১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

চায়ে চেতনানাশক, অচেতন চালক: টাকা দিলে ফেরে অটোরিকশা

“ঘুমের ওষুধ খাইয়ে যেভাবে চালককে অজ্ঞান অবস্থায় জিম্মি করে রাখা হয়…অচেতন চালকের জ্ঞান আর নাও ফিরতে পারে,” বলেন ডিবি কর্মকর্তা সোয়েব।

চায়ে চেতনানাশক, অচেতন চালক: টাকা দিলে ফেরে অটোরিকশা
ঢাকায় সিএনজি অটোরিকশা ছিনতাইয়ের এ প্রতীকী ছবি চ্যাটজিপিটি দিয়ে বানানো।

বিডিনিউজ২৪

নাজমুল হাসান সাগর

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 04 Sep 2026, 01:33 AM

Updated : 17 Sep 2026, 02:54 AM

সকালের ব্যস্ততা তখন সবে শুরু হয়েছে। রাজধানীর সড়কে ছুটছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা। এরমধ্যে সড়কের পাশে চা দোকানে থামলেন এক চালক। ক্লান্তি কাটাতে চুমুক দিচ্ছিলেন চায়ের কাপে; অপরিচিত ‘যাত্রীর’ সঙ্গে চলল কয়েক মুহূর্তের আলাপচারিতা।

চায়ে চুমুক দেওয়ার মিনিট পনেরোর মধ্যেই বদলে গেল সবকিছু। শরীর অবশ হয়ে আসতে শুরু করল। মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। একসময় নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণও হারিয়ে ফেললেন চালক। এরপর কী ঘটে, তার কিছুই মনে নেই। জ্ঞান ফিরলে তিনি জানতে পারেন, তার সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি আর নেই।

শুধু তাই নয়, চালককে অচেতন করে অটোরিকশা নিয়ে পালানোর পর সেটি ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে গাড়ি মালিকের কাছে দাবি করা হয় বড় অঙ্কের টাকা।

রাজধানীতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ছিনতাইয়ের এমন চক্রের বিষয়ে তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) লালবাগ বিভাগের গাড়ি চুরি প্রতিরোধ দল।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীতে এ ধরনের অন্তত দুটি শক্তিশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে। চক্র দুটির একটির নেতা জামাল মেম্বার, অন্যটির নেতৃত্বে আছেন অলি নামের একজন। দুই চক্রে নিয়মিত সদস্য রয়েছে অন্তত ১৪ জন।

একই কায়দায় সম্প্রতি অটোরিকশা চুরির সময় বাড্ডা থেকে জামাল ও তার দলের পাঁচ সদস্যকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, গ্রামের মানুষের কাছে জনপ্রতিনিধি ও পরোপকারী হিসেবে পরিচিত জামাল ঢাকায় একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাই চক্রের নিয়ন্ত্রণকারী।

গেল ৬ অগাস্ট জামালকে প্রধান আসামি করে পল্টন থানায় মামলা করেছে ডিবির লালবাগ বিভাগ। 

ওসি আরিফুল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, চক্রের প্রধান হিসেবে মামলায় জামাল হোসেনের নাম রয়েছে। সহযোগী করা হয়েছে লিটন সরদার, মান্নান খাঁ, আব্দুল করিম, লাভলু মাতব্বর ও ইউনূসকে।

গাড়ি চুরি প্রতিরোধ দলের অতিরিক্ত উপ কমিশনার এনায়েত কবীর সোয়েব শুক্রবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “খোলা চোখে এই চক্রকে সাধারণ অপরাধী চক্র মনে হয়। তবে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে যেভাবে চালককে অজ্ঞান অবস্থায় জিম্মি করে রাখা হয়; এতে ভুক্তভোগীর বড় ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা থাকে।

উপরে বাঁ থেকে জামাল মেম্বার, লিটন সরদার, মান্নান খাঁ; নিচে আব্দুল করিম, লাভলু মাতব্বর ও ইউনূস।

উপরে বাঁ থেকে জামাল মেম্বার, লিটন সরদার, মান্নান খাঁ; নিচে আব্দুল করিম, লাভলু মাতব্বর ও ইউনূস।

“অনেক সময় অচেতন চালকের জ্ঞান আর নাও ফিরতে পারে। জামালসহ এই চক্রের প্রায় সবাইকেই ধরে ফেলেছি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে অধিকতর তদন্তের জন্য। তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত বলতে পারব।”

কীভাবে কাজ করে এ ছিনতাই চক্র?

সকালে দলবেঁধে বের হন তারা। সঙ্গে থাকে জামালের নিজস্ব সিএনজি অটোরিকশা। ঢাকার নানা প্রান্ত চষে ঠিক করা হয় নিশানা। তবে যাত্রী খোঁজা নয়, তাদের লক্ষ্য অটোরিকশা চালক।

রাস্তার পাশে ফুটপাতের চায়ের দোকানে বসে চা পান করছেন কোনো চালক- এমন দৃশ্য দেখলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে চক্রটি। চালক চা খেতে বসার পর একজন সদস্য এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে ডাকেন। কোথাও ভাড়ায় যাবেন কি না, জানতে চান। শুরু হয় ভাড়া নিয়ে দর কষাকষি।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, এ কথোপকথনের আড়ালেই মূল কাজটি সেরে ফেলেন চক্রের আরেক সদস্য। চালকের মনোযোগ যখন ভাড়া ঠিক করা নিয়ে ব্যস্ত, তখন কৌশলে তার চায়ের কাপে চেতনানাশক ওষুধের গুঁড়া মিশিয়ে দেওয়া হয়। 

এরপর ভাড়া ঠিক করতে আসা সদস্য নিজেও এক কাপ চায়ের ফরমায়েশ দেন। চালকের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে চা পান করে তৈরি করা হয় বিশ্বাসের পরিবেশ। চা শেষ হলে চালককে গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে সিএনজিতে ওঠেন চক্রের সদস্যরা।

কিছুদূর যাওয়ার পর ওষুধের প্রভাবে চালক অসুস্থ হয়ে পড়লে শুরু হয় চক্রটির পরবর্তী ধাপ।

তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডিবি পুলিশ বলছে, কখনও অসুস্থ চালককে অন্য একটি গাড়িতে তুলে গ্যারেজে নিয়ে যাওয়া হয়, কখনও নেওয়া হয় হাসপাতালে। আবার অবস্থার অবনতি হলে কোনো কোনো চালককে রাস্তায় ফেলে রেখেও পালিয়ে যান তারা। তবে চালক অসুস্থ হয়ে পড়ার আগেই তার মোবাইল ফোন এবং সিএনজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন চক্রের সদস্যরা।

এরপর ওই চালকের ফোন ব্যবহার করেই যোগাযোগ করা হয় গাড়ির মালিকের সঙ্গে। গাড়ি ফেরত পেতে মালিকের কাছে দাবি করা হয় ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। টাকা পরিশোধ করা হলে নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে দেওয়া হয় অটোরিকশাটি।

পুলিশ কর্মকর্তাদের দেওয়া এ বর্ণনা যাচাই করতে ভুক্তভোগীদের ভাষ্য জানার চেষ্টা করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। চলতি অগাস্টের শুরুর দিকে এমনই এক ঘটনার শিকার চালক মোহাম্মদ মিলনের সঙ্গে কথা হয় শুক্রবার। বছর দশেক আগে রংপুর থেকে আসা মিলন এ যান চালিয়েই জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। কিন্তু কয়েক মিনিটের এক ঘটনা তার দীর্ঘদিনের চালক জীবনের হিসাবই বদলে দিয়েছে।

মিলনের ভাষ্য, ঘটনার দিন সকালে কাঁঠালবাগান এলাকার একটি চায়ের দোকানে বসে চায়ের ফরমায়েশ দিয়েছিলেন তিনি। এসময় সাধারণ যাত্রীর বেশে এক ব্যক্তি তার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। একপর্যায়ে ওয়ারী যাওয়ার জন্য তার গাড়ির ভাড়াও ঠিক করেন ওই ব্যক্তি। এরপরই বদলে যায় পরিস্থিতি।

ভুক্তভোগী মিলন বলেন, চা খাওয়ার পরপরই শরীর খারাপ লাগতে শুরু করে তার। ধীরে ধীরে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে নিজের ওপর আর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলছিলেন, “চায়ের দোকানে কথাবার্তা হইছিল, এরপর চা খাওয়ার পরই এ অবস্থা।

“শেরাটনের সামনে গিয়ে আর নিজের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারিনি। দুই দিন কোনো জ্ঞানই ছিল না।”

মিলনের ধারণা, চায়ের সঙ্গে কোনো ধরনের চেতনানাশক বা ঘুমের ওষুধ মেশানো হয়েছিল। 

এ ট্যাবলেটের গুঁড়া চায়ে মিশিয়ে চালককে অজ্ঞান করা হয়। 

এ ট্যাবলেটের গুঁড়া চায়ে মিশিয়ে চালককে অজ্ঞান করা হয়।

তিনি বলেন, “অচেতন হওয়ার পর আমার কাছ থেকে সিএনজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। পরে গাড়ি নিয়ে তারা সরে যায়। এরপর আমার ফোন থেকেই গাড়ির মালিককে ফোন দেয়।”  

মিলন দাবি করেন, সাধারণত এ ধরনের ঘটনায় ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হলেও তার গাড়ির ক্ষেত্রে চক্রটি ৮০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়।

আড়াই মাস আগে অন্য এক ঘটনায় একই চক্রের হাতে অটোরিকশা খোয়ানোর পর টাকা দিয়ে তা ফেরত আনার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শাকিল নামে এক গাড়ি মেকানিক। শুক্রবার সন্ধ্যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে কথা হয় তার।

“খলিল নামে এক সিএনজিচালককে অচেতন করে তার গাড়ি নিয়ে যায় জামালের চক্র। পরে কাকরাইল এলাকা থেকে অচেতন অবস্থায় খলিলকে উদ্ধার করেন তারা।

“খলিলের গাড়ি নেওয়ার পরে জামাল আমাদের গ্যারেজ মালিককে ফোন দিয়ে টাকা দাবি করে। আমরা ৫৫ হাজার টাকা নিয়ে শনির আখড়া ব্রিজের ওপারে যাই। সেখানে টাকা দিয়ে সিএনজি নিয়ে আসি। আমাদের কাছ থেকে টাকাটা জামালই নিয়েছিল,” বলছিলেন শাকিল।

এসব ঘটনায় খুব কম ভুক্তভোগীই আইনের আশ্রয় নেন বলে ভাষ্য তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা ও ভুক্তভোগীদের।

এ ধরনের চুরির শিকার হয়েছেন—এমন অন্তত চারজন ভুক্তভোগী চালক ও গ্যারেজ মালিকদের সঙ্গে কথা বলেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। 

মামলা বা থানায় কেন অভিযোগ করা হয় না, এমন প্রশ্নে এক গ্যারেজ মালিক বলেন, আইনি প্রক্রিয়া বেশ ঝামেলার এবং সময়সাধ্য ও বেশি ব্যয়বহুল ব্যাপার। তাই সহজে ঝামেলা মেটানোর জন্য চক্রের সঙ্গেই সমঝোতা করে সবাই। 

চেতনানাশক সংগ্রহ কীভাবে, এর ঝুঁকিইবা কতটা?

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চক্রটি চায়ের সঙ্গে যে ওষুধ মেশায়, সেটি এক শ্রেণির মনস্তাত্ত্বিক ওষুধ। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ওষুধ কেনা ও সেবন নিষিদ্ধ হলেও জামাল অবৈধ পথে তা সংগ্রহ করতেন।

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের চর হোগলাবুনিয়ায় জামাল মেম্বারের বাড়ি।

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের চর হোগলাবুনিয়ায় জামাল মেম্বারের বাড়ি।

জামালের দেওয়া তথ্যের বরাতে তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর এলাকার একটি চক্রের কাছ থেকে চড়া দামে এবং কঠোর গোপনীয়তা মেনে চেতনানাশক ওষুধ সংগ্রহ করেন জামাল। প্রায় ৩০০ পাতা ট্যাবলেট তিনি দেড় লাখ টাকায় সংগ্রহ করেছেন। ওই চক্রের সদস্যদের সঙ্গে তার কখনও সরাসরি দেখা হয়নি বলেও জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন জামাল।

ফোনে যোগাযোগের পর আগেই টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হত। এরপর নির্দিষ্ট একটি জায়গায় ওষুধ রেখে যেতেন সরবরাহকারীরা। সেখান থেকে ওষুধ সংগ্রহ করে ঢাকায় এনে চক্রের সদস্যদের মাধ্যমে ব্যবহার করা হত।

চিকিৎসকরা বলছেন, তীব্র উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা ও ঘুমের সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধটি নির্দিষ্ট মাত্রায় স্বল্প সময়ের জন্য ব্যবহার করা হয়।

তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এবং বিশেষ করে কাউকে অচেতন করার উদ্দেশ্যে এই ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “একজন মানুষকে অচেতন করতে একসঙ্গে অনেক ঘুমের ওষুধ ও মানসিক রোগের ওষুধ গুঁড়া করে খাওয়ানো হয় ভুক্তভোগীকে। এটাকে আকর্ষণীয় ও সুস্বাদু করতে এই গুঁড়ার সঙ্গে কখনো মেশানো হয় চা বা জুস। আবার কখনো মেশানো হয় কেক বা পেস্ট্রি জাতীয় খাবারের সঙ্গে।

“খাওয়ার পর খুব দ্রুত সময়ে ভুক্তভোগী জ্ঞান হারায়। এ ধরনের ওষুধ মেশানো খাবার খাওয়ার পর খুব দ্রুত কিডনি ও লিভার অচল হয়ে যেতে পারে। এতে ভুক্তভোগীর মৃত্যুও হতে পারে।”

ডা. লেলিন বলেন, অতিরিক্ত মাত্রায় এ ধরনের ওষুধ সেবনে যারা প্রাণে বেঁচে যান, তাদের ক্ষেত্রেও গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। অঞ্চলভেদে ওষুধের ধরন ও মাত্রার পার্থক্য থাকতে পারে।

ছিনতাই চক্রের হোতা জামাল এলাকায় ইউপি সদস্য

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের চর হোগলাবুনিয়া থেকে তরুণ বয়সে ঢাকায় আসেন জামাল হোসেন। কর্মজীবনের শুরু ঢাকা সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে। সিটি করপোরেশন দুই ভাগ হওয়ার পর দীর্ঘদিন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে কাজ করেন তিনি। এর পাশাপাশি ২০০৫ সাল থেকে সিএনজিচালিত গাড়ি চালাতেন।

সেই সময় ধানমন্ডির আবাহনী মাঠ এলাকায় চা খেতে গিয়ে নিজেই এ চক্রের কৌশলের শিকার হন। চায়ের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে তার সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে যায় একটি চক্র। পরে টাকা দিয়ে গাড়ি ফেরত পান তিনি।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এরপরই ধীরে ধীরে ওই চক্রের সঙ্গে যুক্ত হন জামাল। প্রথমে চুরি হওয়া সিএনজি অটোরিকশা মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেটি ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যস্থতা করতেন। পরে নিজেই গড়ে তোলেন চক্র।

দেড় যুগের বেশি সময়ে অটোরিকশা চুরি ও ফিরিয়ে দেওয়ার নামে অর্থ আদায় করে সম্পদ গড়েন জামাল। ২০২৪ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে হোগলাবুনিয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন। 

তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সিএনজি চালিয়ে ভালো টাকা আয় করলেও ক্লাব-ক্যাসিনোতে সব ঢেলেছেন। অবশিষ্ট টাকায় গ্রামে গড়ার চেষ্টা করেছেন আলিশান বাড়ি ও সম্পত্তি। 

হোগলাবুনিয়ায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জামালের বিষয়ে এলাকাবাসী তেমন কিছুই জানে না। তবে তার বাড়িতে লোকজন পাওয়া যায়নি।

এলাকাবাসীরার বলছেন, পুরনো যে বাড়ি রয়েছে, সেটির পাশেই আরও একটি নির্মাণাধীন পাকা বাড়ির কাজ জামাল অসমাপ্ত রেখেছেন দীর্ঘদিন ধরে।

জামালের ঢাকার কর্মকাণ্ডের কথা শুনে তারা বিস্ময় প্রকাশ করেন।

জামাল মেম্বার পুরাতন বাড়ির পাশেই বানাচ্ছেন আরেকটি বাড়ি।

জামাল মেম্বার পুরাতন বাড়ির পাশেই বানাচ্ছেন আরেকটি বাড়ি।

প্রতিবেশীদের একজন বলেন, “উনারে আমরা পরোপকারী মানুষ হিসেবেই জানি। কেউ টাকার অভাবে চিকিৎসা করাইতে না পারলে তারে ডাইকা নিয়া পাঁচশ, পাঁচ হাজার, প্রয়োজনে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে দেখছি। 

“ঈদের সময় বাড়ি আসলে গরিব-অসহায়দের ডাইকা নিয়া শাড়ি, লুঙ্গি, জামা-কাপড় দিত। কেউ যাইয়া কোনো সাহায্য চাইলে কোনো সময় না করতো না। চাল, ডাল, তরিতরকারিও কিনা দিতে দেখছি।”

চক্রে কে কী করেন, কত টাকা পান

গোয়েন্দা পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হোতা জামাল চালকদের নিশানায় নিজের গাড়ি ব্যবহার করলেও চক্রের সদস্যদের দৈনিক ৫০০ টাকা করে খরচা দিতেন। একটি গাড়ি থেকে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় হলে তার বেশিরভাগই পান জামাল। 

চক্রের সদস্য লাভলু মাতুব্বর (৫০) অন্য সদস্যদের বহনে ব্যবহৃত সিএনজি অটোরিকশা চালিয়ে পেতেন ২ হাজার ৫০০ টাকা। লিটন সরদার (৫৯) চালকের সঙ্গে চায়ের দোকানে কথা বলা ও চায়ে ওষুধ মেশানোর দায়িত্বে পেতেন ৫ হাজার টাকা। স্বপন ভাড়া ঠিক করার বিনিময়ে পেতেন ৬ হাজার টাকা। আর ইউসুফ মৃধা (৫২) চালকের মোবাইল ও সিএনজির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কাজ করে পেতেন ৬ হাজার টাকা। জামালসহ এই চক্রের সবার বিরুদ্ধেই একাধিক মামলা রয়েছে।

তাদের অপরাধের ইতিহাস (পিসিপিআর) পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জামালের বিরুদ্ধে হেরোইনের মত মাদক কারবারে জড়িত থাকার মামলাসহ আটটি মামলা রয়েছে। মান্নান খাঁর বিরুদ্ধে সাতটি, লিটন সরদারের তিনটি, আব্দুল করিমের দুটি ও লাভলু মাতব্বর একটি মামলার আসামি।

এ ধরনের সিএনজি অটোরিকশা বা গাড়ি চুরির চক্রের বিরুদ্ধে বড় অভিযানের পরিকল্পনার বিষয়ে ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমাদের বিশেষ টিম প্রতিনিয়ত এসব নিয়ে কাজ করছে। তারই ধারাবাহিকতায় এই চক্র (জামালের সিএনজি অটোরিকশা চোর চক্র) ধরা পড়েছে। 

“চক্রটি নিয়ে অনুসন্ধান চলছে, তাদের মাধ্যমে আরও বেশি কিছু জানতে পারব আশা করছি। গত কয়েকদিন আগেও একটি চক্র ধরে এক দিনে ১৬টি চোরাই বাইক উদ্ধার করেছে ডিবি। এগুলো কার্যক্রম চলমান।”