Published : 27 Apr 2026, 03:37 PM
জুলাই আন্দোলনের সময় মিরপুরে দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আলোচিত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর রিমান্ড শুনানিতে উঠে এল ‘ওয়ান-ইলেভেন’ প্রসঙ্গ।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ বলেছে, সেই সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ‘ঝুলিয়ে-পিটিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে দেওয়ার’ কারিগরদের একজন এই মাসুদ। এসময় দাঁড়িয়ে থাকা আসামি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “সম্পূর্ণ মিথ্যা।”
সোমবার ঢাকার মহানগর হাকিম মনিরুল ইসলামের আদালতে এ শুনানি হয়।
রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকা থেকে গত ২৩ মার্চ অবসরপ্রাপ্ত লেফটেনেন্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সিন্ডিকেট করে ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও মানবপাচারের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় তাকে। পরদিন এ মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়।
গত ২৯ মার্চ দ্বিতীয় দফায় ৬ দিন এবং ৪ এপ্রিল তৃতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়।
এরপর ৭ এপ্রিল জুলাই আন্দোলনকালে মিরপুরে দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় তাকে চার দিনের রিমান্ডে পায় পুলিশ। ১১ এপ্রিল তার আরও চার দিনের রিমান্ডের আদেশ হয়।
পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের সময় অসুস্থ হয়ে পড়ায় মাসুদ উদ্দিনকে ১২ এপ্রিল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
চিকিৎসা শেষে এদিন তাকে আদালতে হাজির করে তিন কারণ দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুনরায় সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা, ডিবি পুলিশের এসআই কফিল উদ্দিন।
আবেদনে বলা হয়, পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় গত ১২ এপ্রিল দুপুর ২টার দিকে আসামি অসুস্থবোধ করলে তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষা করে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা গ্রহণ শেষে ২৭ এপ্রিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে ছাড়পত্র দিয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা আবেদনে বলেছেন, জিজ্ঞাসাবাদে আসামির কাছ থেকে মামলার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে, যা তদন্ত কাজে সহায়ক হচ্ছে। তার দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো যাচাই করার জন্য তার সাত দিনের রিমান্ডের প্রয়োজন।
শুনানিকালে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে এজলাসে তোলা হয়।
তার পক্ষে আইনজীবী তৌহিদুল ইসলাম সজীব রিমান্ড আবেদন বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন।
তিনি বলেন, “রিমান্ড নামঞ্জুরের জন্য রিমান্ড ফরওয়ার্ডিংই যথেষ্ট। গত ১১ এপ্রিল তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। তাকে রিমান্ডে নেওয়া হলে পরদিনই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আজ পর্যন্ত তিনি হাসপাতালেই ছিলেন।
“তিনি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। ৭২ বছর বয়সী একজন অসুস্থ মানুষ। এ মামলায় দুই দফায় তাকে ৮ দিনের রিমান্ডেও নেওয়া হয়। রিমান্ডে কী ডেভেলপ আছে, ফরওয়ার্ডিংয়ে নাই। এতো রোগ থাকার পরও তাকে রিমান্ডে নেন; অসুস্থ হয়ে পড়লে হসপিটালে ভর্তি করা হয়।”
আইনজীবী সজীব বলেন, “রীতিমত জোর করে হাসপাতাল থেকে তাকে ছাড়িয়ে আনা হয়েছে। ২৬ এপ্রিল ও ২৭ এপ্রিলের হাসপাতালের দুইটি ছাড়পত্র। তাও কাটাছেঁড়া। অসুস্থ মানুষ, মানবিক দিক থেকে রিমান্ড বাতিল করে জামিন প্রার্থনা করছি।
“আর মামলা নিয়ে না হয় নাই বললাম। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নাই তার বিরুদ্ধে। তদন্ত কর্মকর্তার একটা ফরমেট আছে, তিনটা লাইন লিখেই রিমান্ড চান। তার জন্য দয়া চাই।”
রাষ্ট্রপক্ষে মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন রিমান্ড আবেদনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, “২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের মূল কারিগরদের একজন এ আসামি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পিটিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে দেন।”
এসময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “সম্পূর্ণ মিথ্যা।”
২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে থাকা মেজর জেনারেল মাসুদ এক-এগারোর পট পরিবর্তনের পর পদোন্নতি পেয়ে লেফটেনেন্ট জেনারেল হন। সে সময় আলোচিত ‘গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র সমন্বয়ক ছিলেন তিনি।
ওই কমিটির প্রধান ছিলেন তখনকার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এম এ মতিন। তবে জরুরি অবস্থার ওই সময়ে পর্দার আড়ালে থেকে জেনারেল মাসুদই যৌথবাহিনীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতেন বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হত।
সেনা কর্মকর্তাদের নেতৃত্বাধীন ওই বাহিনী শীর্ষ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করত এবং পরে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা দেওয়া হত।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সুমন বলেন, “তিনি যদি এতো ইনোসেন্ট হতেন, তাহলে হাসিনার কাছে নমিনেশন চাইতেন না। হাসিনার কাছে জাতীয় নির্বাচনে নমিনেশন চান। হাসিনা তাকে পরামর্শ দেন জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচন করার।
“জাতীয় পার্টিতে না গেলে মানুষ সব বুঝে যাবে। হাসিনা এক দিনে ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠেননি। তাদের কারণে কোনো বিভাগ সঠিকভাবে চলতে পারেনি।”
রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী বলেন, “মইন উ আহমেদ সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আনুগত্যা নিয়ে সেনাপ্রধান হন। পরে তার ছেলেকেই পিটিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে দিয়েছে।
“মইন উ আহমেদের বাড়ি নোয়াখালীতে। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বৃহত্তর নোয়াখালীর হওয়ায় মইন উ আহমেদের সাথে তার সখ্যতা ছিল।”
এসময় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে হাসতে দেখা যায়।
কৌঁসুলি সুমন বলেন, রিমান্ডে মাসুদ উদ্দিন ভাসা ভাসা তথ্য দিচ্ছেন। মাসুদ উদ্দিন হত্যা মামলায় তথ্য দেওয়া শুরু করেছেন। এজন্য তার আবারও রিমান্ড প্রয়োজন।
শুনানি নিয়ে আদালত আসামির তিন দিনের রিমান্ডের আদেশ দেয়।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকালে মিরপুর ১০ নম্বর ফলপট্টি এলাকায় ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে দেশি অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে হামলা চালায় আওয়ামী লীগের ৫০০-৭০০ নেতাকর্মী। এসময় আসামির নির্দেশে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়।
তাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন দেলোয়ার হোসেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২১ জুলাই শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় গত বছরের ৬ জুলাই দেলোয়ারের স্ত্রী মিরপুর মডেল থানায় মামলা করেন।
২০০৬ সালের শেষ ভাগে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পর রাজনৈতিক মতানৈক্যের মধ্যে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। জাতীয় নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় আন্দোলনরত দলগুলো।
ওই অবস্থায় সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা-হানাহানির আপাত অবসান ঘটে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের জরুরি অবস্থা জারি করার মধ্যে দিয়ে। একইসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ ছেড়ে দেন তিনি। বাতিল করা হয় ২২ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন।
আলোচিত সেই ঘটনাপ্রবাহের শুরুর দিনটি পরিচিতি পায় ‘ওয়ান ইলেভেন’ নামে। বিএনপি নেতাদের বিশ্বাস, ‘এক-এগারো’ না ঘটলে আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে তারাই আবার ক্ষমতায় ফিরতেন। আর রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন সেই ‘বন্দোবস্তই’ করছিলেন বলে অভিযোগ করেন বিরোধীরা।
বলা হয়, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি এবং ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সেনা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।