Published : 28 Mar 2026, 01:47 AM
একাত্তরে পাকিস্তানের চালানো হত্যাযজ্ঞের বিচার দাবিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে সমর্থন জানিয়েছে ভারত।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল শুক্রবার নয়া দিল্লিতে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, একাত্তরের ঘটনাগুলো উপেক্ষা করা যায় না।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “অপারেশন সার্চলাইট’-এর সময় পাকিস্তান যে ভয়াবহ নৃশংসতা চালিয়েছিল, তা সম্পর্কে বিশ্ব অবগত।
“ওই অভিযানে বাংলাদেশে লাখো নিরীহ মানুষ নিহত হন এবং নারীদের ওপর ব্যাপক যৌন সহিংসতা চালানো হয়। একই সঙ্গে কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।”
জয়সওয়াল বলেন, “এই নৃশংসতা বিশ্ব বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান আজও তাদের অপরাধ অস্বীকার করে যাচ্ছে। ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষায় আমরা বাংলাদেশের পাশে আছি।”
পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী বাঙালির আন্দোলন কঠোরহস্তে দমনের জন্য একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে নারকীয় হত্যাযজ্ঞের সূচনা করে পাকিস্তানি বাহিনী।
সেই রাতে পৃথিবীর ইতিহাসের ভয়াবহতম গণহত্যার শিকার হয় স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশের মানুষ। সশস্ত্র পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ট্যাংক ও সাঁজোয়া বহর নিয়ে পথে নামে।
‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে কুখ্যাত অভিযানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, পিলখানাসহ ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় নারকীয় গণহত্যা চালানো হয়। ঢাকার রাস্তায় পড়ে থাকে অগণিত লাশ। অসংখ্য ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বাঙালির প্রাণের শহীদ মিনার।
এ অপারেশনের উদ্দেশ্য ছিল ঢাকাসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান শহরগুলোতে আওয়ামী লীগ নেতা ও ছাত্র নেতা এবং বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের গ্রেপ্তার ও হত্যা, সামরিক-আধা সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের নিরস্ত্রীকরণ, অস্ত্রাগার, রেডিও ও টেলিফোন এক্সচেঞ্জ দখলসহ প্রদেশের সামগ্রিক কর্তৃত্ব গ্রহণ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলন কঠোর হস্তে দমন করে প্রদেশে পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।

সেনাবাহিনী সেই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, শিক্ষকদের আবাসিক এলাকা, এবং বস্তিবাসীর ওপর নজিরবিহীন নৃশংসতা চালায়।
রাত ১টার পর পাকিস্তানের সেনারা ট্যাংক আর সাঁজোয়া যান নিয়ে ধানমণ্ডির বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।
২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান।
এরপর নয় মাসের যুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মদান, আড়াই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি এবং জাতির অসাধারণ ত্যাগের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।
১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় সাংবাদিক সায়মন ড্রিংয়ের করা প্রতিবেদনে বলা হয়, “আল্লাহর নামে আর অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষার অজুহাতে ঢাকা আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত এক সন্ত্রস্ত নগর।
“পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুর ও ঠাণ্ডামাথায় গোলাবর্ষণের ২৪ ঘণ্টা পর, অন্তত ৭ হাজার মানুষ মৃত, বিশাল এলাকা মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার সংগ্রামকে নৃশংসভাবে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
২৫ মার্চ রাতের হত্যাযজ্ঞের যেই দিনটি বাংলাদেশ স্মরণ করে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে।
এ বছরে কাল রাতের স্মরণে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “২৫ মার্চের গণহত্যা ছিল একটি সুপরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ। সুপরিকল্পিত এ হত্যাযজ্ঞ কেন প্রতিরোধ করা গেল না এ ব্যাপারে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃশ্যমান ভূমিকা এখনো ইতিহাসের গবেষণার বিষয়।”
শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্রিফিংয়ে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে বহুমাত্রিকভাবে বজায় রাখার পাশাপাশি তা আরও জোরদার ও সম্প্রসারণ করতে চায় ভারত।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে একটি নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। আমাদের লোকসভার স্পিকার ওই সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তার মাধ্যমে একটি অভিনন্দনপত্র পাঠিয়েছেন এবং কীভাবে আমরা এই সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে চাই, সে বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরেছেন।
“উভয় পক্ষেই আলোচনা চলছে। আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের বহুমাত্রিক সম্পর্ক শুধু বজায় রাখতে নয়, বরং তা আরও শক্তিশালী ও সম্প্রসারিত করতে চাই।”