ই-রিকশা নিবন্ধন: বিধিমালা হল, ধোঁয়াশা কী কেটেছে?
ঢাকার দুই সিটিকে আটটি জোনে ভাগ করার কথা বলা হলেও তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিয়মের মধ্যে আনতে নতুন বিধিমালা জারির পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নিবন্ধন ফরম বিক্রি শুরু করেছে।
তবে ঢাকায় মোট কত রিকশা চলবে, অনুমোদিত রিকশা সংগ্রহ ও যাচাই প্রক্রিয়া কী হবে, পুরনো রিকশা সংস্কার কীভাবে এবং অনুমোদন না পেলে কী হবে? এসব প্রশ্ন উঠেছে।
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের ঠিক করে দেওয়া কারিগরি মানদণ্ড মেনে কারা ই-রিকশা তৈরি করার অনুমতি পাবে, তাও চূড়ান্ত হয়নি এখনো।
এছাড়া ঢাকার দুই সিটিতে যে আটটি জোন বা অঞ্চল করার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর সীমানা নির্ধারণ হয়নি। চলাচল নিয়ন্ত্রণ হবে কীভাবে, তাও এখনো স্পষ্ট করা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, বিপুল সংখ্যক ব্যাটারিচালিত রিকশা রাতারাতি সড়ক থেকে সরানো বা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তাই শুরুতে কিছুটা নমনীয় থেকে ধাপে ধাপে পুরো ব্যবস্থাকে আইনি কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে রিকশাচালক ও মালিকদের সংগঠন ‘রিকশা, ব্যাটারি রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদ’ এর সংগঠক রায়হান উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “লাইসেন্স ফিসহ বিধিমালায় কিছু অসংগতি রয়েছে এবং চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়নি।“
তার মতে, একটি রিকশার জন্য নিবন্ধন ফি ৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে-যা অনেক বেশি। এসব ফি রিকশাচালকদের জন্য বোঝা ও সমস্যাজনক হয়ে দাঁড়াবে।
নতুন বিধিমালায় কী আছে?
ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে গত ২৯ অক্টোবর নতুন বিধিমালা জারি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ, যা দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় কার্যকর হবে।
‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’-এ একে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে ব্যাটারিচালিত ই-রিকশা হিসেবে। এর যাত্রী ধারণের ক্ষমতা দুই থেকে চারজন, আর সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার।
বিধিমালা অনুযায়ী, নিবন্ধন ছাড়া কোনো রিকশা সড়কে চলাচল করতে পারবে না। নিবন্ধনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট সাইজের ছবি, ফি জমার রসিদ ও ফিটনেস সনদ জমা দিতে হবে। কর্তৃপক্ষ ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন দেবে।
দুই যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার এককালীন নিবন্ধন ফি আট হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি ৪ হাজার টাকা। চার যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি ৫ হাজার টাকা। ফিটনেস সনদের জন্য ফি দিতে হবে ১০ হাজার টাকা।
প্রতিটি নিবন্ধিত ই-রিকশাকে কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নিবন্ধন নম্বর ও নম্বর প্লেট দেওয়া হবে। নম্বর প্লেটে সিটি করপোরেশনের নাম, অঞ্চলের কোড ও গাড়ির নম্বর নির্ধারিত রঙের পটভূমিতে সাদা অক্ষরে লিখতে হবে।
একটি ই-রিকশার নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। আর এর অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ বছর।
একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার নিবন্ধন নেওয়া যাবে। তবে এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চালানো যাবে না।
জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও বাস র্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) সড়কে ই-রিকশা চলাচল করতে পারবে না।
কর্তৃপক্ষ ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে অঞ্চলভিত্তিক চলাচলের সড়ক নির্ধারণ করবে। এক অঞ্চলে চলাচলের অনুমতি পাওয়া ই-রিকশা অন্য অঞ্চলে যেতে পারবে না। চালককে সব সময় সড়কের বাম লেন অনুসরণ করতে হবে।
স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার।
চালক ছাড়া নির্ধারিত দুই বা চারজনের বেশি যাত্রী বহন করা যাবে না। যাত্রীর হাতে বহনযোগ্য মালামাল ছাড়া অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্যও পরিবহন করা যাবে না।
অনুমোদিত চার্জিং পয়েন্ট বা গ্যারেজ ছাড়া ই-রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়া যাবে না। পর্যায়ক্রমে চার্জিং স্টেশনে নেট মিটারিং, সৌর প্যানেল ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া কথা বলা হয়েছে বিধিমালায়।
ই-রিকশার উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স নিতে হবে। এ বিষয়ে সুপারিশ করতে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিবকে (নগর উন্নয়ন অনুবিভাগ) আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হবে। কমিটিতে বুয়েট, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিরা থাকবেন।
বুয়েটের ছাড়পত্র কীভাবে?
ডিএসসিসির নিবন্ধন শুরুর ঘোষণার পর সাধারণ রিকশাচালক ও মালিকদের অনেকের মধ্যেই ধারণা তৈরি হয়েছে যে, প্রতিটি রিকশার জন্য আলাদাভাবে বুয়েট থেকে ছাড়পত্র নিতে হবে।
তবে বুয়েটের প্রকৌশলীরা স্পষ্ট করেছেন, তারা ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোনো রিকশা পরীক্ষা বা ছাড়পত্র দিচ্ছেন না; বরং নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর তৈরি করা মডেলের মান যাচাইয়ের সনদ বা ‘টাইপ অ্যাপ্রুভাল’ দিচ্ছেন।
ই-রিকশার নতুন নকশা প্রণয়নকারী গবেষক দলের সদস্য ও বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. জিয়াউর রহমান খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছিলাম। গত ডিসেম্বর মাসে একটি তফসিলের মাধ্যমে মন্ত্রণালয় সেটি অনুমোদন দিয়েছিল। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ওই নকশামতো গাড়ি বানিয়ে বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগ থেকে পরীক্ষা করিয়ে ‘টাইপ অ্যাপ্রুভাল’ নিয়েছে।”
বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে ই-রিকশার নকশা প্রণয়নকারী ছয় সদস্যের গবেষক দলের প্রধান ও বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. এহসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ছাড়পত্র দেওয়ার কোনো বিষয় বুয়েটের কাছে দেওয়া হয়নি। তারা কারিগরি নির্দেশিকা করে দিয়েছেন। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সেই অনুযায়ী তাদের মডেল তৈরি করছে।
তিনি বলেন, “অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের মডেল তৈরির কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং তারা কিছু সিটি করপোরেশন থেকে অনুমতিও পেয়েছে বলে শুনেছি।”
পরীক্ষা ও ছাড়পত্রের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে অধ্যাপক এহসান বলেন, নির্মাতারা মডেল তৈরি করে নিয়ে এলে সেটি মানদণ্ড অনুযায়ী হয়েছে কি না, বুয়েট তা পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দিচ্ছে। সবগুলো মানদণ্ড উত্তীর্ণ হলে তাদের একটি ছাড়পত্র দেন, যা নিয়ে তারা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সিটি করপোরেশনে যান।
তিনি বলেন, “প্রতিটি ইনডিভিজুয়াল রিকশার জন্য নয়; নির্মাতারা তাদের প্রতিটি মডেলের একটি করে গাড়ি আমাদের কাছে পরীক্ষা করাচ্ছেন। ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রতিটি রিকশা আমরা পরীক্ষা করছি না, তেমনটি করার কথাও নয়।”
ইতোমধ্যে ১০ থেকে ১২টি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বুয়েট থেকে তাদের মডেলের এই ছাড়পত্র নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন অধ্যাপক এহসান।
তার তথ্য অনুযায়ী, ডায়নামিক কারস, আকিজ মোটরস, বিভাটেক ও নিউ গ্রামীণ মোটরসের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ছাড়পত্র নিয়েছে।
এক আইডিতে কতটি নিবন্ধন, যাচাই কীভাবে?
বিধিমালায় একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটি রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ রাখা হয়েছে। কিন্তু এক ব্যক্তি আসলে কয়টি রিকশা নিচ্ছেন, তা যাচাইয়ে এখনও কোনো কেন্দ্রীয় ডেটাবেইজ তৈরি হয়নি।
ঠিক হয়নি শহরে সর্বোচ্চ কতটি রিকশার অনুমোদন দেওয়া হবে, কিংবা শর্ত পূরণ করলেই সবাইকে নিবন্ধন দেওয়া হবে কি না।
এছাড়া নতুন এ বিধিমালাটি বাস্তবায়নে সিটি করপোরেশনগুলোকে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি করপোশেন-১ শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইউনুছ চৌধুরী।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “গেজেট প্রকাশের পর থেকেই তারা বাস্তবায়ন শুরু করবে। ডিএনসিসি হয়তো তাদের কার্যক্রম গুছিয়ে নিচ্ছে। তবে আইন পাস হয়ে যাওয়ায় গেজেট প্রকাশের তারিখ থেকেই কাজ শুরু করতে আর কোনো বাধা নেই; তারা যত দ্রুত সম্ভব এটি শুরু করবে।”
কেউ যাতে পাঁচটির বেশি রিকশার নিবন্ধন নিতে না পারে সে জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? জবাবে ইউনুছ চৌধুরী বলেন, “আপাতত কোনো কেন্দ্রীয় ডেটাবেইজ নেই। এ ছাড়া কত সংখ্যক রিকশাকে নিবন্ধন দেওয়া যাবে বা শর্ত পূরণ করলে সবাইকে দেওয়া হবে কি না- সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা এখনও নেই। আগামী মাসখানেকের মধ্যে একটি রিভিউ মিটিং করে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
নিবন্ধন কার্যক্রম চলাকালে যেসব পুরোনো ই-রিকশা নিবন্ধন পাবে না বা নেবে না, সেগুলোর চলাচল নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আসন্ন পর্যালোচনা সভায় বিষয়টি তোলা হবে, বলেন তিনি।
নির্দিষ্ট হয়নি আট জোন
নতুন ব্যবস্থাপনায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকাকে আটটি জোনে ভাগ করে আটটি ভিন্ন রঙের ই-রিকশা চালানোর পরিকল্পনা করেছে পুলিশ ও সিটি করপোরেশন।
ঢাকার দুই সিটিতে মোট আটটি জোন বা অঞ্চল নির্ধারণের বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তা ইউনুছ চৌধুরী বলেন, “আটটি জোন হবে, তবে কোনটি কোন এলাকায় পড়বে তা এখনো একদম সুনির্দিষ্ট হয়নি।
“ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে এটি চূড়ান্ত করা হবে। বর্তমানে খসড়ার কাজ চলছে, চূড়ান্ত হলে তা প্রকাশ করা হবে।”
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উত্তরে চারটি এবং দক্ষিণে চারটি মিলে মোট আটটি জোন হবে এবং এই আট জোনে আট রঙের রিকশা থাকবে। আটটি রঙ হলে আমাদের পক্ষে শনাক্ত করা সহজ হবে কোন রিকশাটি কোন এলাকায় চলবে।”
ট্রাফিক পুলিশ চায়, গুলশানের রিকশা যাতে উত্তরা পর্যন্ত চলে না যায় কিংবা ওদিক দিয়ে মতিঝিলে না ঢোকে। এটি না করলে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে, বলছেন এই কর্মকর্তা।
তবে বাস্তবতার নিরিখে এক জোন থেকে অন্য জোনে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু ‘অনিবার্য করিডোর’ রাখা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, “প্রশ্ন আসতে পারে এই সীমানা কি একেবারেই কঠোর থাকবে? আমাদের উত্তর হচ্ছে- না।”
বাস্তবতা মেনে কিছু জায়গায় ‘অনিবার্য করিডোর’ রাখা হবে তুলে ধরে আনিছুর রহমান বলেন, “অনুমতি সাপেক্ষে সেই করিডোর দিয়ে রিকশাগুলো নিয়ন্ত্রিত উপায়ে যাতায়াত করতে পারবে, তবে অধিকাংশ রিকশাকে আমরা নিজস্ব জোনের মধ্যেই রাখতে চাচ্ছি।”
প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে এই অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, “জিপিএস এবং জিও-ফেন্সিং-এ দুটিই যুক্ত করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। তবে এই পুরো বিষয়টি একটি আইডিয়াল সিচুয়েশন ধরে আমরা চিন্তা করছি, যা রাতারাতি বাস্তবায়ন হবে না। আমরা পরীক্ষামূলকভাবে এটি শুরু করছি।”
পুরনো রিকশার কী হবে?
নতুন বিধিমালা জারির পর যে প্রশ্নটি সামনে আসছে, তা হল পুরনো ব্যাটারিচালিত রিকশার কী হবে?
জবাবে পুরনো রিকশা সমর্পণ (সারেন্ডার) সাপেক্ষে ধাপে ধাপে নতুন রিকশা নামানোর কৌশল নেওয়া হচ্ছে তুলে ধরে তার একটি রূপরেখাও দিলেন ট্রাফিক বিভাগের প্রধান আনিছুর রহমান।
তিনি বলেন, “বুয়েটের নকশা করা রিকশা এখন চাইলেও কেউ হঠাৎ করে ব্যাপক পরিমাণে উৎপাদন করতে পারবে না, সেই সক্ষমতা নেই।”
তার রূপরেখা অনুযায়ী, একটি এনআইডির বিপরীতে শুরুতে একজন মালিক পাঁচটির মধ্যে দুটি নতুন রিকশা নেবেন এবং তিনটি পুরনো রিকশা চালাবেন। এর জন্য তার দুটি পুরনো রিকশা সমর্পণ করতে হবে। তিনি পুরনো দুটি রিকশা জমা দিলে সড়ক থেকে দুটি কমে যাবে এবং দুটি নতুন রিকশা নামবে।
এ প্রক্রিয়া একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত এগোনোর পর অবৈধ রিকশাগুলো নিয়ন্ত্রণ বা জব্দ করার দিকে যাবে ট্রাফিক বিভাগ।
সমর্পণ করা পুরনো রিকশাগুলোর কী হবে? জবাবে আনিছুর রহমান বলেন, “মালিক পুরনো দুটি রিকশা নিয়ে এলে আমরা সেগুলো স্ক্র্যাপ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করব। স্ক্র্যাপ বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যাবে, তার পুরোটাই ওই রিকশার মালিক পাবেন এবং তিনি নিজের টাকায় নতুন দুটি রিকশা কিনবেন।”
এর ফলে মালিকদের যে আর্থিক ক্ষতি হবে, সেজন্য কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে কি না, এ প্রশ্নে ডিএমপির এ অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, “ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা রাখা যাবে না। বর্তমানে যে বিপুল পরিমাণ রিকশা চলে, তা আমরা রাখতে পারব না; আমাদের আসলে রিকশা কমাতে হবে।”
দুই বছর সময় চায় সংগ্রাম পরিষদ
রিকশা, ব্যাটারি রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদ বলছে, এক বা দুই মাসের মধ্যে বিপুল সংখ্যক রিকশার নকশা পরিবর্তন করা অসম্ভব, এজন্য অন্তত দুই বছর সময় দিতে হবে।
তারা বিধিমালাটি পর্যালোচনা করছেন তুলে ধরে সংগ্রাম পরিষদের সংগঠক রায়হান উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তাদের দাবি নিয়ে ১১ নভেম্বর সমাবেশ করবেন এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসককে স্মারকলিপি দেবেন তারা।
ডিএসসিসি কী বলছে?
ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, “সব রিকশা হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়ার চেয়ে আমরা ধাপে ধাপে এগুলোকে নিয়ম ও নিবন্ধনের আওতায় আনতে চাই।”
তিনি বলেছেন, প্রথম পর্যায়ে এক হাজার, দুই হাজার কিংবা পাঁচ হাজার-যে কয়টি ই-রিকশা শর্ত পূরণ করবে, সেগুলোকে পর্যায়ক্রমে অনুমোদন দেওয়া হবে।
নির্ধারিত মডেলের রিকশা তৈরি ও মেরামতের জন্য নির্দিষ্ট ওয়ার্কশপ নির্ধারণ এবং ওয়ার্ড বা থানা পর্যায়ে চার্জিং স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনার কথা এর আগে জানিয়েছিল ডিএসসিসি।
তবে এখনও কোনো ওয়ার্কশপ বা প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট করা হয়নি।
পুরনো রিকশা সংস্কারের বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জোনায়েদ কবীর সোহাগ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সরকারি অনুমোদিত কারিগরি মানদণ্ড, নির্ধারিত রঙ এবং ফিটনেস সনদ থাকলেই কেবল আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে। আগ্রহীদের নিজ উদ্যোগেই সেই মানদণ্ড মেনে রিকশা সংগ্রহ বা প্রস্তুত করতে হবে।
দক্ষিণে ফরম বিক্রি শুরু, উত্তরে কেবল প্রস্তুতি
মঙ্গলবার থেকে ই-রিকশা নিবন্ধনের জন্য ১০০ টাকা মূল্যের আবেদন ফরম বিক্রি শুরু করেছে ডিএসসিসি। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত নগর ভবন ও সব আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ পাঁচটি ফরম কিনতে পারছেন।
ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা সোহাগ বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বুধবার পর্যন্ত প্রায় ৭০০ ফরম বিক্রি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো রিকশাকে নিবন্ধন দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, “আমরা কেবল ফরম বিক্রি শুরু করেছি। আবেদনকারীকে বুয়েটের মানদণ্ড অনুযায়ী তৈরি রিকশা এবং ট্রাফিক বিভাগের ফিটনেস সনদসহ আবেদন জমা দিতে হবে। এরপর যাচাই-বাছাই শেষে নিবন্ধন দেওয়া হবে, যা সময়ের ব্যাপার।”
বিধিমালা অনুযায়ী শর্ত পূরণ ও বুয়েটের কারিগরি ছাড়পত্র থাকলেই কেবল নিবন্ধনের আবেদন বিবেচনা করা হবে, বলেন তিনি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এখনো প্রাথমিক প্রস্তুতির মধ্যেই আটকে আছে। কবে নাগাদ তারা নিবন্ধন শুরু করতে পারবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে পারেননি কর্মকর্তারা।
ডিএনসিসির উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মনোয়ার হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, নিবন্ধনের আবেদন ফরম ছাপতে দেওয়া হয়েছে। তবে চারটি জোন নির্ধারণসহ পুরো প্রক্রিয়া কীভাবে সাজানো হবে, তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
