মহানবমীতে যজ্ঞের ধোঁয়া, ঢাকের বাদ্যে সিদ্ধেশ্বরীতে দুর্গার আরাধনা
শালগ্রাম শিলা ও দেবীর মহা স্নানের মধ্য দিয়ে মন্দিরে মহানবমীর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।
শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমী তিথিতে বিহিত পূজা এবং যজ্ঞের মাধ্যমে রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী কালী মণ্ডপে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা।
পৃথিবীর দুঃখ-দুর্দশা ঘুচে আগামী দিনগুলোতে শান্তির কামনায় দেবী দুর্গতিনাশিনীর সামনে করজোড়ে প্রার্থনা করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
তবে বিসর্জনের ক্ষণ এগিয়ে আসায় আনন্দের মাঝেও বাজছে বিদায়ের সুর।
মঙ্গলবার মহানবমীতে পূজা শেষের আবেগ ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব তুলে ধরে এ কথা বলেন সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির পরিষদের পুরোহিত শ্রী চন্দন চক্রবর্তী।
তিনি বলেন, “আজ মহানবমী, আগামীকাল বিজয়া দশমীতেই শেষ হচ্ছে দুর্গাপূজা। তবে এই কলিযুগে শত্রু বাইরে নয়, আসল শত্রু হল মানুষের ভেতরের কু-রিপু ও আসুরিক ভাব,”
অশুভ ও আসুরিক শক্তিকে বিনাশ করে অন্তরের শুভ শক্তিকে জাগিয়ে তোলার প্রার্থনায় মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর পর্যন্ত সিদ্ধেশ্বরী প্রাঙ্গণে হয় মহানবমীর মহাপূজা।
সকালে শালগ্রাম শিলা ও দেবীর মহা স্নানের মধ্য দিয়ে মন্দিরে মহানবমীর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর ষোড়শ উপাচার ও বিহিত পূজার মাধ্যমে দেবী দুর্গার নবম রূপ মা সিদ্ধিদাত্রীর আরাধনা করা হয়। সকাল থেকেই ভক্তরা উপবাস রেখে দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করেন।
পূজার মূল আকর্ষণে দুপুর ১২টার মধ্যে সম্পন্ন হয় মহা হোম বা যজ্ঞ।
পূজা ও যজ্ঞের তাৎপর্য তুলে ধরে পুরোহিত শ্রী চন্দন চক্রবর্তী আরও বলেন, “আজ মহানবমী। যজ্ঞ ও হোমের মধ্য দিয়ে আমাদের কল্প অনুসারে পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্তির পথে। সন্ধ্যায় শুধু মায়ের আরতি হবে এবং আগামীকাল দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে বিজয়া দশমী পালিত হবে।
“সত্যযুগে মানুষ ও অসুরের মাঝে পার্থক্য ছিল আকাশ-পাতাল। ত্রেতায় তা ছিল রাম-রাবণের রাজ্যভিত্তিক যুদ্ধ এবং দ্বাপরে কৃষ্ণ-কংসের বংশগত বিরোধ। কিন্তু এই কলিযুগে আসল শত্রু আমাদের ভেতরেই। বর্তমান বিশ্বে যে বিভীষিকাময় হানাহানি আমরা দেখি, তার মূলেও রয়েছে মানুষের এই আসুরিক স্বভাব। তাই বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ ভক্ত মায়ের কাছে যে আরাধনা করছেন, তা মানুষের ভেতরের এই আসুরিক ভাব বিনাশেরই প্রার্থনা।”
ঢাকের বাদ্যি, ধূপের ধোঁয়া আর বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণে চারদিকের এই উৎসবমুখর পরিবেশের অন্তিম পর্ব চলছে।
মণ্ডপে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যেও দেখা গেছে উৎসবের আনন্দ আর বিদায়ের সুর।
পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থী অনিল দেবনাথ বলেন, “নবমী মানেই তো উৎসবের শেষ লগ্ন। আনন্দ হচ্ছে, আবার মন খারাপও লাগছে কারণ কালই মা চলে যাবেন। মায়ের চরণে প্রার্থনা করি, পৃথিবীর সব হানাহানি ও হিংসা যেন বন্ধ হয়।”
সন্ধ্যায় মন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হবে ঐতিহ্যবাহী ধুনুচি নাচের। কাঁসা ও ঢাকের তালে তালে ধূপদানিতে ধুনোর ধোঁয়ায় মেতে ওঠেন সব বয়সের ভক্তরা। নবমীর রাত পোহালেই বিজয়া দশমী—দেবী দুর্গার মর্ত্য ছেড়ে কৈলাসে ফিরে যাওয়ার দিন।
সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও উৎসবের পরিবেশ নিয়ে সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির কমিটির যুগ্ম সম্পাদক দিব্যেন্দু শেখর অর্ঘ্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আজ মহানবমীর সকালে নবমী বিহিত পূজা ও যজ্ঞ অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ভোগ নিবেদন শেষে ভক্তদের মাঝে প্রসাদ বিতরণ করা হচ্ছে।
“আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা ও সার্বিক পরিস্থিতিতে এ বছরের পূজা খুব সুন্দর ও নিরবচ্ছিন্নভাবে কেটেছে। আগামীকাল দুপুরে আমরা প্রতিমা নিয়ে রওনা হবো এবং ওয়াইজঘাটে বিসর্জনের মাধ্যমে আমাদের ছয় দিনের এই পূজার আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্ত হবে।”
শুক্রবার ষষ্ঠীতে শুরু হয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিতা। এবারে সপ্তমীর তিথি দুদিন ধরে বিস্তৃত হওয়ায়, রোব ও সোমবার হয়েছে সপ্তমীর পূজা।
নবমী পেরিয়ে বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের সমাপ্তি হবে।
শাস্ত্র বলছে, এবার দেবী দুর্গা এসেছেন ঘোটকে (ঘোড়ায়) চড়ে এবং ফিরবেন নৌকায়।
