Published : 22 Dec 2025, 10:17 PM
প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পেছনে ‘সরকারের একটি অংশের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে’ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেছেন, “এই সংশ্লিষ্টতা ছাড়াও সমাজে এটার পক্ষে সম্মতি তৈরি করা হয়েছে অনেকদিন ধরেই এবং এটার সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যাকআপও আছে। এই তিনটা ঘটনা একসঙ্গে না ঘটলে এত বড় সাহস সেই রাতে (হামলা-ভাঙচুর) কারও পক্ষে করা সম্ভব হত না।”
সংবাদমাধ্যম দুটির ওপর আক্রমণের প্রতিবাদে সোমবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এক সভায় কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। নিউজ পেপার্স ওনার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) ও সম্পাদক পরিষদ এ প্রতিবাদ সভা আয়োজন করে।
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে আক্রমণের ঘটনাকে ‘পুরোপুরি পরিকল্পিত’ বলে মনে করেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, “খুব বেশি মানুষ, কয়েক হাজার মানুষ গিয়ে এটা ঘটিয়েছে এরকমও না। ফলে পুরো ঘটনাটাই পরিকল্পিত ছিল। শরীফ ওসমান হাদির একটা অ্যাক্সিডেন্ট হতে পারে এবং হওয়ার পরে কী কী হতে পারে এবং কী কী ঘটনা ঘটানো হবে, এটার একটা চক্রান্ত পরিকল্পনা আগে থেকেই তৈরি হয়েছে।”
মাথায় গুলিবিদ্ধ ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বৃহস্পতিবার রাতে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এর প্রতিবাদে সোমবার ‘মব ভায়োলেন্সে আক্রান্ত বাংলাদেশ’ শিরোনামে প্রতিবাদ সভা করেছে নোয়াব ও সম্পাদক পরিষদ।
সেখানে জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারির নেতাদের একজন নাহিদ ইসলাম বলেন, “সর্বোপরি আমরা যে পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়িয়েছি, তা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। দুর্ভাগ্যজনক কারণ, এই পুরো পরিস্থিতির সঙ্গেই আমাদের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং তার পরবর্তী সময়ে যেই পরিবেশ ও বাংলাদেশ প্রত্যাশা করেছিলাম, আমরা সেই দিকে আগাচ্ছি না, এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক।
“আরও দুর্ভাগ্যজনক যারা এই ঘটনাটা (সংবাদমাধ্যমে হামলা) সে রাতে ঘটিয়েছে, বা যারা প্রথম আলো ডেইলি স্টারসহ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা করেছে, তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্লোগানগুলোকেই ব্যবহার করেছে। শরীফ ওসামন হাদির মৃত্যুকেই ব্যবহার করেছে এবং আমাদের স্লোগানগুলোকে ব্যবহার করে তারা সেখানে আক্রমণ করেছে। তারা সেটার (আক্রমণের) পক্ষে সম্মতি তৈরি করেছে। ঘটনাগুলো দেখে আমাদের কাছে এটাই মনে হয়েছে।”
নাহিদ বলেন, “দুর্ভাগ্যজনক যে জুলাইয়ের নাম বা শরীফ ওসমান হাদিকে ব্যবহার করে এটা ঘটানো হল। ফলে আমরা মনে করি, আমাদের সবারই এটার পেছনে দায় আছে। আমাদের অনেক বেশি দায় আছে, যারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেছিলাম। ব্যক্তিগতভাবে আমি তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলাম।”
‘মব ভায়োলেন্স’ শব্দবন্ধ তিনি বলেন, “আমাদের জন্য আরও দুর্ভাগ্যজনক, আজকে যে শব্দটা ব্যবহার করছি ‘মব ভায়োলেন্স’, এই শব্দটার সঙ্গে প্রথম থেকে আমি একমত হতাম না বা এটার বিরোধিতা করতাম। আমরা যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলাম, তাদের পক্ষ থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে প্রথম থেকে বলা হয়েছে ‘মবোক্রেসি’। ফলে আমরা প্রথম থেকেই বলেছি যে এটা ‘মবোক্রেসি’ না।
“আমরা অনেক কিছু বলেছি- গণঅভ্যুত্থান, বিপ্লব, বিপ্লব পরবর্তী পরিস্থিতিতে অনেক কিছু হয়। পুলিশ নাই, মানুষের অনেক ক্ষোভ, ষোলো বছরের ক্ষোভ। দেড় বছর পার হয়ে গেছে, এখন যেটা হচ্ছে সম্পূর্ণভাবে পরিকল্পিত অপরাধ হচ্ছে এবং পুরো দেশের রাজনীতি নির্বাচন একদিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এ পরিকল্পনা, চক্রান্ত।”
সংবাদমাধ্যমে হামলার ঘটনার তদন্ত ও বিচার দাবি করে তিনি বলেন, “আমাদের সবার এই জায়গা থেকে দায়িত্ব নেওয়া উচিত এবং এই ঘটনা যারা সে রাতে ঘটিয়েছে, খুবই স্পষ্ট যে কারা সেটার পক্ষে সম্মতি তৈরি করেছে, কারা সে রাতে সেখানে গিয়েছে, লেখালেখি করেছে।
“আমার মনে হয় সেটা সরকারের উচিত হবে, উচিত না শুধু, সবাই মিলে সরকারকে বাধ্য করতে হবে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার। একইসঙ্গে শরীফ ওসমান হাদিকেও যারা এভাবে গুলিবিদ্ধ করল প্রকাশ্য, ঢাকা শহরে একজন এমপি পদপ্রার্থী এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মুখ; সেই বিষয়টাকেও আমাদের সুরাহা করতে হবে।”
নাহিদ বলেন, “সেই রাতে এই ঘটনা ঘটার পরে আমাদের কাছে আরও মনে হয়েছে যে, ঢাকা শহরে ৫০০ মানুষ নাই যে সেখানে ওই বিল্ডিং দুইটার সামনে গিয়ে বেরিকেড তৈরি করতে পারে। এটা আমাদের কাছে আরও দুর্ভাগ্যজনক মনে হয়েছে। আমাদের নিজেদের কাছেও অসহায় মনে হয়েছে।
“আমরা যদি সঙ্গে সঙ্গে রেসপন্স করতে পারতাম। যখন পুলিশ কাজ করে না, আমাদের জায়গা থেকে তো দায়িত্ব ছিল নাগরিক হিসেবে। ফলে আমরা চেষ্টা করেছি এবং সবার প্রতি আহ্বান থাকবে যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নামে এই ধরনের কোনোকিছু আমরা বিন্দুমাত্র অ্যালাউ করব না। কোনোকিছুর নামেই মিডিয়ার ওপর আক্রমণ, প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর, আইনের শাসনকে ব্যাহত করবে এরকম কিছুর পক্ষে যারা সম্মতি তৈরি করবে, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে।”