১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

এস্তে মেডিকেলের এমডির বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলা ‘মিথ্যা’, বলছে পুলিশ

মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে ফয়সালকে এ মামলায় জড়ানো হয়েছে।

এস্তে মেডিকেলের এমডির বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলা ‘মিথ্যা’, বলছে পুলিশ
আদালতে এস্তে মেডিকেল বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ফয়সাল। ফাইল ছবি

বিডিনিউজ২৪

মামুন খান

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 05 Aug 2026, 10:39 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:47 PM

ভাগ্নিকে যৌন হয়রানির অভিযোগে এস্তে মেডিকেল বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ ফয়সালের বিরুদ্ধে কোনো ‘সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ার’ কথা জানিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নারী সহায়তা ও তদন্ত বিভাগের এসআই বেগম রেহেনা আখতার ২৭ জুলাই আদালতে দাখিল করা ওই প্রতিবেদনে বলেছেন, পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে ফয়সালকে এ মামলায় জড়ানো হয়েছে।

তবে মামলার বাদীপক্ষ এ প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। তদন্ত ‘সঠিকভাবে হয়নি’ দাবি করে তারা বলছে, এ চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে তারা আদালতে ‘নারাজি’ আবেদন করবে। 

ঘটনার প্রায় ১০ মাস পর, চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল গুলশান থানায় এ মামলা করেন সেই তরুণীর বাবা। 

মামলা হওয়ার পর ৬ মে উচ্চ আদালত থেকে আট সপ্তাহের আগাম জামিন পান ফয়সাল। ওই জামিনের মেয়াদ শেষে ৩০ জুন নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করলে ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর হাকিম মো. সেফাতুল্লাহ তা নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

পাঁচ দিন কারাভোগের পর জামিন পান ফয়সাল। আদালত জামিনের সঙ্গে তদন্তে সহযোগিতা, জামিনের অপব্যবহার না করা এবং আদালতের অনুমতি ছাড়া বিদেশে না যাওয়াসহ কয়েকটি শর্ত আরোপ করে।

ঢাকার মহানগর হাকিম রৌনক জাহান তাকি গত সোমবার পুলিশের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণের জন্য নথিভুক্ত করেন এবং মামলাটি পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮-এ পাঠানোর নির্দেশ দেন।

একই দিন ফয়সালের পাসপোর্ট ফেরত, বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি এবং স্থায়ী জামিনের আবেদনও আদালত মঞ্জুর করে।

কী অভিযোগে এ মামলা?

মামলার বিবরণে বলা হয়েছিল, বাদীর তিন মেয়ের মধ্যে দুজন পড়াশোনার জন্য বিদেশে থাকেন। তাদের দেখাশোনার জন্য তাদের মা মাঝে-মধ্যে বিদেশে যান। ছোট মেয়ে ঢাকায় থাকে এবং একটি কোচিং সেন্টারে লেখাপড়া করে।

এজাহারে বলা হয়, আসামি ফয়সাল গত বছরের ২১ জুন তার ভাগ্নি ওই মেয়েটিকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যান। এক পর্যায়ে ধূমপান করার সময় কৌশলে মেয়েটিকেও ধূমপান করানোর চেষ্টা করেন। 

এরপর ২৪ জুন দুপুরে মেয়েটিকে গুলশানের কনকর্ড সিলভি হাইটসে এস্তে মেডিকেল বাংলাদেশের কার্যালয়ে খেতে ডাকেন ফয়সাল। সেখানে আবারও তিনি মেয়েটিকে ধূমপান করানোর চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে মামলায়।

এজাহারে বলা হয়েছে, ওই রাতে গাড়িতে করে মেয়েটিকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য বের হন ফয়সাল। পরে গাড়ি চালানো শেখানোর নাম করে তিনি মেয়েটিকে ‘যৌন হয়রানি’ করেন। মেয়েটি তখন অসুস্থতার ভান করে বাসায় যাওয়ার কথা বললে তাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।

দেরি করে মামলা করার ব্যাখ্যায় এজাহারে বলা হয়েছে, বিষয়টি জানাজানি হলে পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি হওয়ার আশঙ্কায় মেয়েটি শুরুতে কিছু বলেননি। গত ১৭ এপ্রিল তার বড় বোনের বিয়ের দিন ফয়সাল তাদের বাসায় গেলে তাকে দেখে চিৎকার করে ওঠেন ওই তরুণী। তখন বাদীসহ পরিবারের লোকজন ঘটনার বিষয়ে জানতে পারেন।

যা আছে তদন্ত প্রতিবেদনে

চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসআই রেহেনা আখতার বলেছেন, মামলার বাদী একজন ব্যবসায়ী। তিনি মো. ফয়সালের ভগ্নিপতি। যে মেয়েটিকে যৌন হয়রানি করার কথা বলা হচ্ছে, তিনি আসামির ভাগ্নি। 

বাদী এবং ফয়সালের স্ত্রী সম্পর্কে আপন খালাতো ভাই বোন। ফয়সাল একজন ব্যবসায়ী। তিনি ইস্তে মেডিকেল বাংলাদেশ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তার স্ত্রী ওই মেডিকেলেরর চেয়ারম্যান। তাদের দুই ছেলে ওই প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। 

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাদীর সঙ্গে আসামির সম্পর্ক গত ২৪/২৫ বছর ধরেই খুব একটা ভালো ছিল না। গেণ্ডারিয়ার একটি পারিবারিক সম্পত্তি এবং পরে ব্যাংকঋণের জামিনদার (গ্যারান্টর) হওয়া নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, যে সময় ঘটনা ঘটেছে বলা হচ্ছে, তার প্রায় ১০ মাস পর মামলা করা হয়। এ সময়ের মধ্যে দুই পরিবারের মধ্যে একাধিক পারিবারিক অনুষ্ঠান ও যোগাযোগ হয়েছিল। এমনকি অভিযোগকারী তরুণী আসামির পরিবারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্বাভাবিকভাবে অংশ নিয়েছেন।

এসআই রেহেনা আখতার বলেছেন, ঘটনার দিন মেয়েটি একাই ফয়সালের গুলশানের কার্যালয়ে যান এবং পরে একাই সেখান থেকে বেরিয়ে যান বলে সাক্ষ্য-প্রমাণে উঠে এসেছে।

তদন্ত কর্মকর্তা লিখেছেন, আসামির সিডিআর (ঘটনার সময়ের কল ডিটেইল রেকর্ড) পর্যালোচনায় ঘটনার তারিখ ও সময়ে ফয়সাল ঘটনাস্থল আমেরিকান ক্লাব রোডে উপস্থিত ছিলেন না বলে জানা যায়। ভুক্তভোগীকে আসামি শ্লীলতাহানী করার বিষয়ে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। 

“এমনকি বাদীও কোনো সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেন নাই।  ফয়সালের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারার অপরাধ প্রাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণে প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রতীয়মান হয়নি। মামলাটি মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়।”

তদন্ত নিয়ে বাদীপক্ষের আপত্তি

এই তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন মামলার বাদী। তার দাবি, মামলার তদন্ত ‘সঠিকভাবে হয়নি’।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, "বাচ্চা মেয়েটা। মামার কাছে গেছে, আপন মামা। তার সাথে এ কাহিনী করেছে। মেয়ের সাথে যে ঘটনা ঘটেছে তার বিচারের জন্য গেছি। শুধু শুধু তো এ ঘটনা বাইরে জানানোর বিষয় না।"

তিনি বলেন,"এটা সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলা হবে কেন? সম্পত্তি আমার স্ত্রীর বাবার। সেখানে আমার কোনো আগ্রহ নেই। আর আমার কি সম্পত্তি কম আছে? আমি যাব সম্পত্তির জন্য এ মামলা করতে? আপনারা (সাংবাদিকরা) খবর নিয়ে দেখতে পারেন। এটা কোনো সম্পত্তি-টম্পত্তির ম্যাটার না। বাঁচার জন্য এরকম মিথ্যা বলছে।"

বাদীর দাবি, ঘটনার পর তার মেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং পরীক্ষাও দিতে পারেনি।

“মামা ডেকেছে, সে গেছে। তারপর এ ঘটনা ঘটিয়েছে। বিচার অবশ্যই হবে। মনগড়া কথা বললে তো হবে না। মেয়ের সাথে যা ঘটেছে তার বিচারের জন্য গেছি, সম্পত্তির জন্য না।"

বাদী বলেন, আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে তারা নারাজি আবেদন করবেন এবং প্রয়োজন হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে যাবেন।

যা বলছে আসামিপক্ষ

আসামি ফয়সালের আইনজীবী মোহাম্মদ আবজাল হোসেন মৃধা বলেন, "শ্বশুড় বাড়ির সম্পত্তি নিয়ে বাদী মামলা করেছেন। বাদীর স্ত্রীকে তার শ্বশুড় জমি দেয়। কিন্তু সেই জমি বিক্রি করে দেয়। পরে আবার ফ্ল্যাট দাবি করে। প্রোপার্টি নিয়ে হয়রানি করতে মামলা করেছে।"

তিনি বলেন, "যে ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে, তার সত্যতা পায়নি তদন্ত সংস্থা। এমনকি ভুক্তভোগী ও আসামি এক সাথে ছিল–এমনটাও পাওয়া যায়নি। সম্পত্তি নিয়ে হয়রানি করতে মামলাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে।"

নারাজির বিষয়ে বলেন, "আমরা চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করতে আদালতে আবেদন করব। আর যদি নারাজি আবেদর মঞ্জুর হয়, তাহলে আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।"