২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮ আশ্বিন ১৪৩৩

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী মাজার ভাঙা ও হত্যার তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন সারা হোসেনের

“এক বছর হয়ে গেল আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার পাইনি,” বলেন দীপু দাসের স্ত্রী মেঘনা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 23 Sep 2026, 11:26 PM

Updated : 23 Sep 2026, 11:26 PM

মাজার ভাঙা, দীপু চন্দ্র দাস হত্যাসহ গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ঘটনাগুলোর তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সারা হোসেন।

বুধবার বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় সংগঠনটির সম্মানীয় নির্বাহী পরিচালক বলেন, ৫ অগাস্টের পরের ঘটনাগুলোর কোনো তদন্ত প্রতিবেদন এখনও পাওয়া যায়নি।

পুলিশের আইজিপির প্রতিনিধির কাছে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, “পুলিশ বাহিনীর কাছে মোবাইল ফুটেজ বিশ্লেষণের সক্ষমতা থাকার পরও কেন তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে না এবং তদন্ত কেন এগোচ্ছে না, তা জনসম্মুখে স্পষ্ট করা উচিত।”

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণের মতো একটি স্থায়ী পুনর্বাসন বা ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান সারা হোসেন।

প্রতিবেশী ও অধিকারকর্মীদের সমন্বয়ে আগাম সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার তাগিদ দিয়ে ব্লাস্টের এই কর্মকর্তা বলেন, যেসব রাজনীতিক ও সংসদ সদস্য হামলাকারীদের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশে মব সহিংসতার বিভিন্ন ঘট্না ঘটে। মাজার ভাঙা, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে হত্যা, হামলা, অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনায় আতঙ্কের পরিস্থিতি তৈরি হয়।

বিচারহীনতার অভিযোগ

মতবিনিময় সভায় ময়মনসিংহের ভালুকায় পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার শিকার দীপু দাসের স্ত্রী মেঘনা দাস ও ভাই অপু দাস এক বছরেও বিচার না পাওয়ার অভিযোগ করেন।

গত ১৮ ডিসেম্বর দীপু দাসকে পিটিয়ে হত্যার পর তার মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং হত্যার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয় বলে সভায় জানানো হয়।

এ ঘটনায় তার ছোট ভাই অপু চন্দ্র দাস বাদী হয়ে ১৪০ থেকে ১৫০ জন অজ্ঞাতনামার বিরুদ্ধে মামলা করেন। এ পর্যন্ত ২৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১২ জন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন এবং দুজন হাই কোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন।

আগামী ২৬ ডিসেম্বর মামলাটির অভিযোগ গঠনের শুনানির দিন রয়েছে।

অপু দাস বলেন, “প্রায় এক বছর হয়ে গেল আমরা এখনো কোনো বিচার পাইনি। শুধু আসামি ধরা হচ্ছে আর ছাড়া হচ্ছে।”

দীপু দাসের স্ত্রী মেঘনা দাস বলেন, “এক বছর হয়ে গেল আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার পাইনি।”

সরকার সংসার চালানোর জন্য একটি চাকরি এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটি বাসা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা এখনও দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও মানবাধিকারকর্মী অধ্যাপক মেঘনা গুহঠাকুরতা মতবিনিময় সভায় প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

তিনি বলেন, দেশের সাত জেলায় সংখ্যালঘু এবং ১২টি জেলায় মাজারে সংঘবদ্ধ ‘মব অ্যাটাক’ হয়েছে। এসব হামলায় লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও বিগ্রহ চুরির পাশাপাশি ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগও যুক্ত ছিল।

মাজারে হামলা ও পুলিশের ‘ব্যর্থতা’

মাজারে হামলা নিয়ে একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন সেন্টার ফর ইসলামিক হেরিটেজের সমন্বয়কারী ইমরান হোসেন তুষার।

তিনি বলেন, ৫ অগাস্টের পর সারা দেশে ১০৩টি মাজারে হামলা হয়েছে। এসব হামলায় প্রায় ৫০টি স্থানে ওরশ ও মেলা বন্ধ হয়ে গেছে, ১২টি মাজার শতভাগ পরিত্যক্ত হয়েছে। হামলায় ১২৩ জন আহত এবং তিনজন নিহত হয়েছেন।

হুমকির কারণে অন্তত ৬০টি মাজার ও দরগাহের গদিনিশীন পীর ও প্রধান খাদেম এখনও নিজ স্থানে ফিরতে পারেননি বলেও দাবি করেন ইমরান হোসেন।

তার দাবি, বর্তমান সংসদের ২৯৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ৩১ জন এসব হামলাকে উদ্বুদ্ধ করে বক্তব্য দিয়েছেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছয়জন জাতীয় নেতা মাজার হামলাকারীদের পক্ষে কথা বলেছেন। এত ঘটনার পরও মামলা হয়েছে মাত্র ১৩টি।

মাজারে হামলার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ইমরান হোসেন বলেন, “৯৯ শতাংশ ঘটনায় পুলিশের ব্যর্থতা ছিল।”

অন্তত ৫০ শতাংশ ঘটনায় পুলিশ নিজেই ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ হিসেবে কাজ করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার প্রসঙ্গে অধ্যাপক মেঘনা গুহঠাকুরতা বলেন, যশোর থেকে তথ্য পাওয়া গেছে, ৫ অগাস্টের পরের ঘটনায় ওপর মহলের নির্দেশে পুলিশ এফআইআর নেওয়া থেকে বিরত থেকেছে।

সভায় উপস্থিত পুলিশ সদরদপ্তরের আইন কর্মকর্তা মনছুর উদ্দিন আলোচকদের অভিযোগ ও প্রস্তাবগুলো নোট করেছেন জানিয়ে বলেন, বিষয়গুলো তিনি পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে তুলে ধরবেন।

আগাম সতর্কতা চালুর প্রস্তাব

হামলা প্রতিরোধে মেঘনা গুহঠাকুরতা ‘আর্লি ওয়ার্নিং’ বা আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘৃণা ছড়ানো, বিপুলসংখ্যক যানবাহন ভাড়া করা, পেট্রোল ও রাসায়নিক কেনা বা চুরি এবং হঠাৎ জমায়েতের মতো সূচকগুলো বিশ্লেষণ করে আগাম সতর্কতার ব্যবস্থা গড়ে তোলার তাগিদ দেন তিনি।

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, ৫ অগাস্টের পর আহমদীয়া সম্প্রদায়, মন্দির ও মাজারে যে হামলা হয়েছে, তাতে রাষ্ট্র পরিচালনা ও রক্ষার দায়িত্বে থাকা সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

এসব হামলার ঘটনায় হওয়া মামলাগুলোর ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই কোনো অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি এবং জিডিগুলোরও কোনো অগ্রগতি নেই বলে তিনি দাবি করেন।

রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ব্লাস্ট আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, ব্লাস্টের উপদেষ্টা আহমাদ ইব্রাহীম, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক মো. ইজাজুল ইসলাম, ব্লাস্টের প্যানেল আইনজীবী ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের চেয়ারপারসন শিরীন পারভিন হক, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন।