যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ডের তালিকায় বাংলাদেশের থাকা ‘অস্বাভাবিক না’: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা
যারা আইন ভেঙে ঝুঁকি নিয়ে অবৈধভাবে বিদেশে যায়, তাদের ‘ভিকটিম’ হিসেবে দেখা বন্ধ করার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ভিসা পেতে যেসব দেশের নাগরিকদের ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ‘বন্ড’ দিতে হবে, সেই তালিকায় বাংলাদেশের থাকাকে ‘অস্বাভাবিক’ মনে করছেন না পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।
বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, “অবশ্যই দুঃখজনক, অবশ্যই কষ্টকর আমাদের জন্য। কিন্তু এটা অস্বাভাবিক না।”
নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যায় উপদেষ্টা বলেন, “আমেরিকা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটা শুধু বাংলাদেশের বিষয় না, অনেকগুলো দেশের মধ্যে বাংলাদেশও আছে। কোন দেশগুলি আছে?
“যাদের ইমিগ্রেশন নিয়ে প্রবলেম আছে। আপনারা আমেরিকানদের পরিসংখ্যান দেখেছেন যে, যারা ওখানে ওদের সোশ্যাল সিস্টেম থেকে এভাবে গিয়ে পয়সা নেয়, তাদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা সর্বাধিক। তাহলে তারা যদি কিছু দেশের ওপর এরকম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, সেটার মধ্যে বাংলাদেশ থাকবে, এটা আমার কাছে খুব অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।”
ভিসা বন্ডের শর্তযুক্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশসহ নতুন কয়েকটি দেশের নাম যুক্ত করে মঙ্গলবার হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, সবশেষ হালনাগাদের পর মোট ৩৮টি দেশের নাগরিকরা এই ভিসা বন্ডের শর্তের আওতায় এসেছেন। বাংলাদেশসহ নতুন করে যুক্ত হওয়া দেশগুলোর ক্ষেত্রে জামানতের নিয়ম কার্যকর হবে আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে।
এই তালিকায় নাম ওঠার মানে হল, বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী কোনো ব্যক্তি যদি বি১/বি২ ভিসার জন্য যোগ্য হন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আবেদন করতে তাকে ৫ হাজার, ১০ হাজার অথবা ১৫ হাজার ডলার বন্ড বা জামানত দিতে হবে।
কারো ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জামানত ধার্য হলে বর্তমান বিনিময় হারে তাকে গুনতে হবে প্রায় ১৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।
আবেদনকারীকে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম পে ডট গভ এর মাধ্যমে বন্ডের শর্তে সম্মতিও জানাতে হবে।
এই জামানতের অঙ্ক নির্ধারণ করা হবে ভিসা সাক্ষাৎকারের সময়। এই অর্থ ফেরতযোগ্য। অর্থাৎ, ভিসা প্রত্যাখ্যাত হলে কিংবা ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময় না থাকাসহ অন্যান্য শর্ত মেনে চললে জমা দেওয়া অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে।
ভিসাধারীরা যাতে নির্ধারিত মেয়াদের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান না করেন, তা নিশ্চিত করাই এ ভিসা বন্ডের মূল লক্ষ্য। তবে জামানত দিলেই ভিসা নিশ্চিত ভেবে নেওয়ার কারণ নেই। ভিসা সাক্ষাৎকারে কনস্যুলার কর্মকর্তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে বলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ‘অনিয়মিত অভিবাসনের’ কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “এরা যদি সবাই গত এক বছরে যেত, আমি বলতাম যে আমরা দায়ী। এবং যদি এই সমস্যাটা এই এক বছরে সৃষ্টি হত, আমি তাও বলতাম যে, সরকারের কিছু দায়দায়িত্ব আছে।
“এই পদ্ধতি চলছে দীর্ঘদিন ধরে। কাজেই দায়দায়িত্ব, যদি আপনি ধরেন, যে পলিসিগত দায়দায়িত্ব যদি কারও থাকে, সেটা পূর্ববর্তী সব সরকারের আছে। সেটাকে আমরা পরিবর্তন করতে পারিনি।”
মানুষের এই ‘নড়াচড়া’ বন্ধ করার সাধ্য এই সরকার নেই কিংবা কোনো সরকারের ছিল না বলেও মন্তব্য করেন তৌহিত হোসেন।
তিনি বলেন, “পলিসির দিক থেকে যেটা আমি বলতে পারি, সেটা হলো যে প্রথম দিন থেকে আমরা কিন্তু অনিয়মিত অভিবাসনের বিরুদ্ধে কথা বলে আসছি, আপনাদের সামনে আমি এখানে দাঁড়িয়ে বলেছি।”
অনিয়মিত অভিবাসন বন্ধ করাকে এর একমাত্র সমাধান হিসাবে তুলে ধরে এর সঙ্গে জড়িতদের কেবল ‘ভুক্তভোগী’ হিসাবে না দেখানোর পরামর্শ দেন উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, “আপনাদের পত্রিকা এবং মিডিয়ার অ্যাটিচিউড হচ্ছে, কেউ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মারা গেছে, অথবা হাবুডুবু খেয়ে তারপরে উদ্ধার হয়ে এসছে, সে একজন ভিকটিম, তার প্রতি সব ধরনের সিম্প্যাথি।
“আমি সম্পূর্ণ এগ্রি করি, সে অবশ্যই ভিকটিম। পাশাপাশি কিন্তু আইন ভঙ্গ হয়েছে। কারণ গ্রামের যেই ছেলেটি এখান থেকে ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে কেনিয়া যাচ্ছে, তারতো আসলে কেনিয়াতে টুর করতে যাওয়ার সামর্থ্য নাই।”
সেই আইন ভাঙার পথ বন্ধ করতে এসব ব্যক্তিরা ভুক্তভোগী হলেও দায়ীদের বিচারের স্বার্থে তাদের সাহায্য গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “আমি চাই যে, এই দুর্ঘটনাগুলি, এই ট্রাজেডিগুলি না ঘটুক; এজন্য আমি বলছি যে যারা ফিরে আসবে, তাদের সাহায্য নিতে হবে। আমি খুব ভদ্রভাবে বললাম।
“কিন্তু সাহায্য নিতে গেলে অবশ্যই তাদেরকে আটকাতে হবে, বলতে হবে যে কাকে টাকা দিয়ে গিয়েছে। আপনি যদি সেই লোকগুলিকে আটকাতে না পারেন, জেলে নিতে না পারেন, তাহলে এই সমস্যার কোনো দিন সমাধান হবে না।”
তিনি বলেন, “আমরা সিম্প্যাথি দেখাব অবশ্যই ভিকটিমকে, কিন্তু ভিকটিম তাকে করেছে যারা, তাদেরকে আমাদের ধরার চেষ্টা করতে হবে। সেটা ধরতে গেলে কিন্তু কতগুলি পদ্ধতি আছে, সেখানে আমাদের সামাজিক সমর্থন লাগবে।
“আমরা (অন্তর্বর্তী সরকার) তো কয়েকদিন আছি আর ৩৫ দিন। কিন্তু যেই সরকারই আসুক না কেন, এই সমস্যার সমাধান করতে গেলে কিন্তু সামাজিক সহায়তা লাগবে। গ্রহণযোগ্যতা লাগবে যে, না, আসলেই ক্র্যাকডাউন করতে হবে। যদি সেটা করা না হয়, এই সমস্যার সমাধান হবে না।”
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ডের তালিকা থেকে অব্যাহতি পেতে বাংলাদেশ চেষ্টা চালাবে কি না, সেই প্রশ্নে তৌহিদ হোসেন বলেন, “এটা মাত্র হয়েছে। এটা অবশ্যই সাধারণ পদ্ধতিতে আমরা যাব, চেষ্টা করব যেন এটা থেকে আমাদেরকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আবেদন করব আমরা।”
ক্রীড়া উপদেষ্টার কথায় ‘পূর্ণ সমর্থন’
আইপিএল থেকে বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়া এবং তারপর ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার বিষয়ে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বক্তব্যে পূর্ণ সমর্থন থাকার কথা বলেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
এ বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমি খুব এক লাইন বলতেছি। ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল যেটা বলেছেন, আমি সম্পূর্ণ সমর্থন করি। আমি এটাকে এভাবে দেখি যে, একজন ক্রিকেটার, সেতো একটা সীমিত সময় ওখানে যাবে, খেলবে, তারপরে হোটেলে চলে যাবে। তার নিরাপত্তা যদি দেওয়ার সম্ভব না হয়, সে কারণেতো তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, আপাতদৃষ্টিতে।
“তাহলে আমার এই যে টিম যাবে, শুধু টিম যাবে না, টিমের সমর্থকরাওতো যাবে, খেলা দেখতে যাবে লোক। তাদের নিরাপত্তা প্রশ্ন আছে। আমরা কী করে বিশ্বাস করব যে, তারা নিরাপদ থাকবে?”
তৌহিদ হোসেন বলেন, “হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর যে একটা বাংলাদেশবিরোধী কার্যকলাপ এবং কথাবার্তা চলছে, সেটার প্রেক্ষিতে আসলে সত্যিকার অর্থেই তো ভারতীয় সংস্থাগুলির পক্ষে নিরাপত্তা দেওয়া কঠিন হবে, সবাইকে। সেই হিসাবে যে, আমরা আসলে খেলব কিন্তু ভারতের বাইরে খেলব, যেখানে সমস্যা হবে না।”
ভারতে খেলতে না যাওয়ার এই সময়ে বাণিজ্য চালু রাখার বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “নতুন করে এই ইস্যুটা এসছে। কিন্তু এরকম বিভিন্ন ইস্যু বিভিন্ন সময়ে এসেছে। আমি মনে করি যে, প্রত্যেকটিরই কিছু নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট তো থাকবেই। কিন্তু হাতে ধরে আমরা আমাদের স্বার্থ যেখানে আছে, যদি থাকে, সেখানে আমরা তো কিছু নষ্ট করতে যাব না।
“এখানে আমাদের স্বার্থ আছে না যাওয়াতে। কারণ আমাদের এখানে আমাদের লোকদের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত… কাজেই আমরা আমাদের লোকদেরকে পাঠাব না।
“কিন্তু চাল কেনাতে যদি স্বার্থ থাকে আমাদের, যদি আমরা কম দামে পাই এবং আমাদের কিনতেই হয়, তাহলে ভারত যদি আমাদের চাল রপ্তানি করে আমরা যদি কিনি, ব্যবসায়ীরা করতেছেন, আমি কোনো সমস্যা দেখি না।”
বাংলাদেশে নির্বাচন সামনে রেখে ভারতীয়দের জন্য ভ্রমণ ভিসা বন্ধ বা স্থগিত করা হয়েছে কি-না, এমন প্রশ্নে তৌহিদ হোসেন বলেন, “আমার কাছে এই ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেই।
“আমি যেটা করেছি সেটা হলো যে, আমাদের যে মিশনগুলোতে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে আমরা আপাতত ভিসা সেকশন বন্ধ রাখতে বলেছি। কারণ এটা নিরাপত্তার প্রশ্ন।”
