কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সম্ভাবনার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও সাইবার ঝুঁকিও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা
এআইয়ের কারণে দেশের শ্রমনির্ভর খাতগুলোতে শিগগিরই ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখছেন না বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন।
প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সময় সাশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার যখন বাড়ছে, তখন এর সম্ভাবনার পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ঝুঁকির কথাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি এর ঝুঁকি মোকাবেলায় নীতিমালা তৈরি এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলার দিকে নজর দিতে হবে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬’-এর এক অধিবেশনে বক্তারা এ বিষয়ে কথা বলেন।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) যৌথ আয়োজনে দিনব্যাপী এ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
‘ট্রান্সফরমেশন অ্যান্ড নেভিগেটিং এআই রেভল্যুশন: অ্যাপ্লিকেশন, প্রসপেক্টস অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস’ শীর্ষক অধিবেশনে দর্শক সারি থেকে আবু হুরায়রা বলেন, “এআই আমাদের অবশ্যই লাগবে। কিন্তু সম্ভাবনা থাকলেও তা ঝুঁকিও আনছে। সাইবার ঝুঁকি যেমন রয়েছে, তেমনি কর্মসংস্থানেও ঝুঁকি তৈরি করবে। তা বিবেচনায় নিয়েই সরকারের নীতিনির্ধারণ করা উচিত।”
প্রশ্নোত্তর পর্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, সরকারের কাজ হচ্ছে এআই ব্যবহারের পরিবেশ তৈরি ও সহায়তা করা। সরকার সে কাজ করছে।
তবে চিকিৎসাসহ বিভিন্ন খাতে চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল পাওয়া যাচ্ছে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, সরকারি কাজেও এআই ব্যবহারের সময় এসেছে। এতে সময় বাঁচবে এবং অনেক কাজ দ্রুত করা সম্ভব হবে।
“আমাদের সভাগুলোর মিনিটস (সারসংক্ষেপ) তৈরি করতে কর্মকর্তাদের ৫-৭ দিন সময় লেগে যায়। এখন বাংলায় যদি এমন এআই তৈরি করতে পারি, যেটা মিটিং শেষ হলেই মিনিটস তৈরি করে দেবে।”
এআইয়ের ঝুঁকির দিকটিও বিবেচনায় রাখার কথা বলেন আনোয়ার হোসেন। তার ভাষায়, “এআই বাবল হয় কি না, তাও দেখতে হবে। তবে, আমরা দুয়ার বন্ধ করব না, খোলা রাখব। কতটুকুই নেব, তার জন্য আলোচনা দরকার।”
পোশাকশিল্পে এআই ব্যবহারের প্রভাব নিয়ে তিনি বলেন, গার্মেন্টস খাতে কর্মীর সংখ্যা কমে যেতে পারে, তবে এআইয়ের ব্যবহার এখনো ব্যয়বহুল। এআইয়ের কারণে কোনো খাতে কর্মসংস্থান কমলেও অন্য খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পোশাকশিল্পে রোবটের ব্যবহার বাড়লেও এর প্রাথমিক বিনিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অনেক বেশি বলে মন্তব্য করেন সচিব। ফলে শ্রমনির্ভর খাতগুলোতে শিগগিরই ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আশঙ্কা নেই বলে মনে করেন তিনি।
তবে ভবিষ্যতে শুধু কর্মী হলেই চলবে না, কোনো না কোনো বিষয়ে যে দক্ষতা অর্জন করতে হবে, সে কথাও বলেন আনোয়ার হোসেন।
বাংলাদেশি স্টার্টআপ মার্কোপোলো এআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা তাসফিয়া তাসবিন বলেন, এআই খাতে বিনিয়োগ ও এর ব্যবহার বাড়ানোর এখনই সময়।
বাংলাদেশে, বিশেষ করে ই-কমার্স খাতে অধিকাংশ লেনদেন যে এখনো নগদে হয়, সে কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এআইয়ের ব্যবহারের মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সরকারি কাজে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি এ বিষয়ে নীতিমালা তৈরির দাবি জানান দর্শক সারিতে থাকা মোহাম্মদ মোস্তফা। এ জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠনেরও প্রস্তাব দেন তিনি।
এআই কোম্পানি ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাইসুল কবির বলেন, সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকবেই। সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্সে বড় ধরনের সাইবার চুরির ঘটনা ঘটেছে। তবে ঝুঁকি থাকলেও এআইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রযুক্তির এই পরিবর্তন গ্রহণ করতে পারলে বাংলাদেশ সমৃদ্ধ হবে।
অধিবেশনে বাংলাদেশ বিমান ও রেলওয়ের টিকিট বিক্রিতে স্বচ্ছতা আনা এবং পুঁজিবাজারের লেনদেন পরিচালনায় এআই ব্যবহারের দাবি জানান বক্তারা।
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদের সঞ্চালনায় অধিবেশনে আরও বক্তব্য দেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক জুলকারিন জাহাঙ্গীর, রেভোরার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শুভ রহমান এবং রাইড শেয়ারিং ও কুরিয়ার সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান পাঠাওয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ।
