Published : 02 Oct 2025, 12:52 AM
নবমী পূজা, আর সন্ধ্যা আরতি শেষে শারদীয় উৎসবে বাজছে বিদায়ের সুর। বৃহস্পতিবার বিজয়া দশমীতে মর্ত্য ছেড়ে কৈলাশে ‘স্বামীগৃহে’ ফিরে যাবেন দেবী দুর্গা।
হিন্দু সনাতন শাস্ত্রমতে, নবমী তিথিতে রাবণ বধের পর রাজা শ্রী রামচন্দ্র এই পূজা করেছিলেন। নীলকণ্ঠ ফুল ও যজ্ঞের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয় নবমী বিহিত পূজা।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ধর্মদাশ চট্টোপাধ্যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, “নবমীতে 'পূর্ণপূজা'র পর দশমীতে দেবী 'অপরাজিতা' হন।”

বুধবার সকালে মণ্ডপে মণ্ডপে নবমী বিহিত যজ্ঞ ও পূজা করা হয়েছে। ভক্তরা করজোরে পুরোহিতের সঙ্গে মন্ত্রপাঠ করে দেবীকে প্রণাম করেন। অঞ্জলি নিবেদন শেষে তারা চরণামৃত ও যজ্ঞের ফোঁটা সংগ্রহ করেন।
বনানী পূজা মণ্ডপে নবমীর বিকেল ৫টা থেকে শুরু হয় পূজা ও চণ্ডীপাঠ। সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আরতি চলে রাত পর্যন্ত।
সেগুনবাগিচার শিল্পকলা একাডেমির নন্দনমঞ্চে নবমীর সন্ধ্যায় শারদীয় সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজন করেছিল সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় দুই দিনের এই উৎসবে শুরুতেই ৫০ জন শিল্পীর অংশগ্রহণে ঢাক-ঢোল বাদনে দ্বিতীয় দিনের সাংস্কৃতিক উৎসব শুরু হয়।
এরপর ‘মাঙ্গলিক নৃত্য’ পরিবেশন করেন স্পন্দন নৃত্যদলের নৃত্যশিল্পীরা, নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন অনিক বোস। একক সংগীত ‘আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে’, ‘ওই আসন তলে মাটির পরে’ ও ‘এবার তোর মরা গাঙ্গে বান এসেছে’ পরিবেশন করেন শিল্পী অনিমা রায়।

‘মঙ্গল দ্বীপ জ্বেলে’, তারে ধরি ধরি, ‘হৃদ মাঝারে রাখবো ছেড়ে দেবো না’ ও ‘গৌরী এলো দেখে যা লো’ পরিবেশন করেন শিল্পী দেবলীনা সুর দোলা।
ঢাকশ্বেরী জাতীয় মন্দিরে রাতে হয়েছে আরতী প্রতিযোগিতা। অংশ নিয়েছেন ২৫ জন প্রতিযোগী। বিচারক ছিলেন শামীম আরা নীপা, দীপা সরকার ও মনিরা পারভীন।
শিশু থেকে তরুণ অনেকে অংশ নিয়েছেন। প্রত্যেকের সময় ছিল ৩ মিনিট। দেবীকে প্রণাম করে সবাই আরতিতে অংশ নেন।
রমনা কালী মন্দিরে দেখা যায়- নবমীর সন্ধ্যায় ঢাকের তালে নেচে দেবী বন্দনায় মেতেছেন ভক্তরা। লোকজনের উপচে পড়া ভিড়।
মহানবমীতে রাজধানীর বিভিন্ন মন্দিরে ভক্তদের ঢল নামে। হাজার-হাজার হিন্দু ভক্ত ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকজন মন্দিরে-মন্দিরে দেবী দর্শনে আসেন। বিশেষ করে পুরান ঢাকার বিভিন্ন গলিতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই।

পূজার ভিন্ন আমেজ পাওয়া যায় পুরান ঢাকায়। রাত যত গভীর হয়, সেখানে যেন উৎসবের আনন্দও বাড়তে থাকে। শাঁখারী বাজারের সরু গলির আলোকছটা জানিয়ে দেয় আনন্দ-বারতা।
গলিতে প্রবেশ করতেই দেখা গেল–একের পর এক পূজা মণ্ডপ। রঙিন আলোর ঝলকানি, কোথাও উঁচু মঞ্চে দেবীর আসন। কোথাও আবার বাড়ির আঙিনায় পূজা। রাস্তার দুপাশে মেলা বসেছে।
মিষ্টির দোকান থেকে ভেসে আসছে লাড্ডুসহ বিভিন্ন মিষ্টান্নের ঘ্রাণ , খেলনার দোকানে কোলাহল, আবার কোথাও কেউ প্রিয়জনের জন্য কিনছেন উপহার।
বিশাল সাউন্ডবক্সে বাজছে ভক্তিমূলক সংগীত। কখনো আবার মিশে যাচ্ছে আধুনিক সুরের ঝংকার। সেই গানের সুরে তাল মেলাচ্ছে বিভিন্ন বয়সী মানুষ।
শাঁখারী বাজারে পূজা দেখতে আসা পরিমল মণ্ডল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বনানী পূজা মণ্ডপে গেলে একটু অভিজাত আমেজ পাওয়া যায়। আর উৎসবের প্রকৃত আমেজ মেলে পুরান ঢাকার শাঁখারী বাজারের পূজায়।”

হিন্দু বিশ্বাস হল, নবমী পূজার মাধ্যমে মানবকুলে সম্পদ লাভ হয়। তাই শাপলা, শালুক ও বলিদানের মাধ্যমে দশভুজা দেবীর পূজা হয়েছে।
নীল অপরাজিতা ফুল মহানবমী পূজার বিশেষ অনুষঙ্গ। নবমী পূজায় যজ্ঞের মাধ্যমে দেবী দুর্গার কাছে আহুতি দেওয়া হয়। ১০৮টি বেল পাতা, আম কাঠ ও ঘি দিয়ে এই যজ্ঞ করা হয়।
ভক্তরা মণ্ডপে অঞ্জলি ও ভোগ দিয়েছেন। নবমী পূজা ও সন্ধ্যা আরতি শেষে বিদায়ের সুর বাজতে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার বিজয়া দশমীতে বিদায় নিবেন ‘মা দুর্গা’।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পূজা দেখতে আসা স্নেহা চক্রবর্তী বলেন, “নবমীর দিনটাতে একদিকে খুব আনন্দ হয়। আবার মনে হয় উৎসব বুঝি শেষ হল। কারণ দশমীতেই তো দেবীকে বিদায় জানাতে হবে।”
হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা গত ২৮ সেপ্টেম্বর রোববার ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয়। টানা পাঁচদিনের আনন্দ উৎসবের পর বৃহষ্পতিবার বিজয়া দশমীর দিন দেবী বিসর্জনের মাধ্যমে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে।

নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সন্ধ্যার আগেই প্রতিমা বিসর্জনের নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ।
বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের আগে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে শোভাযাত্রা বের হবে, যা রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে সদরঘাট গিয়ে শেষ হবে।
বিজয়া দশমীর দিন সরকারি ছুটি। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ অন্যান্য বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও রেডিও বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করবে। এছাড়া জাতীয় দৈনিকগুলো এ উপলক্ষে বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ করবে।