Published : 04 Sep 2025, 02:35 PM
বাংলাদেশে যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেছেন সংস্থাটির চেয়ারপারসন ফ্রাঁসোয়া ভ্যালেরিয়াঁ।
বৃহস্পতিবার সকালে ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য বরেন।
এক সাংবাদিক জানতে চান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটে। এরপর টিআই বাংলাদেশে প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে কি না।
জবাবে ফ্রাঁসোয়া ভ্যালেরিয়াঁ বলেন, “একেবারেই না। দুর্নীতি বাংলাদেশের মতো প্রতিটি দেশেই রয়েছে। যেখানে ক্ষমতা থাকবে, সেখানে অপব্যবহারের প্রলোভনও থাকবে।
“তাই নাগরিক সমাজ সবসময় অপরিহার্য। টিআই বাংলাদেশ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক।”
তিন দিনের সফরে সোমবার বাংলাদেশে আসেন বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা—টিআইয়ের আন্তর্জাতিক পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারপারসন ফ্রাঁসোয়া ভ্যালেরিয়াঁ। ২০২৩ সালে চেয়ার নির্বাচিত হওয়ার পর এটিই তার প্রথম বাংলাদেশ সফর।
টিআইবি বলছে, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ের অভিজ্ঞতা বিনিময়, টিআইবির কার্যক্রম, সম্ভাবনা এবং চ্যালেঞ্জগুলোর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বিনিময় তার এ সফরের মূল উদ্দেশ্য।
সফরের অংশ হিসেবে বুধবার প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ফ্রাঁসোয়া ভ্যালেরিয়াঁ।
সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা কেমন, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “আমরা এসিসি (দুদক), প্রধান বিচারপতি এবং প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছি। প্রতিটি বৈঠকেই আমি অনুভব করেছি যে- তারা রূপান্তরের এই যাত্রা সফল করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
“চ্যালেঞ্জ অনেক বড়, তবে তাদের আন্তরিক ইচ্ছা আছে- এগুলো মোকাবিলা করার।”
তার সফরের মূল উদ্দেশ্য কী, এমন প্রশ্নের জবাবে ফ্রাঁসোয়া ভ্যালেরিয়াঁ বলেন, “এটি দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি চ্যাপ্টার সফরের অংশ—মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ। আমি এখানে এসেছি দুর্নীতিবিরোধী বৈশ্বিক আন্দোলনের পূর্ণ সমর্থন ও সংহতি প্রদর্শনের জন্য।

“দুর্নীতি সম্পর্কিত নির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে আমি মন্তব্য করি না, সেটা টিআইবির দায়িত্ব। তবে সাধারণভাবে বলব—প্রতিটি দেশে তদন্ত, বিচার ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা অপরিহার্য।”
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে টিআইবি কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “অনুমান অনুযায়ী, ১৫ বছরে বছরে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার চুরি হয়েছে। এটি বৈশ্বিক দুর্নীতির অর্থনীতির অংশ। সমাধান হলো—আমাদের জানতে হবে টাকা কোথায় গেছে।
“এজন্য দরকার ‘বেনিফিসিয়াল ওনারশিপ ট্রান্সপারেসি'। আইনের মাধ্যমে প্রকৃত মালিক কে, তা জানা জরুরি। আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও অপরিহার্য। সম্প্রতি লন্ডনে টিআইবির উদ্যোগে প্রায় ১৮৫ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের সম্পদ বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এখন তা বাংলাদেশের জনগণের কাছে ফিরিয়ে আনা জরুরি।”
তিন দিনের এ সফরে টিআইবির কর্মী, টিআইবির উদ্যোগে দেশের ৪৫টি অঞ্চলে স্বেচ্ছাসেবাভিত্তিক সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি, তরুণদের প্ল্যাটফর্ম ৬৫টি ইয়ুথ এনগেজমেন্ট অ্যান্ড সাপোর্ট (ইয়েস) নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন ফ্রাঁসোয়া ভ্যালেরিয়াঁ।
এ প্রসঙ্গে ফ্রাঁসোয়া বলেন, “আমি সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি আমাদের বাংলাদেশের অংশ কতটা প্রাণবন্ত। আমরা বিশ্বজুড়ে ১০০টিরও বেশি দেশে আছি, এর মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় (টিআইবি)। এখানে তরুণ কর্মীদের উদ্দীপনা ও নিষ্ঠা আমাকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করেছে।
“এছাড়া আমি সারা দেশ থেকে আসা সংশ্লিষ্ট নাগরিক কমিটির সভাপতি এবং যুব কমিটির নির্বাচিত নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। এটি বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ কতটা সক্রিয় ও প্রাণবন্ত তা প্রমাণ করে।”
তিনি বলেন, “আসলে আমি আগেই জানতাম—কারণ আমি গভীর আগ্রহ নিয়ে গত বছর বাংলাদেশে তরুণ, নারী, শ্রমজীবী মানুষসহ সাধারণ নাগরিকদের নেতৃত্বে এক কর্তৃত্ববাদী ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক গণআন্দোলন পর্যবেক্ষণ করেছি।
“বিশ্বজুড়ে যেখানে অনেক দেশে কর্তৃত্ববাদ বেড়ে চলেছে, সেখানে বাংলাদেশ ছিল এক ব্যতিক্রম। তাই আমাদের বৈশ্বিক নাগরিক সমাজ, যেটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়ছে, তারা বাংলাদেশে কী ঘটছে তা প্রশংসার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।”
টিআইয়ের চেয়ারপারসন ফ্রাঁসোয়া বলেন, “আমরা জানি, ঝুঁকি অনেক বেশি, কিন্তু আমরা কেবল সাধুবাদ জানাই সংস্কার কমিশন, ঐকমত্য কমিশনসহ নানা সংস্কারের উদ্যোগগুলোকে—যার অনেকগুলোই ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রস্তাবিত।”
তিনি বলেন, “মূল বার্তা একটাই—সব সংস্কার টেকসই হতে হবে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং ক্ষমতার প্রয়োগের ধরনকে গভীরভাবে সংস্কার করতে হবে। আর আমি নিশ্চিত যে নাগরিক সমাজের নজরদারির মাধ্যমে এই সংস্কার সফল হবে।”
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, আউটরিচ এবং কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।