Published : 12 Jan 2026, 10:18 PM
আমলাদের প্রভাবশালী একটি অংশের কাছে ‘নতি স্বীকার’ করায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার উদ্যোগ ‘লক্ষ্যভ্রষ্ট’ হয়েছে বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সোমবার ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ প্রণয়নে সংস্কার বিমুখতা’ শীর্ষক পর্যালোচনা প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, সংস্কারের প্রশ্নে আমলাতান্ত্রের প্রভাবশালী মহলের অপশক্তির কাছে সরকারের নতি স্বীকার করেছে। আর অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হয়েছে সংস্কার-প্রতিরোধক মহলকে প্রতিহত করতে।
“এই অপশক্তির কাছে আত্মসমর্পণের ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাতিল এবং সংস্কার-পরিপন্থি অনেক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, এমনকি জুলাই সনদকে যুক্তিহীনভাবে লঙ্ঘন করে এমন নেতিবাচক উদাহরণ সৃষ্টি করা হয়েছে, যা পরবর্তী সরকারেরও অনুসরণ করার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে আমলাতন্ত্রের একাংশের অন্তর্ঘাতমূলক অপশক্তির কাছে সরকারের নতি স্বীকারের ফলে সংস্কার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।”
সংবাদ সম্মেলনে এ সরকারের সময়ে জারি করা দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, সাইবার সুরক্ষা, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা ও জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশের ওপর পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেন ইফতেখারুজ্জামান।
পর্যালোচনায় তিনি বলেন, সরকার ১১টি সংস্কার কমিশন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, একাধিক শ্বেতপত্র কমিটি, বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিটি এবং গুমসংক্রান্ত ‘কমিশন অব এনকোয়ারি’ গঠন করেছে। পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানকালে ‘কর্তৃত্ববাদী সরকার কর্তৃক পরিচালিত হত্যাকাণ্ডসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ তদন্তের জন্য জাতিসংঘকে আহ্বান জানানোর মত ইতিবাচক পদক্ষেপ দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এ সরকার সার্বিকভাবে সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত স্বচ্ছতা ও কাক্ষিত পরিবর্তনের সূচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
দুদক সংস্কার কমিশন প্রণীত সুপারিশমালাকে সরকার বা দুদক প্রত্যাশিত গুরুত্ব দেয়নি মন্তব্য করে এই কমিশনের প্রধান ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “দুদকের পরিপূর্ণ স্বাধীনতার পাশাপাশি জবাবদিহির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুপারিশ- একটি স্বাধীন বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি সৃষ্টির বিধান উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে, যদিও এক্ষেত্রে দুদকের শীর্ষ কর্তৃপক্ষের যেমন কোনো দ্বিমত ছিল না, তেমনি জুলাই সনদ অনুযায়ী প্রায় সকল রাজনৈতিক দলেরও নোট অব ডিসেন্ট-বিহীন সম্মতি ছিল, যা সরকার বা দুদক কারোরই অজানা ছিল না।
“দুদকের অধিকতর সক্রিয়তার ফলে আমলাতান্ত্রিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দুর্নীতি নিয়ন্ত্রিত হবে, এটা যারা চান না তারাই মূলত এই সংস্কারের বিরোধিতা করেছেন। তাই দুদকের ও সরকারের আমলাতান্ত্রিক শক্তির একাংশের কাছে উপদেষ্টা পরিষদ তথা অন্তর্বর্তী সরকার আত্মসমর্পণ করেছে এমন মনে হওয়া অমূলক নয়।”
পর্যালোচনায় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, “পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ প্রণয়নের মাধ্যমে একটি জনকল্যাণমুখী বাহিনী গঠনের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত স্বপ্নকে সম্পূর্ণভাবে ধুলিসাৎ করা হয়েছে।
“অধ্যাদেশে ‘স্বাধীন ও নিরপেক্ষ’ শব্দগুলো পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়নি। বাছাই কমিটিতে নাগরিক প্রতিনিধির বদলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও স্বরাষ্ট্র সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করার বিধান এবং সরকার কর্তৃক প্রজাতন্ত্রে কর্মরত ব্যক্তি বা সরকারি কর্মচারিকে নিয়োগের এখতিয়ার প্রদান মূলত পুলিশ কমিশনকে ক্ষমতাসীন সরকার ও অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ ও প্রশাসনিক আমলাদের ক্ষমতার অব্যাহত অপব্যবহারের রিসোর্টে পরিণত করার সুযোগ করে দিয়েছে।”
তিনি বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থার মত প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট আটককেন্দ্র কমিশনের কার্যক্রমের আওতাভুক্ত করা একটি ‘মাইলফলক হলেও শেষ পর্যায়ে অংশীজনদের অন্ধকারে রেখে বাছাই কমিটিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে অন্তর্ভুক্তির বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে।
“কমিশনের ওপর সরকারি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় একটিমাত্র ধারাই যথেষ্ট। তদুপরি ব্যাপকভাবে সরকারি কর্মচারীকে প্রেষণে নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে, যা কমিশনের স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করবে।”
উপস্থাপনায় আরও বলা হয়, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশে রাজস্ব নিরূপণ ও আদায় নিরীক্ষার সুযোগ না রাখা, আর্ন্তজাতিক সংস্থার সঙ্গে চুক্তি, মহা হিসাব নিরিক্ষকের প্রতিবেদন ও বিধি প্রণয়ণে সরকারের পরামর্শ নেওয়া ও পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা এবং রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ প্রণয়নে অদূরদর্শিতার ফলে আর্থিক জবাবদিহি বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে এনবিআরকে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ’সুযোগ হারানোকে সরকারের প্রস্তুতির অভাব’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে টিআইবি।
টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের এবং রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।