২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

ফেইসবুকে ‘তান্ত্রিক’: রাসায়নিকের ক্ষতকে ‘জ্বিনের প্রভাব’ বলে প্রতারণা

“পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট হাতে ধরে রাখলে কোনোভাবেই বদ জিন আসবে না বা কারও মনের আশা পূরণ হবে না। এগুলো মানুষের বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণার একটি অভিনব কৌশল।”

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 27 Jul 2026, 03:17 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:44 PM

স্বামীর সঙ্গে টানাপড়েন দূর করার আশায় ফেইসবুকে ‘রহমত আলী কবিরাজ’ নামে একটি আইডির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এক নারী।

ওপাশ থেকে বলা হয়, ‘জ্বিনের সাহায্যে’ তার সংসারের সমস্যা দূর করে দেওয়া হবে। প্রথমে ‘হাদিয়া’, পরে ‘জালালি কবুতর’ কেনার কথা বলে কয়েক দফায় টাকা নেওয়া হয়। 

এরপর ইমু ভিডিও কলে বাজার থেকে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও রসাল মিষ্টি কিনে আনতে বলা হয়। 

নির্দেশনা মেনে দুটি বস্তু হাতের তালুতে রাখতেই শুরু হয় তীব্র জ্বালাপোড়া। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার হাত দগ্ধ হয়ে যায়।

এর পরও শেষ হয়নি প্রতারণা। ক্ষত সারিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে নেওয়া হয় আরও টাকা। সব মিলিয়ে ওই নারীর কাছ থেকে ২১ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।

এই ঘটনায় রাজধানীর খিলক্ষেত থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী নারী। সেই মামলার তদন্তে নেমে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বলছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; তান্ত্রিক পরিচয়ে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র দীর্ঘদিন ধরে এ কৌশলে মানুষকে প্রতারণা করে আসছে। 

তদন্তের ভিত্তিতে গত ২৪ জুলাই কুমিল্লার চান্দিনা থেকে অহিদ মিয়া ওরফে কুয়েত (২৪) ও মাহে আলম (২৭) এবং নোয়াখালীর সুধারাম থেকে হাসান আলীকে (২০) গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও একাধিক সিম জব্দ করা হয়েছে। 

এ বিষয়ে জানাতে সোমবার দুপুরে ঢাকার কল্যাণপুরে পিবিআইয়ের স্পেশিয়ালাইজড ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশনস কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন সংস্থার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শিবলী নোমান। 

তদন্ত তদারকি এ কর্মকর্তা বলেন, “মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, কুসংস্কার ও পারিবারিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিতভাবে এই প্রতারণা চালানো হতো। ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে আমরা পুরো প্রতারণার কৌশল শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছি।”

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই নাজমুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট, মোবাইল ফোনের তথ্য ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করে চক্রটির সদস্যদের শনাক্ত করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা প্রতারণার বিষয়টি স্বীকার করেন। পরে অহিদ মিয়া ও হাসান আলী আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

প্রতারণা চলে যেভাবে

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চক্রটি ‘রহমত আলী কবিরাজ’, ‘হোসেন কবিরাজ’, ‘আসমা কবিরাজ’, ‘তান্ত্রিক কবিরাজ’ নামে একাধিক ফেইসবুক আইডি ও ইমু অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করত। বিশেষ করে পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য সমস্যা কিংবা প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে উদ্বিগ্ন নারীদের নিশানা করা হতো। 

প্রথমে আধ্যাত্মিক শক্তি, জ্বীন বা তন্ত্র-মন্ত্রের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হতো। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন অজুহাতে টাকা নেওয়া শুরু করত চক্রটি। একপর্যায়ে ভুক্তভোগীদের পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও রসাল মিষ্টি—হাতে বা নাভিতে রেখে নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করতে বলা হতো। এতে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় শরীরে ক্ষত তৈরি হলে সেটিকে ‘জ্বিনের প্রভাব’ বলে ভয় দেখিয়ে আরও টাকা আদায় করত চক্রটি। 

হাত পোড়ে কীভাবে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ইকবাল রউফ মামুন বলছেন, ভুক্তভোগীদের শরীরে তৈরি হওয়া ক্ষতের পেছনে কোনো অলৌকিক শক্তি নয়, কাজ করে রাসায়নিক বিক্রিয়া।  

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ। এটি চিনি বা রসাল মিষ্টির সঙ্গে মিশিয়ে হাতের তালুতে মুষ্টিবদ্ধ করে কিছুক্ষণ রাখলে জারণ বিক্রিয়া ঘটে। ওই বিক্রিয়ায় প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয় এবং পদার্থটি অম্লীয় (অ্যাসিডিক) বৈশিষ্ট্য ধারণ করে।

এই তাপ ও রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণেই ত্বক পুড়ে যায় জানিয়ে ড. মামুন বলেন, “সহজ করে বললে, এই বিক্রিয়ায় উৎপন্ন পদার্থ অ্যাসিডের মতো আচরণ করে। অ্যাসিড মানুষের শরীরে লাগলে যেমন চামড়া পুড়ে যায়, এখানেও একই ধরনের ক্ষত সৃষ্টি হয়।”

‘বদ জিন’ বা অলৌকিক কোনো শক্তির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এতটুকু নিশ্চিত করে বলা যায়, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট হাতে ধরে রাখলে কোনোভাবেই বদ জিন আসবে না বা কারও মনের আশা পূরণ হবে না। এগুলো মানুষের বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণার একটি অভিনব কৌশল।”

দেশে বসে ভারতে প্রতারণা

পিবিআইর তদন্তে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে বসেই ভারতীয় নাগরিকদেরও একইভাবে নিশানা করত চক্রটি। 

তদন্তকারী কর্মকর্তা নাজমুল হক বলেন, ভারতীয় মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে ফেইসবুক পেজ পরিচালনা করা হতো। বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের নামে গুগল পের মাধ্যমে অর্থ নেওয়া হতো। পরে হুন্ডির মাধ্যমে সেই অর্থ বাংলাদেশে আনা হতো।

“তদন্তে আরও জানা যায়, ফেইসবুকের এসব ভুয়া পেজে নিয়মিত অর্থ খরচ করে বিজ্ঞাপন বা বুস্টিং করা হতো, যাতে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে নতুন ভুক্তভোগী তৈরি করা যায়।”

অন্তত ২০০ জনের একই ধরনের ক্ষত

তদন্তের সময় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে পিবিআই জানতে পারে, গত কয়েক মাসে একই ধরনের রাসায়নিক ক্ষত নিয়ে অন্তত ২০০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, এসব ঘটনার সঙ্গে এই প্রতারণা চক্রের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এ ধরনের পোড়া ক্ষত নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসাদের বেশির ভাগই তরুণী।

এ ধরনের রোগীর সংখ্যা দুইশ কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “ভুয়া তান্ত্রিকের ফাঁদে পড়ে ঠিক কতজন জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিয়েছেন, সেটি নিশ্চিত করে বলতে পারব না। তবে সংখ্যাটি কমবেশি এমনই হবে।”

একই বিষয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম খোঁজ নিয়ে জেনেছে, ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটেও গত প্রায় এক বছর ধরে নিয়মিত এ ধরনের রাসায়নিক দগ্ধ রোগী আসছেন। সপ্তাহে একাধিক রোগী এলেও এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান সংরক্ষণ করা হয় না।

বার্ন ইউনিটের একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ ধরনের পোড়া ক্ষত নিয়ে যারা আসেন, তাদের বেশির ভাগই নারী। রোগীদের প্রায় সবাই জানান, স্বামী-স্ত্রী বা প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্কের টানাপড়েন মেটানোর আশায় কথিত তান্ত্রিক বা কবিরাজের পরামর্শ অনুসরণ করেই তারা এই বিপদে পড়েছেন।”

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শিবলী নোমান বলেন, “মামলার সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। 

“একইসঙ্গে চক্রটির আর্থিক লেনদেন, অনলাইন কার্যক্রম এবং সম্ভাব্য অন্যান্য ভুক্তভোগীর বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।”