Published : 09 Apr 2026, 06:54 PM
বিএনপি কর্মী মকবুল হোসেন হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ও রিমান্ড শুনানিতে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক শেখ মামুন খালেদ বলেছেন, তার ৪৪ বছরের চাকরি জীবনের ‘কালো অধ্যায়’ ডিজিএফআইয়ে এক বছর ৮ মাস দায়িত্ব পালনের সময়টি।
বৃহস্পতিবার ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদের আদালতে তিনি এ কথা বলেন।
অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল শেখ মামুনকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ আসার পাশাপাশি তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে।
গেল ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা মহানগর পুলিশ-ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একটি টিম রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে শেখ মামুনকে গ্রেপ্তার করে।
পরদিন দেলোয়ার হত্যা মামলায় তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। এরপর গেল ৩১ মার্চ ছয় দিন এবং ৬ এপ্রিল আরও তিন দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয় তাকে।
তিন দফায় ১৪ দিনের রিমান্ড শেষে বৃহস্পতিবার শেখ মামুনকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির এসআই কফিল উদ্দিন। অন্যদিকে জামিনের আবেদন করেন তার আইনজীবীরা।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রিপন হোসেনের আদালতে প্রথমে দেলোয়ার হত্যা মামলায় তার জামিন শুনানি হয়। জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয় আদালত।
অন্যদিকে, মকবুল হত্যার ঘটনায় পল্টন মডেল থানায় করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো ও সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে বুধবার আবেদন করেছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির মতিঝিল জোনাল টিমের এসআই তোফাজ্জল হোসেন। যা শুনানির জন্য রাখা হয় বৃহস্পতিবার।
ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালতে মকবুল হত্যা মামলায় শেখ মামুনকে গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়ে শুনানি হয়।
রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন গ্রেপ্তার দেখানোর পক্ষে শুনানি করেন। অন্যদিকে এর বিরোধিতা করে ডিজিএফআইয়ের সাবেক এই মহাপরিচালকের পক্ষে শুনানি করেন তার আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীন।
শুনানির সময় আদালতের অনুমতি নিয়ে কথা বলেন শেখ মামুন।
তিনি বলেন, “অবসরের পর কানাডিয়ান একটা ইউনির্ভাসিটিতে শিক্ষকতা করেছি। বিইউপির ভাইস-চ্যান্সেলর ছিলাম। কখনো পলিটিক্স করিনি। রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করিনি। একাডেমিক লাইফে ছিলাম ২২ বছর। আমার তিনটা পিএইচডি, পাঁচটা মাস্টার্স।”
পরে আদালত তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেয়।
এরপর মকবুল হত্যা মামলায় শেখ মামুনর রিমান্ড শুনানি নেন বিচারক আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদ।
রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। তিনি বলেন, “তিনি ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান ছিলেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনার সহযোগী ছিলেন। মামলার তদন্তে তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তার সাত দিনের রিমান্ড প্রার্থনা করছি।”
আসামিপক্ষে মোরশেদ হোসেন শাহীন রিমান্ড বাতিল করে জামিনের প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, মিরপুর থানার এক মামলায় (দেলোয়ার হত্যা) আসামি তিন দফায় ১৪ দিন রিমান্ডে ছিলেন।
এই মামলায় জামিন চেয়েছেন তুলে ধরে এই আইনজীবী বলেন, “পরে জানতে পারলাম এ মামলায় (মকবুল হত্যা) গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেছে। আসামি সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। ২০২০ সালে অবসর যান। মামলার ঘটনা ২০২২ সালের। অবসরে যাওয়ার পর তিনি কি কোনো নির্দেশ দিতে পারেন। তিনি অসুস্থ। প্রয়োজনে তাকে জেলগেইটে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক।”
জবাবে ওমর ফারুক বলেন, “২০১১ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি ডিজিএফআইয়ের প্রধান হিসেবে ছিলেন। ওই সময় ডিজিএফআইয়ের সর্বোচ্চ রাজনীতিকরণ করা হয়। যারা হাসিনাকে সমর্থন করেনি, শত শত সেনা অফিসারকে ফোর্স করে বের করে দেওয়া হয়। আর যারা হাসিনার পায়ে পড়ে থাকতেন, ফ্যাসিস্ট হতে সহযোগিতা করে অবসরের পরও বিভিন্ন জায়গায় তাদের পদায়ন করা হয়। হাসিনা যেন ক্ষমতা থেকে পড়ে না যান, এজন্য সহযোগিতা করেন আসামি।”
এরপর আদালতের অনুমতি নিয়ে কথা বলেন শেখ মামুন। তিনি বলেন, “৪৪ বছর চাকরি করেছি। এরমধ্যে এক বছর ৮ মাস ডিজিএফআইয়ের প্রধান ছিলাম। ওই সময়টা আমার জন্য কালো অধ্যায়।”
তিনি বলেন, “ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে আড়াই বছর চাকরি করেছি। কানাডিয়ান একটা ইউনির্ভাসিটিতে শিক্ষকতা করেছি। বিইউপিতে ভাইস-চ্যান্সেলর হিসেবে ছিলাম। আমার তিনটা পিএইচডি, পাঁচটা মাস্টার্স। অনুকম্পা চাই।”
মামলার বিবরণীতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ১০ ডিসেম্বর একদফা দাবি আদায়ের কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি। এর আগে ৭ ডিসেম্বর ডিবির হারুন অর রশীদ, মেহেদী হাসান ও বিপ্লব কুমার বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয়ে অভিযান চালান। ভাঙচুর চালানো হয় বিএনপি কার্যালয়ে। কার্যালয়ের পাশে নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে মকবুল হোসেন নামে এক কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এই ঘটনায় মাহফুজুর রহমান নামে এক ব্যক্তি বাদী হয়ে শেখ হাসিনাসহ ২৫৬ জনের বিরুদ্ধে পল্টন মডেল থানায় মামলা করেন।
এএসআইয়ের ধমক
মকবুল হত্যা মামলায় রিমান্ড শুনানি শুরুর আগে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মেয়েদের সাথে কথা বলতে চাইলে আদালতে দায়িত্বরত পুলিশের একজন এএসআই শেখ মামুনকে ধমক দেন।
এতে বিস্মিত হন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল শেখ মামুন, তাকিয়ে থাকেন সেই পুলিশ সদস্যের দিকে।
তখন এজলাসে ছিলেন না বিচারক আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদ।
দেলোয়ার হত্যা মামলায় রিমান্ড শেষে এদিন শেখ মামুনকে হাজির করা হবে জেনে তার দুই মেয়ে আদালতে আসেন।
এর আগে মকবুল হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন শুনানির জন্য অন্য আদালতে নিয়ে গেলে সেখানে আদালতের অনুমতি নিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মেয়েদের সাথে কথা বলেন শেখ মামুন।
মেয়েরা পরে আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদের আদালতেও যান। তবে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা তাদের এজলাস থেকে বের করে দেন। পরে কোনো এক বিষয়ে মেয়েদের সাথে কথা বলতে কাঠগড়ার সামনে থেকে পেছনে আসেন শেখ মামুন। এসময় তাকে ধমক দেন এএসআই মোশারফ হোসেন।
ধমকের বিষয়ে জানতে চাইলে এএসআই মোশারফ বলেন, “দেখেন না, উনি শুধু কথা বলে। এত কথা বলা যায়? কোর্টের অনুমতি নিয়ে কথা বলা যায় না? এ কারণে তাকে কথা বলতে নিষেধ করেছি।”
বাবার সাথে কি বিষয়ে কথা হয়েছে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শেখ মামুনের বড় মেয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তার স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর নিয়েছি। তিনি বলেছেন, ভালো আছেন।”