Published : 12 Oct 2025, 10:46 PM
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান হেফজুল বারী মোহাম্মদ ইকবাল (এইচ বি এম ইকবাল) ‘অবৈধ সম্পদ অর্জনের’ অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।
একই অভিযোগে তার ছেলে প্রিমিয়ার ব্যাংকের আরেক সাবেক চেয়ারমান ইমরান ইকবালের বিরুদ্ধেও আলাদা মামলা করেছে কমিশন।
রোববার দুদকের সহকারী পরিচালক মো. ফেরদৌস রহমান কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১ এ মামলা দুটি দায়ের করেন।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা তানজির আহমেদ এ তথ্য দিয়েছেন।
প্রায় ২৬ বছর পর গেল অগাস্টে ডা. ইকবালের পরিবারের প্রিমিয়ার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ হারায়।
পরিবারটির বিরুদ্ধে ‘অবৈধ সম্পদের’ অভিযোগ অনুসন্ধান শেষ করে ইকবাল ও তার ছেলের বিরুদ্ধ মামলা অনুমোদন করার বিষয়টি গেল ৯ অক্টোবর জানিয়েছে দুদক। তার তিনদিনের মাথায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা হল।
এছাড়া, ইকবালের স্ত্রী আঞ্জুমান আরা শিল্পী ও ছোট ছেলে মঈন ইকবালের অবৈধ সম্পদ অর্জন করে থাকতে পারেন—এমন সন্দেহে তাদের সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ জারির অনুমোদন দিয়েছে দুদক।
ইকবালের বিরুদ্ধে মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, তিনি ‘জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ’ ৬২ কোটি ২৪ লাখ ৯৪ হাজার ৭৮২ টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন, যা দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
অনুসন্ধান ও নথি পর্যালোচনার বরাতে দুদক বলেছে, ইকবাল মোট ২৯৮ কোটি ৭০ লাখ ৮৩ হাজার ১৫৯ টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। এর মধ্যে ৪৪ কোটি ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৩৮৮ টাকার স্থাবর সম্পত্তি, আর ২৫৪ কোটি ৫৮ লাখ ৮৮ হাজার ৭৭১ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে।
২০২৩-২৪ করবর্ষে তার দায় পাওয়া যায় ১৩৯ কোটি ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৫৯৪ টাকা। দায় বাদে তার নিট সম্পদের পরিমাণ ১৫৯ কোটি ৬৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫৬৫ টাকা।
২০০৮-০৯ থেকে ২০২৩-২৪ করবর্ষ পর্যন্ত ইকবাল আয়কর নথিতে মোট ১৯০ কোটি ৬৫ লাখ ২৫ হাজার ৫৬২ টাকা আয় দেখিয়েছেন। একই সময়ে তার পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় ছিল ৯৩ কোটি ২৩ লাখ ৭৫ হাজার ৭৭৯ টাকা। ফলে তার সঞ্চয় বা সম্পদ অর্জনের উৎস পাওয়া যায় ৯৭ কোটি ৪১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৩ টাকা।
দুদক বলছে, অনুসন্ধানে ইকবালের ঘোষিত আয়ের চেয়ে ৬২ কোটি ২৪ লাখ ৯৪ হাজার ৭৮২ টাকার সম্পদের তথ্য মিলেছে, যার উৎস পাওয়া যায়নি। যে কারণে তা ‘অবৈধ সম্পদ’ হিসেবে গণ্য।
ইমরান ইকবালের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় বলা হয়েছে, তিনি ‘জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ’ ৫ কোটি ৩ লাখ ৯ হাজার ৪৩৭ টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন।
অনুসন্ধানের বরাতে দুদক বলছে, ইমরান মোট ৪৫ কোটি ৭৩ লাখ ১০ হাজার ৩৯৭ টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। তিনি ২০০৭-০৮ থেকে ২০২৩-২৪ করবর্ষ পর্যন্ত আয়কর নথিতে ৪৬ কোটি ৯৭ লাখ ৬৯ হাজার ৯১০ টাকার আয় দেখিয়েছেন। একই সময়ে তার পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় ছিল ৬ কোটি ২৭ লাখ ৬৮ হাজার ৯৫০ টাকা। ফলে তার সঞ্চয় পাওয়া যায় ৪০ কোটি ৭০ লাখ ৯৬০ টাকা।
দুদক বলছে, অনুসন্ধানে ইমরানের জানা আয়ের চেয়ে ৫ কোটি ৩ লাখ ৯ হাজার ৪৩৭ টাকার বেশি সম্পদ মিলেছে। যা দুদক আইনের ২৭(১) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ইকবাল, তার স্ত্রী আঞ্জুমান আরা শিল্পী, সন্তান মঈন উদ্দিন ইকবাল, ইকরাম ইকবাল, নওরীন ইকবাল এবং জামাতা জামাল জি আহমেদের সব ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করে।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে, ওই অবরুদ্ধ হিসাব থেকে ২৮৭ কোটি টাকা উত্তোলনের চেষ্টা আটকে দেয় বিএফআইইউ।
ইকবাল ও তার পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে দেশে নেই এবং তারা বিদেশে অবস্থান করছেন বলে দুদক ও গোয়েন্দাদের ধারণা।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর আর্থিক খাতে সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন শুরু করে।
সে সময় ইকবাল স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগপত্র জমা দেন, যা দুদিন পর গ্রহণ করা হয়। তার সঙ্গে ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ছেলে মঈন ইকবালও কোনো কারণ না দেখিয়ে পদত্যাগ করেন।
পিতা-পুত্র দুজনই পরিচালক পদ থেকেও সরে দাঁড়ান। পরে তার আরেক ছেলে মোহাম্মদ ইমরান ইকবাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে বসেন।
ব্যাংকিং মহলের মতে, ইকবাল নিজের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে কৌশলে ব্যাংক পর্ষদে পরিবারের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চেয়েছিলেন।
তবে ২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট, প্রিমিয়ার ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ‘সুশাসনের ঘাটতি’ দেখিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক তা বিলুপ্ত করে দেয়। এর মাধ্যমে সাবেক সংসদ সদস্য ইকবালের পরিবারের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে শেষ হয় প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে।
আগের খবর:
প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে ফের ২৮৭ কোটি টাকা তোলার চেষ্টা ইকবালের
২৬ বছর পর প্রিমিয়ার ব্যাংকের পর্ষদ ডা. ইকবালের পরিবার মুক্ত