কবি শামসুর রাহমানের সংক্ষিপ্ত জীবনী
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমানের জন্ম ১৯২৯ সালের ২৪ অক্টোবর পুরান ঢাকার মাহুতটুলীতে নানার বাড়িতে।
তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় ১৯৩৬ সালে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পোগোজ স্কুলে। তিনি সেই স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন। সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় ছোট বোন নেহারের মৃত্যু হয়। বোন হারানোর শোকে তিনি প্রথম কবিতা লেখেন। কবির ভাষায় ওই কবিতাটি ছিল ‘শোকার্ত বালকের কাছে তার অন্তর্গত সত্তার পত্রলেখা’। জীবনের প্রথম এই কাব্য প্রয়াস তাঁর মাকে ভীষণ কাঁদিয়েছিল। সেই থেকেই যাত্রা শুরু হয়েছিল এই মহাপ্রাণ কবির কাব্যজগতে পথচলার। জীবনের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত তিনি সেই চলার পথে রেখে গেছেন অসংখ্য কবিতা। তাঁর সেই অনবদ্য সৃষ্টির ফলে বলীয়ান হয়েছে বাঙালী জাতি।
১৯৪৫ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন কবি শামসুর রাহমান। তিনি ১৯৪৭ সালে আইএ পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগে ভর্তি হন। øাতক (সম্মান) পড়া শেষ বছর পর্যন্ত চালিয়ে গেলেও পরীক্ষা দেননি। ১৯৫৩ সালে তিনি ুাতক হন। মাস্টার্সে ভর্তি হয়ে প্রথম পর্ব কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হলেও শেষ পরীক্ষায় তাঁর আর বসা হয়নি।
কবি শামসুর রাহমান ১৯৫৭ সালে কর্মজীবন শুরু করেন অধুনালুপ্ত মর্নিং নিউজের সহ - সম্পাদক হিসেবে। ১৯৫৮ সালে সাংবাদিকতা ছেড়ে অনুষ্ঠান প্রযোজক হিসেবে যোগ দেন তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রে। পরে আবার ১৯৬০ সালে মর্নিং নিউজ পত্রিকায় ফিরে এসে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত কাজ করেন। ১৯৬৪ সালে দৈনিক পাকিস্তানে সহকারী - সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়ে দীর্ঘ ১৩ বছর কাজ করেন এবং ১৯৭৭ সালের ফেব্র“য়ারিতে তিনি ‘দৈনিক বাংলা’ এবং এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’র সম্পাদক নিযুক্ত হন।
শামসুর রাহমান ১৯৮৭ সালে স্বৈরশাসনের প্রতিবাদে প্রধান সম্পাদকের পদ থেকে ইস্তফা দেন।
তিনি শুধু কবিই ছিলেন না, মনে - প্রাণে অসাম্প্রদায়িক এই কবি দেশের ক্রান্তিলগ্নে সবসময়ই সোচ্চার ছিলেন। তাঁর লেখনী সবসময়ই প্রতিবাদ করে গেছে সব অন্যায় আর অত্যাচারের।
১৯৬৭ সালে সরকার নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা দৈনিক পাকিস্তান এ কর্মরত থাকা অবস্থায় পাকিস্তান সরকারের রেডিও পাকিস্তানে রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে বিবৃতি দিয়েছিলেন। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তানের সকল ভাষার জন্য অভিন্ন রোমান হরফ চালু করার ব্যাপারে তৎকালীন শাসক আইয়ূব খানের পাঁয়তারারও শক্তভাবেই বিরোধীতা করেছিলেন এই কবি।
বিখ্যাত ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ কবিতা দুটি কবি লিখেছিলেন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়। এসময় তিনি পরিবার নিয়ে চলে গিয়েছিলেন নরসিংদীর পাড়াতলী গ্রামে। এপ্রিলের ৭ বা ৮ তারিখে তিনি এই কবিতা দুটি সেখানে বসে লিখেছিলেন। পরবর্তীতে কবিতা দুটি বন্দির শিবির গ্রন্থে স্থান পায়। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি গুলিস্তানে একটি মিছিলের সামনে একটি রাঠিতে শহীদ আসাদের রক্তাক্ত শার্ট দিয়ে বানানো পতাকা দেখে আলোড়িত হয়ে ওইদিন সন্ধ্যায়ই কবি লিখেছিলেন ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি।
শামসুর রাহমানের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। ১৯৪৯ সালের ১ জানুয়ারি ‘সোনার বাংলা’য় তাঁর প্রথম কবিতা ছাপা হয়। সেই কবিতার নাম ছিল ‘তারপর দে ছুট’। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম এই প্রধান কবির কবিতা বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। জীবনে তিনি অসংখ্য পুরস্কার, পদক ও সম্মাননা লাভ করেন। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৬৩ সালে আদমজী পুরস্কার, ১৯৬৯ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কার, ১৯৭৩ সালে জীবনানন্দ দাশ পুরস্কার, ১৯৭৭ সালে একুশে পদক, ১৯৮১ সালে আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি পুরস্কার, ১৯৮১ সালে নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক ও পদাবলী পুরস্কার, মওলানা ভাসানী পুরস্কার, ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার, ১৯৯২ সালে জাপানের মিৎসুবিশি পদক (সাংবাদিকতায়) এবং ১৯৯৪ সালে ভারতের আনন্দ পুরস্কার।
এ ছাড়াও ভারতের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি. লিট উপাধি প্রদান করে। শামসুর রাহমানকে প্রথম বড় মাপের সংবর্ধনা প্রদান করা হয় ১৯৭৯ সালের ২৪ অক্টোবর। পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে শামসুর রাহমান সংবর্ধনা পরিষদ বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গনে তাঁকে এই সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে।
এ ছাড়াও কবি ও সাংবাদিক হিসেবে সম্মানিত হয়ে তিনি ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া), বার্মা (মিয়ানমার), পশ্চিম জার্মানি (সাবেক), যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন।
শামসুর রাহমান ছিলেন বাবা - মায়ের ১০ সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ। বাবা মোখলেসুর রাহমান চৌধুরীর প্রথম স্ত্রী তিন পুত্র রেখে মারা গেলে তিনি প্রথম পক্ষের স্ত্রীর ছোটবোন আমেনা বেগমকে বিয়ে করেন।
১৯৫৫ সালে শামসুর রাহমান বিয়ে করেন আত্মীয় জোহরা বেগমকে। দুজন দুজনকে আগে থেকেই পছন্দ করতেন। পরে পারিবারিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে ঘটা করেই তাঁদের বিয়ে হয়।
শামসুর রাহমান দম্পত্তির পাঁচ সন্তান (তিন কন্যা ও দুই পুত্র)। তারা হলেন সুমায়রা রাহমান, ফাইয়াজুর রহমান, ফৌজিয়া রাহমান, ওয়াহিদুর রহমান মতিন এবং সেবা রাহমান।
(তথ্যসূত্র : বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডি.নেট এর গুণীজন ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত)
