সিংহ নদীতে কঙ্কাল মেলার ৬ মাস পর হত্যা রহস্য উদঘাটন

প্রেমিকা আঁখি আক্তার জবানবন্দিতে বলেছেন, প্রতারিত হওয়ায় রুমানকে হত্যা করেন তিনি। পরে স্বামীর সঙ্গে মিলে লাশ ফেলে দেন নদীতে।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 29 Nov 2023, 03:37 PM
Updated : 29 Nov 2023, 03:37 PM

কেরানীগঞ্জের সিংহ নদী খনন করতে গিয়ে মিলেছিল একটি কঙ্কাল; ছয় মাস পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভিস্টেগেশন (পিবিআই) জানাল, পরকীয়া প্রেমের জেরে প্রেমিকার হাতেই খুন ৩৯ বছর রুমান শিকদার।

প্রেমিকা আঁখি আক্তার (২৪) আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেছেন, প্রতারিত হওয়ায় রড দিয়ে মাথায় আঘাত করে রুমানকে হত্যা করেন তিনি। পরে স্বামী ওমর ফারুকের সঙ্গে মিলে লাশ ফেলে দেন নদীতে।  

বুধবার ঢাকায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভিস্টেগেশন (পিবিআই) সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে ওই হত্যারহস্য উদঘাটনের কথা জানান পিবিআই ঢাকা জেলার সুপার মো. কুদরত ই খুদা।

তিনি বলেন, গত ২১ মে দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানা এলাকায় সিংহ নদীতে ভেকু দিয়ে খনন করার সময় বাঘাশুরের পশ্চিমপাড়া ডাইঘাট মিন্টু আহম্মেদের বাড়ির সামনে নদীতে কাদা মাটির মধ্যে ওই কঙ্কাল পাওয়া যায়। খবর পেয়ে দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানা পুলিশ সেখানে যায়।

“একই এলাকার প্রায় দুইমাস ধরে নিখোঁজ রুমন শিকদারের মা, বাবা, স্ত্রী সন্তানেরা খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান। কঙ্কালের সাথে থাকা নেভি ব্লু শার্টের অংশবিশেষ দেখে প্রাথমিকভাবে তারা ধারণা করেন, সেটা রুমানেরই কঙ্কাল।”

পুলিশ তখন কঙ্কালের অংশবিশেষ সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়, ওই দেহাবশেষ রুমন শিকদারের। এরপর একটি মামলা হয় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায়। থানা পুলিশ তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পারে, রুমনের সাথে একই গ্রামের সদ্য দেশে ফেরা প্রবাসী ওমর ফারুকের স্ত্রীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল।

পরে পুলিশ ওমর ফারুক, তার স্ত্রী আঁখি আক্তার এবং ওমর ফারুকের প্রতিবেশী আলাল মোল্লাকে আটক করে জিজ্ঞাসবাদ করে। তারা কেউ তখন ঘটনার দায় স্বীকার করেননি।

তখন আঁখি ও আলালকে পুলিশ মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দিলেও ওমর ফারুককে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠায়। গত অগাস্ট মাসে এ মামলার তদন্তভার যায় পিবিআইয়ের হাতে।

পুলিশ সুপার মো. কুদরত ই খুদা জানান, তদন্তে নেমে তারা ফারুকের স্ত্রীকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখেন। কিছু তথ্য উপাত্ত পাওয়ার পর আঁখি আক্তার এবং আলাল মোল্লাকে ডেকে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আঁখি তখন হত্যার কথা স্বীকার করেন।

২২ নভেম্বর ওই দুইজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। তারা দুজনই আদালতে স্বীকারেক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।  

আঁখি আক্তারের জবানিতে খুনের বিবরণ

আঁখি আক্তার তার জবানবন্দিতে কী বলেছেন, তা সংবাদ সম্মেলনে তথ্য তুলে ধরেন পুলিশ সুপার কুদরত ই খুদা।

তিনি বলেন, ওমর ফারুক কাজের সূত্রে বিদেশ থাকা অবস্থায় রুমানের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন আঁখি। বিষয়টি জানতে পেরে দেশে ফিরে স্ত্রীকে বাসা থেকে বের করে দেন ওমর ফারুক।

পরে দুই পরিবারের মধ্যস্থতায় তারা আবার দাম্পত্য জীবন শুরু করেন। তবে কিছুদিনের মধ্যে ওমর ফারুক বুঝতে পারেন, তার স্ত্রী ও রুমানের প্রেম অব্যাহত আছে। এক পর্যায়ে আঁখি তার প্রেমিক রুমান শিকদারের সঙ্গে পালিয়ে যান।

ছয়-সাত দিন পর পাশের গ্রামে তাদের অবস্থান করার খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান ওমর ফারুক। তিনি স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেও স্থানীয় লোকজন তাদের বিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দেন। কিন্তু রুমান শিকদার তার স্ত্রী সন্তান থাকার কথা বলে আঁখিকে বিয়ে করতে অস্বীকার করেন। পরে আঁখি আক্তার স্বামীর কাছে মাফ চাইলে তাকে নিয়ে বাড়ি ফেলেন ওমর ফারুক।

পুলিশ সুপার কুদরত ই খুদা বলেন, ৬-৭ দিন একসঙ্গে থাকার বিষয়টি যেন কাউকে না বলেন, সেজন্য রুমানকে অনুরোধ করেছিলেন আঁখি ও তার স্বামী। কিন্তু রুমান কথা না রেখে এলাকার সবাইকে ঘটনা বলে দেয়। তাতে ক্ষিপ্ত হয়ে রুমানকে হত্যার পরিকল্পনা করার কথা জবানবন্দিতে বলেন আঁখি।

এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “ওমর ফারুক প্রায়ই রাতে নদীতে মাছ ধরতে যেতেন। সেই সুযোগটি কাজে লাগান আঁখি। গত ২২ মার্চ রাত ১২টার পরে মোবাইল ফোনে তিনি রুমানকে বাড়িতে ডেকে আনেন। তারপর পরিকল্পনা অনুযায়ী পেছন থেকে মাথায় রড দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করেন। পরে ফোনে স্বামীকে ডেকে আনেন।

“ওমর ফারুক বাসায় আসার পর লাশ দেখে সেটা গুম করার পরিকল্পনা করেন। এ কাজে সহযোগিতার জন্য প্রতিবেশী আলাল মোল্লাকে ডেকে নেন। পরে তারা লাশটি বস্তায় ভরে বাসার কাছে সিংহ নদীতে ফেলে দেন। প্রচুর কচুরিপানা থাকায় লাশ ঢাকা পড়ে যায়।”

পুলিশ সুপার কুদরত ই খুদা বলেন, “লাশ যেন ভেসে না ওঠে এবং ভেসে উঠলে কি করতে হবে, সে ব্যাপারে পরামর্শ করে ওমর ফারুক আর আলাল পালা করে নদীর পাড়ে পাহারা দিতেন। আলাল তার জবানবন্দিতে বলেছেন, নদীর ওই এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়ালেও কুকুর বা অন্য কোনো প্রাণী মারা গেছে বলে প্রচার চালান তারা।”