১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ফেনী এখন অনেক দূর!

জরুরি প্রয়োজনে অনেকে নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর সড়ক হয়ে চৌমুহনী ঘুরে ফেনী যাচ্ছেন।

ফেনী এখন অনেক দূর!
চৌমুহনীর অনেক রাস্তা এখনো পানিতে ডুবে আছে।

বিডিনিউজ২৪

প্রশান্ত মিত্র

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 25 Aug 2024, 06:47 PM

Updated : 26 Aug 2026, 10:20 AM

ফেনী যাওয়ার গাড়ি ধরতে ঢাকার একটি বাসের কাউন্টারে গিয়ে শুনতে হলো- ফেনীতে কোনো বাস যায় না। 

সত্যিই তো, যাওয়ার কোনো উপায়ও তো নেই। ‘স্মরণকালের’ সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যায় এখন ফেনীসহ আশপাশের অঞ্চলগুলো থৈ থৈ। সাধারণত খানিকটা উঁচুতেই হয় জেলা শহর, সেখানে ফেনী শহরেও ঢুকে পড়েছে বানের পানি।

দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মাঝামাঝি যে শহরে মন চাইলেই যেকোনো সময় রওনা দিয়ে যাওয়া সম্ভব, সেই ফেনীতেই এখন যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

ঢাকা থেকে জেলা শহর ফেনীর দূরত্ব সড়কপথে প্রায় ১৬২ কিলোমিটার; এই পথ পাড়ি দিতে সাকুল্যে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু সেই ফেনীই এখন ‘অনেক দূর’ মনে করছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। 

উজানের ঢল আর ভারি বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় কয়েকদিনে ডুবেছে ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, লক্ষ্মীপুর ও কক্সবাজার। এর মধ্যে বন্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে ফেনীতে।

বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণ নিয়ে ছুটছেন অনেকে। পথে পথে ত্রাণবোঝাই অনেক ট্রাক-কভার্ড ভ্যান দেখা গেছে।

বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণ নিয়ে ছুটছেন অনেকে। পথে পথে ত্রাণবোঝাই অনেক ট্রাক-কভার্ড ভ্যান দেখা গেছে।

বুধবার গভীর রাত থেকেই এ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বন্যার পানিতে ডুবতে থাকে। বৃহস্পতিবার ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত কুমিল্লার নবগ্রাম রাস্তার মাথা থেকে চৌদ্দগ্রাম বাজার পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটার সড়ক তলিয়ে যায়।

একইসময়ে ফেনীর লালপুল এলাকায় অন্তত ৫ কিলোমিটার সড়ক তলিয়ে যায়। কোথাও হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানি উঠে যায়।

তবে শনিবার সকাল থেকে মহাসড়কে পানি কিছুটা কমার পর যানবাহন চলাচল বাড়লেও ব্যাপক জটে সড়কে আটকে থাকতে হচ্ছে দীর্ঘ সময়।

একই অবস্থা রেলপথেও। বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হলে প্রথমে রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। ফেনীতে রেললাইন পানির নিচে থাকায় এখনও চট্টগ্রামের সঙ্গে ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। বন্দরমুখী কার্গো ট্রেনও বন্ধ।

রেলওয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) নাহিদ হাসান খান এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, ফেনীতে রেললাইন পানির নিচে থাকায় এখনও চট্টগ্রামের সঙ্গে সারাদেশের ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

ওই রুটে চলাচল করে, ঢাকায় এমন কয়েকটি বাসের কাউন্টারে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, বরাবরের মতো ফেনী শহর পর্যন্ত বাস চলছে না আপাতত। ফেনীর মহিপাল এলাকার পর মহাসড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক হয়নি চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাস চলাচলও। তবে নিতান্ত জরুরি প্রয়োজনে অনেকেই ঢাকা থেকে ঘুরপথে ফেনী যাচ্ছেন।

রোববার রাজধানীর গোলাপবাগে সোনাপুরগামী একুশে বাসের কাউন্টারে গিয়ে দেখা যায়, কাউন্টারকর্মী রাসেল ওই অঞ্চলের বাস চলাচলের পরিস্থিতি জানাচ্ছিলেন যাত্রীদের; বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন কীভাবে ভেঙে ভেঙে ফেনী যাওয়া সম্ভব।

পথে পথে ত্রাণবোঝাই অনেক ট্রাক-কভার্ড ভ্যান দেখা গেছে।

পথে পথে ত্রাণবোঝাই অনেক ট্রাক-কভার্ড ভ্যান দেখা গেছে।

কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গেও কথা বলে জানা গেল, জরুরি প্রয়োজনে অনেকে নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর সড়ক হয়ে চৌমুহনী হয়ে ফেনী যাচ্ছেন। 

সেই ‘ঘুরপথে’ সকাল সাড়ে ৮টার হিমাচল পরিবহনের বাস ছাড়ে প্রায় ৯টায়। এরপর বাসের স্বাভাবিক গতি প্রথম থামে দাউদকান্দির পর গৌরিপুর এলাকায় ১০টার দিকে। শুরুতে লম্বা যানজটের শঙ্কা থাকলেও ২০ মিনিট পরই বাস আবার ছুটতে শুরু করে ছোটখাট গাড়ির জটলা থেকে মুক্ত হয়ে।

বাস যতই কুমিল্লার দিকে এগোতে থাকে, দেখা মিলছিল ত্রাণবাহী ছোট-বড় ট্রাক, পিকআপ, কভার্ড ভ্যান। মনে হচ্ছিল, যে যেভাবে পারছেন ছুটছেন বন্যাকবলিতদের পাশে দাঁড়াতে। কোনো ট্রাকে ছোট-বড় নৌকা দেখে বোঝা গেল, সেগুলোর গন্তব্যও বন্যাদুর্গত এলাকা।

হিমাচল বাসের যাত্রী ৬৯ বছর বয়সী মো. জহিরুল ইসলাম জানালেন, জীবদ্দশায় ফেনীসহ আশপাশের এলাকায় বন্যা দেখেছেন অনেকবার, কিন্তু এতো পানি ওঠার খবর এবারই প্রথম শুনেছেন। 

“ফেনী শহরে, মেইন রোডে পানি উঠতে কোনোদিন শুনি নাই। এমনিতে এখন আবার বৃষ্টি হইতেছে, খবরে দেখলাম পানি নাকি আবার বাড়তেছে,” বলেন ঢাকার মতিঝিল এলাকার এই ব্যবসায়ী। 

তিনি বলেন, “ফেনীতে আমার দুইজন আত্মীয়র বাড়ি। কিন্তু গত তিন দিন ধরে তাদেরকে ফোনে পাইতেছি না। হয়তো কারেন্ট নাই বা কোনো কারণে তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারতেছি না।

বেলার ১২টার দিকে লালমাইয়ের বাগমারা এলাকা ছাড়িয়ে সোনাইমুড়ির দিকে যেতেই বন্যার প্রকোপ টের পাওয়া গেল। সড়কের কোথাও কোথাও সামান্য পানি উঠেছে, আবার কোথাও সড়ক ছুঁই ছুঁই।

ফেনীর এলাকার খবর জানতে যোগাযোগ করা হয় গত তিন দিন ধরে ফেনীতে ত্রাণকার্যক্রম পরিচালনা করা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে। 

তিনি জানালেন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে সমন্বয় করে সবদিকে ত্রাণ পাঠানো হচ্ছে। সেখানে গেলে বিভিন্ন এলাকার ধারণা পাওয়া যাবে।

কিন্তু চৌমুহনী থেকে কীভাবে যেতে হবে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি। 

পথে পথে ত্রাণবোঝাই অনেক ট্রাক-কভার্ড ভ্যান দেখা গেছে।

পথে পথে ত্রাণবোঝাই অনেক ট্রাক-কভার্ড ভ্যান দেখা গেছে।

দুপুর ১টার দিকে চৌমুহনী চৌরাস্তায় নামতেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়। সেখানে সড়কে পানি পায়ের গোড়ালি ছাড়িয়েছে। চৌমুহনী শহরের দিকে যেতে কোথাও দেখা গেল, সড়কে জলজটের সঙ্গে সৃষ্টি হয়েছে যানজট।

সদরের নাপিতের পোল এলাকার ব্যবসায়ী দ্বীপ রায় জানালেন, বন্যার কারণে আশপাশের অনেকেই শহরের হোটেলগুলোতে উঠেছেন। 

ফেনী যাওয়ার উপায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কিছু বাস-সিএনজিতো ওইদিকে যাইতেছে। দেখেন বাসগুলো কতদূর যায়। শুনছিলাম সেনবাগের কাছাকাছি পর্যন্ত যায়। এখন আমার ঠিক জানা নেই।”