Published : 17 Sep 2025, 10:56 PM
বুকর পাশে কাটা দাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র দেখে সাজ্জাদ হোসেন সজলের লাশ শনাক্ত করেন বলে তার বাবা ট্রাইব্যুনালকে বলেছেন।
ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার আশুলিয়ায় ছয় লাশ পোড়ানোর মামলায় বুধবার ট্রাইব্যুনাল-২ এ সাক্ষ্য দেন সজলের বাবা মো. খলিলুর রহমান।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর অপর সদস্যরা হলেন- অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
সজলদের বাড়ি গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার শ্যামপুর মধ্যপাড়া গ্রামে। বর্তমান ঠিকানা ঢাকার আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায়।
তিনি ঢাকা নগরীর সিটি ইউনিভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র ছিলেন। একইসঙ্গে একটি কোম্পানিতে খণ্ডকালীন চাকরি করতেন। বাবা-মা, স্ত্রী ও দুই বছর বয়সী মেয়েসহ সজল আশুলিয়ার ভাড়া বাসায় থাকতেন।
খলিলুর রহমান বলেন, গত বছরের ৫ অগাস্ট বেলা সাড়ে ১১টায় সজলের মা তাকে (সাক্ষী) ফোন দিয়ে জানান যে ছেলে মিছিলে গেছে। দুপুরের পর থেকে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। সন্ধ্যার পর তার স্ত্রী (সজলের মা) সজলের এক বন্ধু শান্তকে নিয়ে খুঁজতে থাকেন। ওই রাতে সজল বাসায় ফেরেননি।
তিনি বলেন, পরের দিন বেলা ৩টা সাড়ে ৩টার দিকে অজ্ঞাত পরিচয় এক ছেলে তাকে ফোন দিয়ে বাইপাইলে আশুলিয়া থানা সংলগ্ন মসজিদের সামনে আসতে বলেন। এরপর তিনি তার স্ত্রী, ছেলের বউ ও মেয়েকে নিয়ে বাইপাইলে যান। সেখানে মসজিদের সামনে একটি পুলিশের পিকআপ ভ্যানে লাশ পোড়া অবস্থায় ছিল।
“আমার ছেলের সাথে দুইটি ইউনিভার্সিটি কার্ড ছিল। লাশের সাথে ওই দুইটি কার্ড পাওয়া যায়, যা থেকে ছেলের লাশ শনাক্ত করা হয়। আমি বিশ্বাস করতে না পেরে নিজেই লাশ দেখতে চাই। তখন আমাকে লাশ দেখায়। আমরা সবাই মিলে লাশ দেখি।”
খলিলুর রহমান এ সময় ট্রাইব্যুনালে কান্না করেন।
তিনি বলেন, “আমার ছেলের বুকের পাশ দিয়ে একটি কাটা দাগ ছিল। আমরা ওই দাগ ও কার্ড দেখে আমার ছেলেকে শনাক্ত করি।”
লাশ নিয়ে তারা গাইবান্ধার সাঘাটার গ্রামের বাড়িতে যান। সেখানে ৭ তারিখ সকালে লাশ দাফন করেন।
তিনি বলেন, ২৫/২৬ দিন পরে তারা মোবাইলে ও বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে কয়েকটি ভিডিও দেখেন। ভিডিওতে তার ছেলেকে কীভাবে মারা হয়, তা দেখতে পান। যেখানে তার ছেলেকে মারা হয় সেখানে পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। পরে তাদের কিছু নাম জানতে পারেন।
এদের মধ্যে ওসি সায়েদ, ওসি মাসুদ, ওসি নির্মল, ডিবি আরাফাত, কামরুল, আফজাল হোসেন, কাফি, শাহিদুল, সাইফুল এমপি, রনি ভূইয়া এর নাম ছিল বলে তিনি ট্রাইব্যুনালকে বলেন।
তার আগে সোমবার প্রথম দিন সাক্ষ্য দিয়েছিলেন খলিল। সে দিন আস সাবুরের বড় ভাই রিজওয়ানুল ইসলামও সাক্ষ্য দেন।
গত বছরের ৫ অগাস্ট ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান।
সেদিন আশুলিয়ায় পুলিশ পেট্রোলের আগুনে ছয় তরুণের লাশ পোড়ায়। ওই ঘটনায় একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করা হয়।
গেল ২ জুলাই এ মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেয় প্রসিকিউশন। আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সঙ্গে অন্যান্য তথ্যসূত্র হিসেবে ৩১৩ পৃষ্ঠা, সাক্ষী ৬২, দালিলিক প্রমাণাদি ১৬৮ পৃষ্ঠা ও দুটি পেনড্রাইভ যুক্ত করা হয়।
গেল ২১ অগাস্ট এ মামলায় ১৬ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় এই ট্রাইব্যুনাল।
এ মামলায় গ্রেপ্তার আট আসামি হলেন- ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, ঢাকা জেলা পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম, পরিদর্শক আরাফাত হোসেন, এসআই মালেক, এসআই আরাফাত উদ্দিন, এএসআই কামরুল হাসান, আবজাল ও কনস্টেবল মুকুল।
পলাতক সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামসহ আটজনের পক্ষে রাষ্ট্রের খরচে দুজন আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।