Published : 09 Aug 2026, 01:30 AM
বাংলাদেশের সড়কে বাসের বিপজ্জনক যাত্রা বা ‘প্রাণঘাতি বাসযাত্রা’ লিখে গুগলে সার্চ দিলে এখন হাজার হাজার ভিডিও মেলে। মহাসড়কে বাসের প্রতিযোগিতা আর এঁকেবেকে ‘বাউলি’ দেওয়ার মত বিষয়গুলো এখন হয়ে উঠেছে দেশি-বিদেশি কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের অন্যতম আকর্ষণ। উচ্চগতিতে বাসের চলাচল আর প্রতিযোগিতার ভিডিওগুলোতে বিদেশি কনটেন্ট ক্রিয়েটররা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন সড়কে এদেশের মানুষের জীবনের কোনো দামই নেই। তবুও বদলাচ্ছে না কিছুই।
বেপরোয়া গতি, যাত্রী টানার প্রতিযোগিতা আর ‘বাউলির’ কারণে সড়কে ঝড়ছে বিপুল প্রাণ; বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। শুক্রবার সকালেও সিলেটে বড় একটি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে নয়জনের। বগুড়ায় পৃথক দুটি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন আরও নয়জন।
তবে এসব দুর্ঘটনার কোনো প্রতিকারই করতে পারছে না সরকারের দয়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো। ব্ড় দুর্ঘটনার পর বারবারই অবহেলা, অদক্ষতার মত বিষয়গুলো আলোচনায় এলেও পরে আর এগুলোর দায় নিরূপণ হয় না। এক বিশ্লেষক ও গবেষক প্রশ্ন তুলেছেন, সড়কে অভিভাবক থাকা কিংবা না থাকা নিয়ে।
শুক্রবার সিলেটের ভয়াব্হ দুর্ঘটনায় বেঙ্গল পরিবহনের স্লিপার বাসটির চালকের ‘অদক্ষতা বা অবহেলা’ দেখছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। নিয়ন্ত্রণহীন বডির স্লিপার বাস নিয়ে বেহিসাবি ‘বাউলি’ দিতে গিয়েই চালক তিনি এ ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে মনে করছেন তারা।
অপরদিকে বগুড়ায় শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের বাসের চাপায় নিহত হয়েছেন অন্তত সাতজন শ্রমিক। ভোরের ফাঁকা সড়কে দ্রুতগামী বাসটি হঠাৎ রাস্তায় উঠে আসা মোটরসাইকেলকে বাঁচাতে গিয়ে ব্রেক করলে বাসটি পুরো ঘুরে গিয়ে অপেক্ষমান শ্রমিকদের ওপর উঠে পড়ে।
সকালে শাহ আলী পরিবহনের এ দুর্ঘটনার রেশ চলার মধ্যেই রাতে এ পরিবহনের আরেকটি দ্রুতগতির বাস ট্রাককে ধাক্কা দিলে বাসটির চালক ও এক যাত্রী নিহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, দিনাজপুর থেকে চট্টগ্রামগামী শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের বাসটি সিরাজগঞ্জের নকলা ফ্লাইওভারে না উঠে অতি দ্রুত গতিতে নিচ দিয়ে অতিক্রমের চেষ্টা করছিল। এসময় ট্রাকটি ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে আড়াআড়িভাবে রাস্তার এপার থেকে ওপারে যাচ্ছিল। ট্রাকের বাম পাশে পেট বরাবর বাসটি আঘাত করলে ট্রাকটি পুরো দুমড়ে-মুচড়ে যায়। বাসটি সামনের অংশও ভেঙেচুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একজন বাস চালক বলেন, “রাতের বেলায় ফ্লাইওভারগুলোতে ট্রাকের চাপ থাকলে বাসওয়ালারা নিচ দিয়া বেশি তাড়াতাড়ি যাওয়ার চেষ্টা চালায়। কারণ লোড ট্রাকগুলো ফ্লাইওভারের ঢাল বাইয়া উঠতে সময় নেয়। এই সময়টুকু বাসওয়ালাদের সহ্য হয় না।”
পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাস চালকদের নিয়ম না মেনে গাড়ি চালানোর ভুক্তভোগী মালিকরাও। কিন্তু বিষয়টিকে নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। মরার ওপর খাড়ার ঘায়ের মত সড়কে এখন গিজগিজ করছে অটোরিকশা, ভটভটি, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ধরনের ছোট যান।
নিরাপদ সড়ক বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক শামসুল হক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলছেন, “পুরো খাত চলে গেছে আনাড়িদের হাতে।”
তার মতে, পুলিশ, বিআরটিএসহ যাদের দায়িত্ব এগুলো নিয়ন্ত্রণের- সেই কর্মকর্তারা কেবল ‘প্রজাপতি’র মত উড়ে উড়ে আসেন আর যান। কখনো কোনো ঘটনার দায় নেন না, কেবল ‘প্রাপ্তিটুকু বুঝে নেন’। যার কারণে কোনো অনুমোদন ছাড়াই এই স্লিপার বাসের মত আপাত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহনগুলো চোখের সামনেই মাশরুমের মত ছড়িয়ে গেলেও এর দায় কারও ওপর বর্তায়নি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এ শিক্ষকের ভাষ্য, “নিচে থেকে হয়নি, এখন ওপরের লোকদের দায় নিরূপণ করতে না পারলে এ ধরনের ঘটনা থামানো যাবে না।”
বাসচালকরা বলছেন, বাস চালাতে গেলে ‘বাউলি’ এড়ানোর উপায় না থাকার কথা বলছেন। তারা মহাসড়কে প্রচুর ছোট যানবাহনকে দুষছেন।
তাদের দাবি, দেশের চালকদের বেশিরভাগই নন এসি হিনো বা অন্যান্য ‘পাতি স্প্রিংয়ে’র বাস চালিয়ে অভ্যস্ত, যেগুলোর বডি বেশ হালকা। কিন্তু এখনকার স্লিপার হিসেবে তৈরি ভারী বডির এয়ার সাসপেনশনম যুক্ত বাসগুলো নিয়ে ‘বাউলি’ দিতে গিয়ে তারা নিজেদের যাত্রী ও অন্য বাহনগুলোকে বিপদে ফেলছেন। যেমনটি সিলেটের দুর্ঘটনার ওই ভিডিওতে দেখা গেছে।
অপরদিকে স্লিপার বাসের অনুমোদন থাকা না থাকার বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশের প্রধান (অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক) ফারুক আহমেদ ‘জানা না থাকার’ কথা বলছেন।
বেসামাল বডির বেহিসেবি ‘বাউলি’
শুক্রবার সকালে সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগর অংশে দুই যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষের একটি ইউনিক বাস। নন এসি এ বাস সিলেট থেকে ঢাকার পথে যাচ্ছিল। বিপরীত দিক থেকে আসা বেঙ্গল পরিবহনের এসি স্লিপার বাস ঢাকা থেকে রাতে রওনা দিয়ে সিলেটে ঢুকছিল।]
দুর্ঘটনার পরপর ইউনিক বাসের পেছনে থাকা একটি গাড়ির ড্যাশবোর্ডের ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, ইউনিক বাসটি নিজের লেনেই চলছিল। এসময় একটি পিকআপকে ওভারটেক করতে গিয়ে নিজের লেন ছেড়ে পুরোপুরি বিপরীত লেনে চলে আসে বেঙ্গলের বাসটি। সামনে হঠাৎ করেই বেঙ্গলের বাসটিকে দেখে ইউনিকের চালক সংঘর্ষ এড়াতে বামে চাপতে চাপতে এক পর্যায়ে খালে নামিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারেননি।
ভিডিওতে দেখা যায়, দুর্ঘটনার সময় ভিডিও ধারণকারী গাড়িটির গতি ছিল ৪২ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা। হাইওয়ের হিসেবে এ গতি কমই। বেঙ্গলের বাসটি ইউনিকের বাসটিকে আঘাত করে রীতিমত বডি ছিঁড়েফুঁড়ে বেরিয়ে আসে।
ট্রাফিক ও বাস সংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলোতে বেঙ্গল পরিবহনের স্লিপার বাসের চালককেই দায়ী করে পোস্ট দিচ্ছেন নেটিজেনরা। তারা বলছেন, এ ধরনের অনুমোদনহীন দোতলা স্লিপার বাসগুলোর বাসগুলোর বডি অনেক উঁচু, যার কারণে বাস্তায় সহজেই ‘বেসামাল’ হয়ে পড়ে।
বাস দুর্ঘটনার ভিডিওটি দেখার পর ‘৪৬ এক্সপ্রেস’ নামের একটি স্লিপার বাসের চালক বলছেন, “বেঙ্গলের বাসটি বাউলি দিতে গিয়ে অনেকটা কাত হইয়া গেছিল, খেয়াল করছিলেন? ওই কাত হওয়ার ফলে বেঙ্গলের ডান পাশের কাঁচ ভেঙে সামনের আপার ডেকের সিটের কোণার অংশটাতে লেগেই মূলত ইউনিকের পুরো ডান পাশটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। ইউনিকের বাসের ডান পাশের সামনে থেকে পিছন পর্যন্ত যা আছে সব ছিঁড়ে নিয়ে গেছে বেঙ্গল। ডান পাশের যাত্রীরাই বেশি হতাহত হইছে।”
ইউনিক সার্ভিসের মহাব্যবস্থাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, “আমাদের ড্রাইভার ও হেলপার দুজনই খুব আহত। সুপারভাইজার দুর্ঘটনার সময় বসে ছিলেন বামপাশের দরজার পাশে, তার কিছু হয়নি। সে বলছে, বেঙ্গলের ওই গাড়িটা একটা সিএনজিকে ওভারটেক করতে গিয়ে এতটাই ডানে চলে আসছে যে এরা বামে চাপতে চাপতে একেবারে খালে নামায় দিছে। আমাদের গাড়ির গতিও খুব বেশি ছিল না, যার কারণে খালে পড়েও উল্টে যায়নি। ওর অনেক গতি ছিল, পুরো ডানপাশ ছিঁন্নভিন্ন করে দিয়ে গেছে।”
বেঙ্গল পরিবহনের কর্মকর্তারাও তাদের চালকের গাফিলতির কথা স্বীকার করছেন। পরিবহন কোম্পানিটির মহাব্যবস্থাপক তোফাজ্জল হোসেন রিপন বলেন, “বাসের চালক শফিকুল দুর্ঘটনার পর পালাইছে। আমার সাথে সুপারভাইজার ধ্রুব’র কথা হইছে। সুপারভাইজার তখন বাসের সামনেই বসা ছিল, সে বলছে ওভারটেক করতে গিয়েই এ ঘটনা ঘটেছে।”
তার ভাষ্য, “ঢাকা থেকে রাত্রে গাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময়ও আমি ওদের বলছি যে, সিলেটের রাস্তা খারাপ যেন খুব দেখে-শুনে চালায়। আর ওরা এই অবস্থা করল।”
তবে বেঙ্গলের বাসটির ৩০ আসনের প্রতিটিতে যাত্রী থাকলেও তাদের তেমন ক্ষতি হয়নি বলে তুলে ধরেন তিনি।
“কয়েকজনের সাধারণ কাটা-ছেঁড়া ছাড়া তেমন কোন ক্ষতি হয়নি।”
বেঙ্গল পরিবহনের গাড়ি চলাচলের সূচি দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা আতাউর রহমান বলেন, “এই গাড়ি কালকে থেকেই জিপিতে আমাদের ব্যানারে ট্রিপ দেওয়া শুরু করছে। চালক ছিল শফিকুল ইসলাম। ওরা আগে অন্য কোম্পানিতে গাড়ি চালাইছে। প্রথম ট্রিপেই (ঘটল) দুর্ঘটনা।”
জিপি হল-প্রতিদিন নির্ধারিত একটা টাকা দিয়ে কোনো বাস কোম্পানি বা ব্যানারের হয়ে বাসটি চালাতে দেওয়ার পদ্ধতি। কোনো ক্ষেত্রে পরিবহন সংস্থাটি বাস মালিকের কাছ থেকে মাসভিত্তিক চুক্তিতেও ভাড়া নেয়। এসব বাসের ক্ষেত্রে মূলত বাসের মালিক একজন হন। তারা অন্য পরিবহন কোম্পানিকে বাস ভাড়া দেন। ছোটখাট অনেক পরিবহন সংস্থার নিজস্ব বাস নেই, যার কারণে চালক ও কর্মীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ কম।
বেঙ্গল পরিবহনের কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের বাসটির চালক শফিকুলের বয়স ৫০ এর কাছাকাছি হবে। বাস চালনায় তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে দাবি তাদের। যে বাসটি দিয়ে ট্রিপ পরিচালনা করা হচ্ছিল সেটি ছিল ভারতীয় অশোক লেল্যান্ড কোম্পানির সিঙ্গেল ডেকার ১২ মিটার চেসিসের ওপর নির্মিত একটি স্লিপার বা দোতলা বাস। দেশে এই বাসগুলো এখনো বিআরটিএর অনুমোদন পায়নি।
‘বাউলি’ কী অপরিহার্য?
ঢাকার গাবতলী কিংবা মহাখালীতে বাস চালকদের সঙ্গে কথা বললে মনে হয় ‘বাউলি’ দেওয়া যেন তাদের অধিকার, বাস চালানোর অপরিহার্য অনুষঙ্গ।
গাবতলীর ‘ফার্স্ট কলোনি’র বাসিন্দা জ্যেষ্ঠ বাসচালক হাশেম আলী বলছেন, “বাউলি না দিয়াতো আপনি বাংলাদেশে গাড়ি চালাইতেই পারবেন না। এইখানে প্রচুর সিঙ্গেল (সরু) সড়ক। মনে করেন আপনার সামনে ট্রাক আর ওইপাশ থাইকাও গাড়ি আসতাছে। আপনারে তো ডাইনে নিয়া গাড়ি আবার বায়ে নিতেই হইবে, সারারাস্তা ট্রাকের পিছে গেলে যাত্রী মানব?
“আমরা যে ওয়ান জে (হিনো) গাড়িগুলান চালাইছি ওইগুলো দিয়া সহজে বাউলি দেওন যায়। ওইটার বডি খেলে। আর এই অশোক লেল্যান্ড স্লিপারবাসগুলার চেসিস হালকা- বডি ভারী আর স্প্রিং নরম হাওয়ার (এয়ার সাস), যে কারণে বাউলাইতে গেলেই এগুলা কাইত হইয়া যায়। আর নতুন যে মার্সিডিজ গাড়িগুলান আসছে এগুলার ব্রেকও নতুন সিস্টেমের। ওয়ান জে গাড়ির মত জায়গায় খাড়ায় না। যার কারণে এগুলা বাম্পারে বাম্পারেও চালান যায় না। কিন্তু আমাগো ড্রাইভারগো তো বাউলি দেওয়া অভ্যাস, বোঝেন না! যার কারণে এইসব (দুর্ঘটনা) হইতাছে।”
‘৪৬ এক্সপ্রেস’ নামের একটি স্লিপার বাস কোম্পানির এক চালক নাম প্রকাশ না করে বলেন, “দেশের বেশির ভাগ চালক ‘পাতি স্প্রিংয়ের’ নন এসি বাস চালায় অভ্যস্থ। এখন যে স্লিপার গাড়িগুলান আসছে এগুলার সামনে বেলুন (এয়ার সাসপেনশন) আর বডিটা অনেক উঁচু কইরা বানায় আর পুরাটা লোহা। যার কারণে উপ্রে ভারী অনেক। যেই রাস্তাগুলোর মাঝখানে উঁচা আর দুই দিকে ঢাল সেইসব রাস্তায় গাড়ি হঠাৎ কইরা বাম থিকা ডাইনে আনলে গাড়ি এমন কাইত হয় যে আমারই আত্মা উইড়া যায়। আগে যে ওয়ান জে (হিনো) গাড়ি চালাইছি আমরা এই স্লিপার গাড়ি ওগুলার মত বাউলান যায় না। এইসব গাড়ি চালাইতে হয় খুবই ঠান্ডা মাথায়, কুনো পাড়াপাড়ি করা যাবে না। আর এই (স্লিপার) গাড়িগুলাইতো অবৈধ, তবুও সব ম্যানেজ কইরা চলতাছে আর কী।”
চালকের ‘বাউলি’ আনা, ‘ভাইরালেরও’ নেশা
গত মার্চের ঘটনা। বগুড়ার চাঁদনী পরিবহনের একটি বাসের ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেল বাসটি এদিক ওদিক ‘বাউলি’ দিতে গিয়ে এর ডান পাশের চাকাগুলো রীতিমত শূন্যে উঠে গেল। আর বাম পাশের বডি সড়ক বিভাজকের সঙ্গে ঘষা খেয়ে কোনমতে বাসটির চালক কোনমতে উল্টে যাওয়া থেকে রক্ষা পেলেন।
ওই ভিডিও ভাইরালের পর জানা যায়, একদল কনটেন্ট ক্রিয়েটর বাস ভাড়া নিয়ে ইফতার পার্টি করতে যাচ্ছিলেন। বাসের ভেতরে ও বাইরে তাদের সদস্য বাসের ভিডিও ধারণ করছিলেন। তাদেরই তাড়নায় বাস চালক বাউলি দিতে দিতে চাকা একেবারে শূন্যে তুলে ফেলেছিলেন।
অনলাইন সার্চে দেশের বাসের প্রতিযোগিতা ও বাউলির এরকম হাজারো ভিডিও সামনে আসছে। চরম বিপজ্জনকভাবে বাস চালানোর এসব ভিডিও দেশে এবং বিদেশে প্রচুর ‘ভিউ’ পাচ্ছে বলে কনটেন্ট ক্রিয়েটররা বলছেন। বিদেশি গণমাধ্যম ও কনটেন্ট ক্রিয়েটররা বাংলাদেশে এসে ‘বাসের বিপজ্জনক যাত্রা’ নিয়ে কনটেন্ট ও ডকুমেন্টারিও বানাচ্ছেন।
আনিসুর রহমান নামে একটি ফেইসবুক আইডি থেকে বুধবার একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে, যেখানে বাস চালকের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করে বসে ৯-১০ বছরের একটি শিশুকে মহাসড়কে বাস চালাতে দেখা যাচ্ছে। গাড়ির স্পিডমিটার বন্ধ কিন্তু আরপিএম মিটারের কাটা বলছে, ইঞ্জিনের সর্বোচ্চ শক্তিতেই বাস চালাচ্ছিলেন চালক। স্টিয়ারিংয়ে তখনও শিশুর হাত।
ভিডিও দিয়ে ক্যাপশনে আনিসুর লিখেছেন, “ঢাকা থেকে বান্দরবন ও কক্সবাজারের উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছি তিন দিনের জন্য। ড্রাইভিং সিটে আমার ছেলে, সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন।“
বাংলাদেশের বাসের এরকম অনেক ভিডিও পাওয়া যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। শত শত গ্রুপ ও পেইজ।
তিন মাস আগে ‘ফ্রান্স ২৪ ইংলিশ’ ইউটিউব চ্যানেলের এক ডকুমেন্টারিতে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের জনপ্রিয় গণপরিবহন হচ্ছে বাস। গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে কোম্পানিগুলো কম সময়ে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছে, এজন্য যতই ঝুঁকি নিতে হোক না কেন। সামাজিকমাধ্যমে এসব ‘দুধর্ষ চালকদের’ হাজারো ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।
ওই ভিডিওতে ঝুঁকিপূর্ণ বাস চলাচলের অনেকগুলো ফুটেজ একের পর এক দেখানো হয়। ডকুমেন্টারিতে একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের ভিডিও দেখিয়ে বলা হয়, “এই ব্যক্তি এরকম ভয়ঙ্কর যাত্রার ভিডিও নিয়মিত পোস্ট করে থাকেন। কারণ এটা এখন বিনোদনের একটা উপায় হয়ে উঠেছে। যেখানে বাসের যাত্রীরা চালককে সর্বোচ্চ দ্রুত গতিতে বাস চালাতে উৎসাহিত করেন।”
দেশের বাস ও পরিবহন খাত নিয়ে কনটেন্ট তৈরি করা একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের সঙ্গে কথা হয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের বাস, ট্রেন ও যানবাহন বিষয়ক ভিডিওগুলো দেশের বাইরে থেকেও প্রচুর ভিউ হয়। এ কারণে এগুলো থেকে বেশি ডলার পাওয়া যায। যার কারণে কনটেন্ট ক্রিয়েটররা বাস ভাড়া করে হলেও বাসের প্রতিযোগিতা বা গতির কনটেন্ট বানাতে আগ্রহী হন। আর বাস চালকেরাও রাতারাতি বিখ্যাত হওয়ার আশায় তাদের সঙ্গ দেন।”
ওই কনন্টেন্ট ক্রিয়েটর বিদেশ থেকে আসা কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের স্থানীয় গাইড এবং অনুবাদক হিসেবেও কাজ করেন।
তিনি বলেন, “বিদেশ থেকে এখন অনেক কনটেন্ট ক্রিয়েটর বাংলাদেশে আসতে চান শুধু ঢাকার ভাঙাচোড়া বাস আর হাইওয়েতে বাসের রেসিং নিয়ে কনটেন্ট বানাতে। বাংলাদেশের কোন কোন বাসের রেসিংয়ের ভিডিও না কি ডাকার র্যালির (বিশ্বের অন্যতম কঠিন ও রোমাঞ্চকর বার্ষিক অফ রোড ক্রসকান্ট্রি মোটর রেসিং প্রতিযোগিতা) চেয়েও বেশি ভিউ হয়- এমন কথা আমাকে বলেছিলেন এক ফ্রেঞ্চ ইউটিউবার।”
আর বাসের চালক-হেলপারদের কাছে গতির প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়া একরকম গৌরব। গাবতলী বা মহাখালীর বাসপাড়ার ভিডিও বানাতে গিয়ে তাই কোনো চালক খেতাব পান ‘বাউলি মাস্টার’ বা ‘আগুন পাইলট’ হিসেবে।
অনুমোদনের চক্করে
চার-পাঁচ বছর আগে দেশে স্লিপার বাস চলা শুরু হওয়ার পর থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ বলে আসছে এগুলো অনুমোদনহীন। বাস মালিকদের একটা অংশও বলছে, এগুলোর বডির মাপজোখের ঠিক নেই, সাংঘাতিক ঝুঁকিপূর্ণ।
বাস ও ট্রাক মালিকদের অন্যতম সংগঠন বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও হানিফ এন্টারপ্রাইজের একজন কর্ণধার মো. হানিফ বলেন, "স্লিপার বাস যেগুলো চলছে এগুলো দূরপাল্লায় জন্য কোনভাবেই ফিট না। আমরা কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি বারবার বলেছি। তারা কোনো আমলেই নিচ্ছে না।"
বাস মালিকদের কিছু অংশ ঝুঁকিপূর্ণ আর অনুমোদনহীন বললেও, বিআরটিএ ও হাইওয়ে পুলিশের নাকের ডগায় এসব স্লিপার ও ‘স্যুট ক্লাস’ বাস দেশের প্রধান মহাসড়কগুলোতে দিন-রাত চলছে। এরই মধ্যে বাসের সংখ্যা হাজার ছাড়ানোর তথ্য দিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। পুলিশ-বিআরটিএ ম্যানেজ করে অনুমোদন আদায় করতে এখন মালিকরা জোট বেঁধেছেন।
বাস মালিকদের আরেকটি সংগঠন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলমও এসব বাসের ঝুঁকির কথা বললেন।
তবে তিনি বলছেন, যেহেতু এর মধ্যে এই স্লিপার বাস খাতে হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ হয়ে গেছে সেই বিবেচনায় বিষয়গুলোকে আইনের পরিধির মধ্যে আনার চেষ্টা চলছে।
তার মতে, “যার অনুমোদন নাই তাকে পুলিশ চলতে দেবে না। কিন্তু এগুলোকে বিআরটিএ রেজিস্ট্রেশন দিছে, রুটপারমিট, ফিটনেস সব দিয়ে আসছে। আবার মাঝখানে এগুলোকে অনুমোদন দেওয়া বন্ধও রাখল বিআরটিএ। এখন আমরা এসে দেখছি যে সংখ্যা এগুলো অনেক, কম করে হলেও সাত-আটশ। অধিকাংশ গাড়িরই রেজিস্ট্রেশন ও রুটপারমিট দেওয়া আছে, অনেক বিনিয়োগ।
“আমরা মন্ত্রণালয় ও বিআরটিএকে চিঠি লিখেছি যে এগুলো পরীক্ষা করা হোক। যদি এগুলো চলাচলের যোগ্য নয় বলে বিবেচিত হয় তাহলে বন্ধ করে দিক। এখন বুয়েটের একটা কমিটি হয়েছে। তারা ছয়মাস ধরে পরীক্ষা করছে। হয়ত এ সপ্তাহেই রিপোর্ট দিবে।”
অনুমোদন না থাকার পরেও এসব গাড়ি কী করে চলছে সে বিষয়ে জানতে চাইলে হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ফারুক আহমেদ বলছেন, “ওটার অনুমোদন আছে কী না সেটা আমরা জানব কীভাবে। অনুমোদন না থাকলে রেজিস্ট্রেশন নম্বর থাকে কী করে? এমনতো নয় যে নম্বরবিহীন গাড়ি এটা। তারপরেও যদি মনে করেন কোন অংশে বর্ধিত করেছে এটা তো বিআরটিএকে বলতে হবে। ওই এখতিয়ারতো বিআরটিএর। এটা তো পুলিশের নয়।”
‘আনাড়ি’ চালক আর ‘প্রজাপতি’ কর্মকর্তা
বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছেন বুয়েটের অধ্যাপক এম শামসুল হক। নির্ধারিত মাপজোখের বাইরে গিয়ে বাসগুলোর বডি বানানো, চালকদের পাড়াপাড়ি আর বাউলির সঙ্গে অনেক আগে থেকেই পরিচিত তিনি।
শুক্রবারের দুটো ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন- প্রসঙ্গ শুনেই তিন বললেন, “দেশের পরিবহন ব্যবস্থার পুরোটাই এখন আনাড়িদের হাতে। আর যারা এগুলোর নিয়ন্ত্রণ করবেন সেই বিআরটিএ আর পুলিশের কর্মকর্তারা কোন দায়ই নিতে চান না, জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘বোঝেন না’। না বুঝলে দায়িত্ব নেবেন না। ঘটনার পর তারা ব্যর্থতার দায়ও নেন না। কেবল প্রজাপতির মতো ওড়াওড়ি করে আসেন আর যান।“
অধ্যাপক হক বলছেন, “বাউলিতো অনেকদিন ধরে চলছে। এদেশে যাত্রীভর্তি বাস নিয়ে বাউলি দিয়ে টিকটক করে, আপলোড করে। প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের সড়কের কি কোনো অভিভাবক নেই। এগুলো দেখভাল করার জন্য হাইওয়ে পুলিশ তৈরি করা হল। তাকে একটা দায়িত্ব দেওয়া হল।
“বিআরটিএ একটা রেজিস্ট্রেশন দিচ্ছে। কিন্তু তার সেই শর্ত মেনে গাড়ি বানানো হলো কি না সেগুলোইতো কেউ দেখভাল করে না। বছরের পর বছর ধরে এগুলো চলছে, তাহলে আপনাদের আর থাকার দরকার কী?”
জনগণের নিরাপত্তা বিধানের জন্য নিবিড়ভাবে কোনো কাজ না হওয়ার কথা তুলে ধরে এই অধ্যাপক বলেন, “মাঝে মাঝে ‘অভিযানসর্বস্ব’ কিছু কাজ দেখানো হয়। এর ফলে মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না। আর দেখেন এতগুলো মৃত্যু হল- এখন হয়তো কিছু কাজ করবে, বিআরটিএ নাড়াচাড়া করবে। হাইওয়ে পুলিশ কিছু তদন্ত কমিটি করবে।”
মালয়েশিয়ায় ২০ বছর আগে বাসগুলোকে ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, “ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং এখন আর কোনো উচ্চগতির প্রযুক্তি নয়। আজ তারা ট্র্যাকিংয়ের আওতায় থাকলে, ঘটনা ঘটার পরপরই কে রংসাইডে ছিল, কোথায় কোথায় বাউলি দিছিল সবই জানা যেত। মানুষের জানমালের এত ক্ষতি হচ্ছিল অথচ এই সাধারণ প্রযুক্তিগুলো আমরা আনতে পারছিলাম না। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি। তাকে ধন্যবাদ যে তিনি উদ্যোগী হয়ে গণপরিবহনে ট্র্যাকিং সিস্টেম বাধ্যতামূলক করেছেন।”
এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার জন্য ‘পুলিশ ও বিআরটিএর অবহেলা-অদক্ষতাকে’ দায়ি করে তিনি বলেন, “এই কারণেই মানুষের রক্ত ঝড়ছে। তারা কোনদিনই জবাবদিহিতার আওতায় আসছেন না। এখন টপ ঠিক করতে হবে, তাহলে বটম এমনিই ঠিক হয়ে যাবে। আমাদের এতদিন ছিল বটম-আপ অ্যাপ্রোচ, এখন কাঠামোগতভাবে প্রযুক্তিনির্ভর টপ-ডাউন অ্যপ্রোচে যেতে হবে।
“এই ট্র্যাকিং প্রযুক্তিতে চালকের বিষয়টাতো এমনিতেই চলে আসবে। আর তাকে যারা শাসন করার দায়িত্বে ছিলেন সেই পুলিশ, বিআরটিএ, বাস মালিকদের আমলনামাটাও সামনে চলে আসবে। তখন দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ না করলে আর কেউ দায়িত্ব এড়াতে পারবেন না।”
আরও পড়ুন
সিলেটে নিহত ৯: রাতে গানের আসর মাতালেন, সকালে সড়কে ঝরল প্রাণ
সিলেটে দুই বাসের সংঘর্ষে নিহতরা 'ইউনিক পরিবহনের' যাত্রী: পুলিশ