Published : 28 May 2026, 12:11 AM
কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ী পানির পাম্প পর্যন্ত রাস্তার অব্যবহৃত জায়গায় বসেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অনুমোদিত অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাট। এই হাটের পশুকে খাওয়ানোর জন্য ঘাস কেটে আনা হচ্ছে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল থেকে।
ল্যান্ডফিলের ভেতরে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন প্রজাতির ঘাসের চাষ করা হচ্ছে। কোরবানির জন্য স্থানীয় যারা পশু কিনেছেন, তারাও তাদের পশুর জন্য এখান থেকে ঘাস কেটে নিচ্ছেন।
১৯৯৫ সালে ৫০ একর এবং ২০০৬ সালে আরও ৫০ একর জমি নিয়ে গড়ে ওঠা মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৫৭টি ওয়ার্ডের বর্জ্য ধারণ করে। প্রতিদিন প্রায় ৩৫০০ টন বর্জ্য ফেলা হয় সেখানে। আর কোরবানির ঈদে তিন দিনেই সেখানে জমা হবে প্রায় ৩৪ হাজার টন বর্জ্য।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মাতুয়াইল স্যানিটারি ল্যান্ডফিল ঘিরেই তৈরি হয়েছে ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি। ল্যান্ডফিলের বিষাক্ত বর্জ্যের ওপর জন্মানো ঘাস খাচ্ছে কোরবানির পশু, আর সেখানে উৎপাদিত শাকসবজি চলে যাচ্ছে রাজধানীর বাজারগুলোতে।

পশুচারণের জায়গা, বর্জ্যের ওপর সবজি চাষ
ল্যান্ডফিলে অবাধে চরানো হয় গরু-ছাগল। স্থানীয় তরুণ সাজ্জাদ হোসেনের ভাষ্য, কাক, কুকুর আর গরু-ছাগল একই জায়গায় খাবার খোঁজে। দূর থেকে দেখলে বোঝাই যায় না এটা আসলে বর্জ্যের স্তূপ।
কবির মিয়া নামের এক ব্যক্তি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "এখানে ছাগল চড়িয়ে প্রায় বিনা পয়সায় পালতে পারি। আলাদা তেমন কোনো খাবার খাওয়াতে হয় না।"
এ বছর তিনি ১৩টি ছাগল কোরবানির হাটে তুলবেন।
মো. রফিক নামের এক স্থানীয় বাসিন্দার ভাষ্য, ঢাকার বড় খামারিরাও এখান থেকে ঘাস কেটে নিয়ে যান পশুকে খাওয়ানোর জন্য। এই মাঠে আগে ময়লার স্তূপ ছিল, এখন ওপরে ঘাস গজানোয় নিচে কী আছে তা মানুষ বুঝতে পারে না।
স্থানীয় এক প্রৌঢ় বললেন, "ভালোমন্দ তো আমি বুঝি না, বাবা। তবে এরকম দূষিত জায়গার ঘাস খাওয়ালে পশুর ক্ষতি তো হওয়ারই কথা। গরু হয়তো এই বাজার থেকে কিনব না শেষ পর্যন্ত।"
শুধু পশুখাদ্যই নয়, ল্যান্ডফিলের কয়েক একর জায়গাজুড়ে চাষ হচ্ছে লালশাক, পুঁইশাক, পাটশাক, কলমি শাক, লাউ, কুমড়ো, সরিষাসহ বিভিন্ন শাকসবজি; যা বাজার হয়ে চলে যাচ্ছে রাজধানীবাসীর রান্নাঘরে।
স্থানীয়রা জানান, এসব শাক-সবজি মূলত যায় যাত্রাবাড়ীর সবজির আড়তে। এছাড়া রাজধানীর অন্যান্য বাজারেও যায় অল্পবিস্তর।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকরিজীবী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, "খামারিদের পশুখাদ্যসহ বিভিন্ন শাকসবজির চাষাবাদ এখানে নতুন কিছু নয়। ঢাকাতো এমনিতেই ভেজালের শহর। এখন শাকসবজি নিয়েও মনে ভয় কাজ করে। তাহলে আমরা কী খেয়ে বাঁচব?"
সাহেদ নামের এক তরুণ বললেন, "এখানে কী হচ্ছে না হচ্ছে প্রশাসনের লোকেরা সবাই সব জানে। সবারই স্বার্থ আছে এখানে।"
ডিএসসিসির কিছু কর্মকর্তাকে ‘উৎকোচ’ দিয়ে এখানে অবৈধভাবে চাষাবাদ চলছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন। তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বরাবরের মতই তা অস্বীকার করেছে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মো. আজিম মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের বর্জ্য নিঃসৃত তরল বা লিচেট পরীক্ষা করে দেখেছেন। তার সেই গবেষণাপত্র ২০১১ সালে 'জার্নাল অব বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস'-এ প্রকাশিত হয়।
তার গবেষণায় ল্যান্ডফিলে তৈরি হওয়া লিচেটের নমুনায় টিডিএস (৭৩৪ পিপিএম), সিওডি (১৬৩১ পিপিএম), অ্যামোনিয়াম-নাইট্রোজেন (১২৫৩ পিপিএম), বাইকার্বনেট (২৭,৯৬২ পিপিএম) এবং নিকেল (১.০৫ পিপিএম) ও ক্রোমিয়ামের (০.৭৪ পিপিএম) মত কিছু ভারী ধাতুর উচ্চমাত্রার উপস্থিতি পাওয়া যায়। গবেষণায় বলা হয়, এসব উপাদান ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠের পানি দূষণের উচ্চ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সেন্টার ফর অ্যাটমোস্ফেরিক পলিউশন স্টাডিজের (সিএপিএস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বছরের পর বছর জমে থাকা বর্জ্য থেকে লেড, নিকেল, মার্কারির মত ভারী ধাতু মাটি ও পানিতে মিশছে। এসব দূষিত জমিতে উৎপাদিত ফসল ও ঘাস মানবদেহে 'বায়ো-অ্যাকুমুলেশন'-এর মাধ্যমে বিষাক্ত উপাদান জমা করতে পারে।”
ঢাকায় পরিচালিত গবেষণায় প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি শিশুর রক্তে ডব্লিউএইচও নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি সীসা পাওয়ার তথ্য তুলে ধরে এ গবেষক বলেন, অতীতে সীসা-দূষিত ঘাস খাওয়ার কারণে প্রাণী মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
বর্জ্যের মধ্যে থাকা ভারী ধাতু খাদ্যচক্রে প্রবেশ করলে দীর্ঘমেয়াদে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন।

অনানুষ্ঠানিক জীবিকা, মাদক ও দূষণের অভয়ারণ্য
মাতুয়াইলের এই ল্যান্ডফিলকে ঘিরে নানাধরনের জীবিকার উপায় তৈরি হয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, নানা বয়সের নারী-পুরুষ ময়লা থেকে বেছে হাড়, লোহা, প্লাস্টিকসহ নানারকম বর্জ্য আলাদা করে ব্যাগভর্তি করছেন।
এমনই একজন জাহেরা বানু; বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, "এইখান থেউকা হাড্ডি টুকাইয়া মেলামাইন কোম্পানিতে বেচি। বহুবছর ধইরা করতাছি এই কাম।"
কোন কোম্পানিতে এসব হাড় বিক্রি করেন, কত টাকায় বিক্রি করেন জানতে চাইলে এড়িয়ে যান তিনি।
কানু মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে দেখা যায় গভীর মনোযোগ দিয়ে বর্জ্যের মধ্যে কী যেন খুঁজছেন। কাছে এগিয়ে গেলে তিনি স্মিত হেসে বলেন, “আমরা তো গরিব মানুষ। এখান থেইকা প্লাস্টিক টুকাইয়া লইয়া গিয়া বেচি। কপাল ভালো থাকলে মাইঝেমধ্যে সোনা-রূপার গয়নাও পাওয়া যায়।”

ল্যান্ডফিলে বর্জ্য পোড়ানো নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। স্থানীয়রা দাবি করেন, এ ল্যান্ডফিল থেকে বর্জ্য পোড়া ধোঁয়া ডেমরা, কোনাপাড়া, যাত্রাবাড়ী, জুরাইনসহ আরও দূরদূরান্তে পৌঁছে যায়।
আব্দুল মজিদ নামের আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বছরের পর বছর থাকতে থাকতে গন্ধে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। গন্ধে এখন আর সমস্যা হয় না। কিন্তু ময়লা পোড়া ধোঁয়ায় মাঝেমাঝে দমবন্ধ হওয়ার অবস্থা হয়। স্থানীয় অনেকেই নানারকম শ্বাসপ্রশ্বাস সংক্রান্ত জটিলতায়ও ভুগছে।”
এদিকে ময়লার এ ভাগাড় হয়ে উঠেছে মাদকের স্বর্গরাজ্য। গত সোমবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বর্জ্যের স্তূপের আড়ালে বা অস্থায়ী ঝুপড়িতে দিনদুপুরে চলছে মাদক সেবন।
জাহিদুল আলম নামে স্থানীয় এক যুবক বললেন, "দুর্গন্ধ, কাদা আর বিষাক্ত বর্জ্যের মাঝেও ওখানে মাদকের আলাদা এক অন্ধকার বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।"

সিটি করপোরেশন কী বলছে
ল্যান্ডফিল এলাকায় শাকসবজি চাষের বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিষয়টি ক্ষতিকর হতে পারে এবং এ নিয়ে খোঁজ নেওয়া হবে। ওই মাটিতে দূষণের ঝুঁকি তো আছেই। প্রয়োজনে কৃষিবিদ বা মৃত্তিকা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি দেখা হবে।”
তিনি বলেন, “ল্যান্ডফিলের কিছু অংশে নতুন প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তিন থেকে চার একর জমি নিয়ে একটি পাইলট প্রজেক্টের কাজ চলছে। তাতে ধীরে ধীরে এসব ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাবে।”
মাতুয়াইলের ল্যান্ডফিলের শাকসবজি রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের যে অভিযোগ, সে বিষয়ে জহিরুল ইসলাম বেরেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে বড় পরিসরে বাজারজাতকরণের চিত্র দেখেননি, তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
ল্যান্ডফিল এলাকায় মাদকসেবীদের আড্ডার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এখানে যে পরিমাণ নিরাপত্তা থাকা দরকার, সেটার ঘাটতি আছে। জায়গাটা নিরিবিলি হওয়ায় দিনের বেলায় এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানাকে জানানো হবে।”
কোরবানির পশুর জন্য ওই এলাকার ঘাস কেটে নেওয়া ও গরু-ছাগল চরানোর বিষয়েও খোঁজ নেওয়ার কথা বলেন ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।

বর্জ্য নিয়ে কোরবানির পর যত পরিকল্পনা
গত সোমবার সকালে ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম ঘোষণা দেন, ঈদুল আজহার দিন দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে কলাবাগান এটিএস থেকে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে বর্জ্য পরিবহন শুরু হবে। তিন দিনে মোট ৩৩,৯৪২ টন বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দিনে ১৫,৯৩৫ টন, দ্বিতীয় দিনে ১১,৭৭৬ টন এবং তৃতীয় দিনে ৬,২৩১ টন বর্জ্য সংগ্রহ করা হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর/যান্ত্রিক) ও মাতুয়াইল এক্সটেনশন প্রকল্পের পরিচালক ড. মোহাম্মদ সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভুঁইয়া বলেন, কোরবানির বর্জ্য অপসারণকে সামনে রেখে প্রতিবছরের মত এবারও মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
“কোরবানিকে সামনে রেখে এবার মোট তিনটি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হবে। প্রস্তুতির কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।”
মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলকে আধুনিক 'ঢাকা রিসোর্স সার্কুলেশন পার্ক' (ডিআরসিপি) হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ১২ মার্চ উপস্থাপিত মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, এখান থেকে মিথেন গ্যাস সংগ্রহ করে বছরে ৮১,০০০ মেগাওয়াট এবং সৌরশক্তির মাধ্যমে ২৮,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের যেসব অংশ এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে না, সেগুলো ভবিষ্যৎ প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করে রাখা হয়েছে। তবে সীমানা প্রাচীর ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ঘাটতির কারণে স্থানীয়রা কিংবা অন্য কেউ এসব জায়গা ব্যবহার করে থাকতে পারেন।
মাতুয়াইলে বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প নিয়ে ড. সফিউল্লাহ বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার একটি কোম্পানির কাছে সম্প্রতি প্রকল্প এলাকার জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোরবানির পরপরই তারা উন্নয়ন কাজ শুরু করবে। জুন মাসের দিকে মাটি কাটা ও অন্যান্য নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
তার ভাষ্য, প্ল্যান্ট নির্মাণে আনুমানিক আড়াই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে। এরপর প্রকল্পটি উৎপাদন ও পরিচালনা পর্যায়ে যাবে।
তবে ল্যান্ডফিল এলাকায় বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সিএপিএস এর অধ্যাপক কামরুজ্জমান মজুমদার।
তিনি বলেন, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এসব প্রকল্প চালু হলে বায়ুদূষণ আরও বাড়তে পারে।
“ঢাকা ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম বায়ুদূষিত শহর, সেখানে সামান্য দূষণও জনস্বাস্থ্যের ওপর বড় চাপ তৈরি করবে। আমরা বিষয়টি নিয়ে ফিল্ড পর্যায়ের আরও তথ্য সংগ্রহ করছি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমরা আলোচনা চালিয়ে যাব।”