Published : 21 Apr 2026, 06:12 PM
জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাহমিদ মুবিন রাতুলকে হত্যাচেষ্টার মামলায় দেড় মাসের মেয়েকে নিয়ে কারাগারে গেলেন যুব মহিলা লীগের কর্মী শিল্পী বেগম।
মঙ্গলবার শুনানি নিয়ে তার জামিন আবেদন নাকচ করে দেন ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদ।
শিল্পী বেগম ঢাকা মহানগর উত্তর যুব মহিলা লীগের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। সোমবার সন্ধ্যায় তেজকুনিপাড়ার রেলওয়ে কলোনি এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মঙ্গলবার তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা তেজগাঁও থানার এসআই শেখ নজরুল ইসলাম।
আবেদনে বলা হয়, মামলার ঘটনায় এ আসামির জড়িত থাকার বিষয়ে যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার সন্ধ্যায় তাকে নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। আসামি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন বলে তদন্তে জানা গেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখা বিশেষ প্রয়োজন।
দুপুর ২টার দিকে আসামিকে এজলাসে তোলা হয়। শিল্পীর স্বামী, বোন, ননদ, খালাসহ স্বজনরা আদালতে হাজির হন।
তারা বলছিলেন, গেল মাসের ৪ তারিখে আদ-দ্বীন হাসপাতাল সিজারিয়ানের মাধ্যমে জন্ম নেয় শিশু; মাতৃদুগ্ধ পান করে। বাথরুমে পড়ে বাম হাত ভেঙে গেছে শিল্পীর। বাচ্চাকে ঠিকমত কোলেও নিতে পারে না, একা সামলাতে পারেন না।

শিল্পীর পক্ষে তার আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি জামিন চেয়ে আবেদন করেন।
শুনানিতে তিনি বলেন, “তার ১ মাস ১৬ দিনের কন্যা সন্তান রয়েছে। তাকে সিজার করা হয়েছে। যেকোনো শর্তে তার জামিন প্রার্থনা করছি।”
শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন নাকচ করে আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়।
জামিন নাকচের আদেশ শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন শিল্পী। শিল্পী অসুস্থ থাকায় আদালতপাড়ায় স্বজনরাই বাচ্চাকে কোলে করে রাখেন। কান্নাকাটি করলে বাচ্চাকে দুধ পান করান তিনি।
শিল্পী বলেন, “সিজারের কাটা জায়গায় এখনো ব্যথা করে। বাচ্চাকে ঠিকমত খাওয়াতে পারি না। ও তো মরে যাবে।
“আমার বাচ্চা মরে যাবে। আমার হাতে সমস্যা, বাচ্চা পালতে পারি না। ওকে আমি আমার সাথে নেব না।”
বিকাল ৩টা ১২ মিনিটের দিকে শিল্পীকে আদালত থেকে বের করে সিএমএম আদালতের হাজতখানায় নেওয়া হয়। আদালতের চতুর্থ তলা থেকে কাঁদতে কাঁদতে বাচ্চাকে কোলে করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকেন।আর বলেন, “রাজনীতির কারণে আমার এ অবস্থা। রাজনৈতিক কারণে বাচ্চাসহ কারাগারে যেতে হচ্ছে৷
“জেলখানায় নিয়ে গেলে আমার বাচ্চাটা মরে যাবে। ওরে আমি আমার সাথে নেব না।”
এসময় পুলিশ সদস্যরা তাকে খুব দ্রুত হাজতখানায় নিয়ে যান। বাচ্চাকে রেখে যাবেন বলে তার দুই স্বজনও হাজতখানায় যান। ‘বাচ্চাসহ কাস্টডি’ লেখা থাকায় পরে অবশ্য বাচ্চাসহ মাকে কাশিমপুর কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
শিল্পীর স্বামী রহিম হোসেন সোহাগ বলেন, “তিন ছেলের পর আমার এ মেয়েটার জন্ম। তাকেসহ আমার স্ত্রীকে কারাগারে যেতে হচ্ছে। আমার সাড়ে ৪ বছরের ছোট ছেলের হাতে হাড় বাড়ছে।
“শনিবার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার হাতে অপারেশন হয়েছে। আর তার মা আজ কারাগারে। দুই ছেলেও মায়ের জন্য কান্নাকাটি করছে। কী করব বুঝতে পারছি না।”
শিল্পীর খালা সুমি খানম বলেন, “ও তো সিজারের রোগী। চার মাস ডাক্তার রেস্টে থাকতে বলেছে। ও তো ঠিক মত বসতেই পারে না। হাতে সমস্যা। বাচ্চাটার যত্ম নিবে কেমনে?
“জেলখানায় গেলে গরমে বাচ্চাটা মরেই যাবে। আমরা বাচ্চাকে রেখে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ আমাদের দিল না। কী হবে, আল্লাহ ভালো জানেন।”
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চানখারপুল এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাহমিদ মুবিন রাতুল। সহপাঠীরা তাকে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান৷ সেখানে ছাত্রলীগের অসংখ্য নেতা-কর্মী তাদের আক্রমণ করেন।
পরে আসামি শিল্পীর নির্দেশে ২৩ জুলাই সন্ধ্যায় এজাহারভুক্ত আসামিরাসহ অচেনা ১২০/১৩০ জন ওই শিক্ষার্থীর তেজগাঁওয়ের বাসায় হামলা চালান। বাসার আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিক্স জিনিসপত্র ভাংচুর করায় পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। তিন লাখ টাকা মূল্যের বিভিন্ন মালামাল লুটপাট ও চুরি করে নিয়ে যান আসামিরা। শিল্পী ও অন্য আসামিরা ওই শিক্ষার্থীর বাবা সোহেল রানাকে এলোপাথাড়ি মারপিট করেন।
এ ঘটনায় গত বছরের ২৫ জানুয়ারি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ১০৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অচেনা ১২০/১৩০ জনকে আসামি করে শিক্ষার্থী রাতুলের মা শাহনুর খানম তেজগাঁও থানায় মামলা করেন।