণ্ঠে কণ্ঠে সেই গান- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি… আমি কি ভুলিতে পারি’।
মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ দেশের সব শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন আর নানা আয়োজনে ভাষা শহীদ ও সংগ্রামীদের স্মরণ করেছে পুরো বাংলাদেশ।
একুশের প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বাঙালির শ্রদ্ধা জানানোর পর্ব। এরপর বেলা ২টা পর্যন্ত বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানসহ সর্বস্তরের মানুষ শহীদ মিনারের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়।

নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের পাদচারণায় দিনভর মুখরিত শহীদ মিনারে বড়দের হাত ধরে এসেছিল শিশুরাও। অনেক স্কুল থেকেও ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা হাজির হয়েছিল ব্যানার নিয়ে।
মায়ের সাথে কেন্দ্রীয় শহীদ শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিল মতিঝিল মডেল স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সাবিতা রহমান ।
সে জানালো, পাঠ্যবইয়ে সে শহীদ মিনার দেখেছে, ভাষা শহীদ সালাম, বরকত, জব্বারের নাম পড়েছে। সেই শহীদ মিনারে এসে ফুল দিয়ে তাদের শ্রদ্ধা জানাতে পেরে ভালো লাগছে তার।
সাবিতার মা রোকেয়া আক্তার বলেন, “ওদের স্কুলে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। কিন্তু ওর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার দেখার খুব ইচ্ছে ছিল। তাই নিয়ে এলাম।”
ঢাকার বাসাবো থেকে সন্তানদের নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিতে আসেন মো. নাসির উদ্দিন। তিনিও বললেন, ভালো লাগছে খুব।
“প্রতিবারই বাচ্চারদের নিয়ে শহীদ মিনারে আসি। এটা একটা উৎসব মনে হয়। একই সঙ্গে শোকেরও। ভাষার জন্য আমাদের ভাইয়েরা শহীদ হয়েছেন। আমরা বাচ্চাদের নিয়ে আসি যাতে ভাষার প্রতি তাদের মমতা থাকে, ভাষা সম্পর্কে আরও উৎসাহী হয়।”

বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিতে এসেছে দনিয়ার বর্ণমালা আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির সামিউল ইসলাম সামি।
সে বললো, “ভাষা দিবসকে আমরা মনে প্রাণে অনুভব করি। কারণ ১৯৫২ সালে বাংলার দামাল ছেলেরা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে। তাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা এই ভাষা পেয়েছি। তার জন্য আমরা শ্রদ্ধা জানাতে এখানে এসেছি।”
খালি পায়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন প্রবীণ দম্পত্তি অজয় দাশগুপ্ত ও মহুয়া দাশগুপ্ত।
অজয় দাশগুপ্ত বলেন, “ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি আমাকে এখনও শিহরিত করে। এই ভাষার জন্য আমাদের রক্ত দিতে হয়েছে। পৃথিবীর কেউ ভাষার জন্য রক্ত দেয়নি। এটা আমাদের জন্য একই সঙ্গে শোকের ও গর্বের।
“আজকের এই দিনটি বিশ্বব্যাপী উদযাপন হচ্ছে, এটা আমাদের গর্বের বিষয়। তরুণ প্রজন্মকে আমি বলতে চাই, মাতৃভাষার প্রতি মমত্ববোধ থাকতে হবে। ভাষার বিকৃতি না করে প্রতিম ভাষায় কথা বলা শিখতে হবে।”

মহুয়া দাশগুপ্ত বলেন, “এই বয়সে ভিড় ঠেলে এখানে এসেছি। একটাই উদ্দেশ্য, ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার ফুলটুকু দিয়ে সম্মান জানানো।
“বাংলা একটি সুন্দর ও মধুর ভাষা। এই ভাষায় কথা বলতে পারা গর্বের বিষয়। তরুণ প্রজন্মেরও উচিত এই ভাষার প্রতি মমত্ববোধ ধরে রাখা।”
সাতচল্লিশে দেশ ভাগের পর বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে যান জ্ঞানরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়। এবার ঢাকায় এসে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন তিনি।
জ্ঞানরঞ্জন বলেন, এদেশের মাটি ও ভাষার প্রতি টান অনুভব করি। আমি এই বাংলারই মানুষ। জন্ম আমার এখানে। কিন্তু যে কোনো কারণে হোক ১৯৪৭ সালে আমাদের চলে যেতে হয়েছে। তারপরও আমি আসতে পারি নাই। এবার এলাম, ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানালাম, গর্ব অনুভব করছি।”

তার ভাষায়, “আসলে বাংলা কখনো আলাদা হয় না। জীবনানন্দ দাশ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল দুই বাংলারই লোক। আমাদের দুই বাংলার মধ্যে মেলবন্ধন রয়েছে। কাঁটাতারের সীমান্ত ছাড়া আমাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।”
সহকর্মীদের নিয়ে সকালে প্রভাতফেরিতে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান।
প্রভাতফেরী শেষে তিনি বলেন, “বিশ্বের সকল ভাষা-সংস্কৃতির সংরক্ষণ, সকল নৃগোষ্ঠীর মানুষের বিকাশ ঘটানো ও সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, সেজন্যই ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত।

“এর পশ্চাতে মৌলিক দর্শন হল- প্রতিটি মানুষের মাতৃভাষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্য সংরক্ষণ এবং তাদের আত্ম-মর্যাদা সমুন্নত রাখা। এখান থেকে একটি চেতনার জায়গাও রয়েছে, যেটি বিশ্ব সম্প্রদায় গ্রহণ করে, সেটা হল একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণ।”
অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, ভাষার উন্নয়ন ঘটানো জরুরি, ভাষার বিকৃতিরোধ এবং প্রমিত ভাষার ব্যবহার সবকিছুই মূলত বিশ্ব দরবারে বাংলা ভাষাকে সমাদৃত করবে। আন্তর্জাতিকভাবে এই ভাষার স্বীকৃতি আমাদের আরাধ্য। সে বিষয়টি তখন অর্জিত হবে, যখন বাংলা ভাষায় বিভিন্ন ধরনের সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি হবে এবং সেটি অন্য ভাষায় রূপান্তরের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপিত হবে।

“একই সঙ্গে বিভিন্ন ভাষার যে সাহিত্য সম্ভার আছে, সেটি যখন অনূদিত হবে। মূলত এই দুটো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়বে এবং আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে এর স্বীকৃতি প্রাপ্তিতেও আমাদের সহজতর হবে।”