৫ মার্চ ১৯৭১: ‘জয় বাংলার’ জয়

একাত্তর সালের ৫ মার্চ দৈনিক ইত্তেফাকের ব্যানার হেডলাইন ছিল- ‘জয় বাংলার’ জয়।

সাজিদুল হকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 5 March 2021, 02:56 AM
Updated : 5 March 2021, 02:56 AM

রাজনৈতিক ভাষ্যকার ‘ক্রেডিট লাইন’ দিয়ে সেদিন ওই প্রতিবেদনের শুরুর দিকের একটি লাইন ছিল- “ক্ষমতার দুর্গ নয়, জনগণই যে দেশের সত্যিকার শক্তির উৎস, বাংলাদেশের বিগত তিন দিনের ঘটনাবলী নিঃসন্দেহে সপ্রমাণিত হয়েছে।”

১৯৭১ সালের মার্চের প্রতিটি দিনই ছিল অগ্নিঝরা। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বলা হয়, “বাংলার মানুষের দুর্জয় আন্দোলন দেখে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে (পশ্চিম পাকিস্তান) নতুন করে চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছে।”

ওই দিন ইত্তেফাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়। আগের দিনের ওই বিবৃতির খবরের শিরোনাম ছিল, ‘সংগ্রামী জনতার প্রতি নেতার অভিনন্দন।’

মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের জনসংযোগ কর্মকর্তা (স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়) রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী তার ’৭১ এর দশমাস’ বইতে লিখেছেন, ১৯৭১ এর ৫ মার্চ টঙ্গীতে সেনাবাহিনীর গুলিতে বহু শ্রমিক আহন হন, নিহত হন চারজন।

সন্ধ্যায় সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়, ঢাকায় সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে হরতালের পর ব্যাংক খোলা থাকে। মসজিদে মসজিদে জুমার নামাজের পর শহীদের আত্মার শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত হয়। ঢাকাসহ সারাদেশে প্রতিবাদ সভা ও শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।

রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী লিখেছেন, সে দিন বিভিন্ন জেলায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধিকার আন্দোলনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিকেলে কবি সাহিত্যিক ও শিক্ষকরা মিছিল নিয়ে রাজপথে নেমে আসেন। শহীদ মিনারে আহমদ শরীফের নেতৃত্বে এক সভায় তারা স্বাধীনতার শপথ নেন।

ঢাকায় ছাত্রলীগের উদ্যোগে লাঠি মিছিল বের হয়।

লাহোরে দেশের পূর্বাঞ্চলে সাম্প্রতিক আন্দোলনে নিহত শহীদদের গায়েবানা জানাজা হয়। সঙ্কটময় মুহূর্তে দেশের সংহতির জন্য বিভিন্ন মসজিদে হয় বিশেষ মোনাজাত।

পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ভুট্টো রাওয়ালপিন্ডির প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আলোচনা করেন।

অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল আসগর খান বিকেলে করাচি থেকে ঢাকায় পৌঁছোন। তিনি রাতে বঙ্গবন্ধুর সাথে ধানমণ্ডির বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন।

রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিদেশি বেতারে প্রচারিত ‘শেখ মুজিব জনাব ভুট্টোর সঙ্গে ক্ষমতা ভাগ ভাটোয়ারা করতে রাজি আছেন’ সংক্রান্ত সংবাদকে ‘কল্পনার ফানুস’ আখ্যায়িত করেন।

তখনকার ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমদ ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দান থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সরাসরি রিলে করার জন্য ঢাকা বেতার কেন্দ্রের প্রতি আহবান জানান।

রাতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ এক বিবৃতিতে বলেন, ঢাকা চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর সিলেটসহ বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানে মিলিটারির বুলেটে নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষ, শ্রমিক, কৃষক ও ছাত্রদের হত্যা করা হচ্ছে। নির্বিচারে নিরস্ত্র মানুষকে এভাবে হত্যা করা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ছাড়া আর কিছুই নয়।

রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে পিপলস পার্টির প্রধান ভুট্টোর বৈঠক শেষে পার্টির মুখপাত্র আবদুল হাফিজ পীরজাদা মন্তব্য করেন, জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত রাখার প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া যেভাই বিচার করা হোক না কেন, তা অত্যন্ত অবাঞ্ছিত এবং আদৌ যুক্তিযুক্ত নয়।

কিন্তু বাঙালি ততদিনে উপলব্ধি করছে, জুলুমের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার একমাত্র পথ সশস্ত্র সংগ্রাম।

তথ্যসূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ওয়েবসাইট, রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদীর ‘৭১ এর দশমাস’।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক