অষ্টমীতে সন্ধিপূজা-অঞ্জলিতে দুর্গা বন্দনা: 'অন্তরের মহিষাসুর' দমনের বার্তা ভারতীয় হাই কমিশনারের
“আমি এখানে ভারতীয় হাই কমিশনের প্রতিনিধি হিসেবে আসিনি। পরিবারের একজন সদস্য ও ভক্ত হিসেবে এসেছি।”
অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়ের প্রত্যয় নিয়ে দুর্গোৎসবের অষ্টমী তিথিতে দেবী দুর্গার বন্দনা করলেন বাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা।
সোমবার দুর্গাপূজার মহাঅষ্টমীতে সন্ধি পূজা ও কুমারী পূজা করা হয়; এ দিনটিকে শারদীয় দুর্গোৎসবের সবচেয়ে শুভ ও কাঙ্ক্ষিত দিন বলে বিশ্বাস সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
ঢাকার বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কের গুলশান-বনানী পূজা মণ্ডপে ভোর থেকে আসতে শুরু করেন ভক্তরা।
এই মণ্ডপের পুরোহিত সুনীল চক্রবর্তী মহাঅষ্টমীর আচার অনুষ্ঠান নিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পঞ্জিকা ও শাস্ত্রীয় সময়সূচি মেনে সকাল ৭ টা ৩৭ মিনিটের মধ্যেই দেবী দুর্গার মহাষ্টম্যাদি কল্পারম্ভ এবং মহাষ্টমীবিহিত পূজা সম্পন্ন হয়। এই পবিত্র সময়কে স্মরণ করে দেবীর চরণে ১০৮টি নীল পদ্ম নিবেদন করা হয়।
“এরপরই শুরু হয় অষ্টমীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ পুষ্পাঞ্জলি প্রদান। সকাল ৭ টা ৪০ মিনিট থেকে ৭ টা ৫৫ মিনিট পর্যন্ত নির্ধারিত সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই ভক্তরা উপবাস থেকে শুদ্ধ বস্ত্রে দেবী দুর্গার চরণে পুষ্প ও বেলপাতা অর্পণ করেন।”
পুষ্পাঞ্জলির সময় মণ্ডপজুড়ে ঢাকের বাদ্য, উলুধ্বনি, কাঁসর ঘণ্টার শব্দ এবং মন্ত্রোচ্চারণে ভক্তিঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
মহাঅষ্টমীর মূল আকর্ষণ সন্ধিপূজা। এই পূজার মেয়াদ ছিল সকাল ৭ টা ৫৫ মিনিট থেকে ৮ টা ৪৩ মিনিট পর্যন্ত। এসময় মণ্ডপে দেবীর পূজা অর্চনায় রত থাকেন আগতরা।
পুরোহিত সুনীল চক্রবর্তী বলেন, “শাস্ত্রানুসারে, অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট এই বিশেষ ৪৮ মিনিটের সন্ধিক্ষণেই দেবী ললাট থেকে চামুণ্ডা রূপ ধারণ করে চণ্ড ও মুণ্ডকে বধ করেছিলেন। এই পবিত্র সময়কে স্মরণ করে সারিবদ্ধভাবে জ্বালানো হয় ৬৪ টি মাটির প্রদীপ। সনাতনীরা বিশ্বাস করেন এ সময়ে আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে পুরো দেবীবাস।”
মহাঅষ্টমীর আরও কার্যক্রম নিয়ে মণ্ডপের আরেক পুরোহিত হৃদয় চক্রবর্তী বলেন,
“অন্ন, বস্ত্র ও নানা উপচারের পাশাপাশি এদিন অনুষ্ঠিত হয় দেবীর দশ হাতে বিদ্যমান দিব্য অস্ত্রের বিশেষ পূজা। অশুভ শক্তির বিনাশ ও সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতীকী রূপ হিসেবে ভক্তরা অঞ্জলি প্রদান শেষে দেবী দর্শনে মগ্ন হন।”
এদিন সকাল ৯ টায় পূজা মণ্ডপে আসেন ভারতীয় হাই কমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। সস্ত্রীক অঞ্জলি প্রদান করেন তিনি।
অঞ্জলি দিয়ে তিনি বলেন, “আমি এখানে ভারতীয় হাই কমিশনের প্রতিনিধি হিসেবে আসিনি। পরিবারের একজন সদস্য ও ভক্ত হিসেবে এসেছি।”
পূজা মণ্ডপ ও প্রতিমার কারুকার্যের প্রশংসা করে তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশ, সবখানেই রয়েছে আমাদের অসামান্য শিল্পকলা। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আয়োজকদের অনেক ধন্যবাদ। দুর্গাপূজা বা অন্যান্য উৎসবের মাধ্যমেই আমাদের শিল্পীরা তাদের দক্ষতা প্রমাণের বড় সুযোগ পান।
“এখানে এসে মনটা আনন্দে ভরে গেল। কি সুন্দর বানানো হয়েছে! এটাই তো হচ্ছে জীবন। অদ্ভুত! একদম অসাধারণ শিল্পকর্ম।”
এই প্রীতি ও সম্প্রীতির পরিবেশ যেন কেবল উৎসবের দিনে নয়, প্রতিদিন বজায় থাকে বলে প্রত্যাশা করেন ভারতীয় হাই কমিশনার।
তিনি বলেন, “পুজোয় অঞ্জলি দেওয়ার প্রকৃত অর্থ হল নিজের অহংকারকে ঈশ্বরের চরণে বিসর্জন দেওয়া এবং নিজেকে সমর্পণ করা। মহিষাসুর হল মানুষের ভেতরের অশুভ ও হিংসাত্মক চিন্তাভাবনা। দৈনন্দিন জীবনে মানসিক হিংসা ও কুচিন্তাকে বা নিজের ভেতরের এই 'মহিষাসুর'কে দমন করাই হলো পূজার প্রকৃত শিক্ষা।”
গুলশান-বনানী সর্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক বিনয় গোপাল রায় জানিয়েছেন, মহাঅষ্টমী উপলক্ষে সকাল থেকেই মণ্ডপে বিপুলসংখ্যক ভক্তের সমাগম ঘটেছে। সকাল সাড়ে ৭টায় প্রথম অঞ্জলির পর পরপর কয়েক ভাগে ভাগ করে ভক্তরা অঞ্জলি প্রদান করেন এবং সবার মাঝে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
তিনি বলেন, “ইতোমধ্যে ভারতের হাই কমিশনার সস্ত্রীক এসে আমাদের এখানে অঞ্জলি নিয়েছেন এবং সন্ধ্যায় ব্রিটিশ হাইকমিশনারের আসার কথা রয়েছে।”
উপচে পড়া ভিড় থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন বিনয় গোপাল।
হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, দশভূজা দেবী দুর্গা অসুর বধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতি শরতে কৈলাস ছেড়ে কন্যারূপে মর্ত্যলোকে আসেন। সন্তানদের নিয়ে পক্ষকাল পিতার গৃহে কাটিয়ে আবার ফিরে যান দেবালয়ে।
শুক্রবার ষষ্ঠীতে শুরু হয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিতা। এবারে সপ্তমীর তিথি দুদিন ধরে বিস্তৃত হওয়ায়, রোব ও সোমবার হয়েছে সপ্তমীর পূজা।
মঙ্গলবার হবে নবমীর পূজা। এরপর বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের সমাপ্তি হবে।
শাস্ত্র বলছে, এবার দেবী দুর্গা এসেছেন ঘোটকে (ঘোড়ায়) চড়ে এবং ফিরবেন নৌকায়।
