Published : 12 Apr 2026, 10:01 PM
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চুক্তিতে লন্ডনে বাংলাদেশ হাই কমিশনে প্রেস মিনিস্টারের দায়িত্ব পাওয়া সাংবাদিক আকবর হোসেন সেই দায়িত্ব ছাড়ার যে কারণ দেখিয়েছিলেন, তার একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন।
বিএনপির নতুন সরকার গঠনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া অনেককে সরিয়ে দেওয়ার মধ্যে লন্ডনের ওই পদ থেকে পদত্যাগের কথা শুক্রবার জানান আকবর হোসেন।
ওইদিন এক ফেইসবুক পোস্টে পদত্যাগের তথ্য দিয়ে তিনি লেখেন, “লন্ডনে বাংলাদেশ হাই কমিশনের প্রেস মিনিস্টার পদ থেকে আমি পদত্যাগ করেছি। একান্ত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণে সেখানে দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়টির সাথে অন্য কোনো কিছুর সম্পর্ক নেই।”
চব্বিশের অগাস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আসা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ওই বছরের ২৪ নভেম্বর লন্ডনে মিশনে চুক্তিতে নিয়োগ পান বিবিসি বাংলার ঢাকা ব্যুরোর সাংবাদিক আকবর হোসেন।
দুই বছরের চুক্তিতে ওই নিয়োগ পেলেও ১৬ মাসের মাথায় পদত্যাগ করার তথ্য দিলেন তিনি। ফেইসবুকে পদত্যাগের ঘোষণার দেওয়ার পর আলোচনার মধ্যে এক ভিডিওবার্তায় তিনি এর ব্যাখ্যা দিলেন।
এর আগে নতুন সরকারের এক মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই গত ৭ মার্চ আকস্মিকভাবে লন্ডনে বাংলাদেশের হাই কমিশনার আবিদা ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়।
ভিডিওবার্তায় আকবর হোসেন বলেন, “অনেকে এটার সঙ্গে অনেক রাজনীতিক বিষয় জড়াতে চাচ্ছেন যে, আমাকে সরকার থেকে বলা হয়েছে কিনা রিজাইন করার জন্য। না, আমাকে কোনো কিছুই বলা হয় নাই। এবং আমি যে এখানে কন্টিনিউ করতে চাই না বা থাকব না, এই বিষয়টা আমি মৌখিকভাবে জানিয়ে ছিলাম, যাদেরকে জানানোর দরকার।
“এবং আমার কাছে মনে হয় যে সাংবাদিকতায় ফিরে আসাটাই হচ্ছে আমার আসল জায়গা, ওইটাই আমার জায়গা। আমি যা করি না কেন, ভালো করি, মন্দ করি, লোকে প্রশংসা করুক, নিন্দা করুক, সাংবাদিকতায় থেকে কাজ করে সে প্রশংসা এবং নিন্দা নেওয়াটাই হচ্ছে আমার কাজ এবং সেখানেই আমি কমফোর্টেবল।”
ভিডিওবার্তা দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে আকবর হোসেন বলেন, “গত বেশ কয়েকদিন ধরে অনেক ফোন কল পাচ্ছি, অনেক টেক্সট এসএমএস। এবং প্রশ্ন একটাই যে আমি কেন লন্ডনে বাংলাদেশ হাই কমিশনের যে প্রেস মিনিস্টারের পোস্ট, এখান থেকে রিজাইন করলাম।
“এটা অনেককে আমি ব্যক্তিগতভাবে এক্সপ্লেইন করেছি, কিন্তু আসলে সবাইকেতো আর জনে জনে বলা সম্ভব না। অনেকেই ভাবছেন যে, এটা আমি বেশ আকস্মিক একটা সিদ্ধান্ত নিলাম, হুট করে এরকম একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। ব্যাপারটা কিন্তু ওরকম না।”
তিনি বলেন, “আমি গত বেশ কয়েক মাস ধরেই ভাবছিলাম যে, আমি এখানে হয়ত আর কাজ করব না। কেন করব না, সেটা হচ্ছে একটা বড় প্রশ্ন। আপনারা হয়ত অনেকে জানেন যে, আমি প্রায় ২২ বছর সাংবাদিকতা করেছি।
“কিন্তু আমি যখন লন্ডনে পৌঁছালাম, লন্ডনে পৌঁছে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমি বুঝে গেলাম, যে এখানে প্রেস মিনিস্টারের যে কাজ, এটা আসলে আমি করতে পারব না; বা এই কাজটা আমার জন্য না।”
নিজের এই ভাবনার ব্যাখ্যা দিয়ে আকবর হোসেন বলেন, “প্রশ্ন হচ্ছে, কেন আমার জন্য না? আমার জন্য না এই কারণে, গত এক বছর ধরে আমি এখানে অনেক চেষ্টা করলাম, দেখলাম যে, এখানে কোনো প্রোডাক্টিভ কাজ সেই অর্থে নেই। সে অর্থে নেই–এর মানে হচ্ছে, ধরুন আমরা যারা সাংবাদিকতা করি, আমরা সবসময় নিউজ চেজ করি, স্টোরি চেজ করি, সারাক্ষণ একটা ব্যস্ততার মধ্যে থাকি।
“আমরা যে কাজগুলো করি, এটাকে মেজার করা যায় দিনশেষে, যে কী করলাম, সেটার ইম্প্যাক্টটা কী হল? কিন্তু প্রেস মিনিস্টারের যে কাজ, এই কাজের কোনো ইমপ্যাক্ট মেজার করার সেরকম কোনো কিছু আমি দেখি নাই। এবং আমি একটা পর্যায়ে এসে দেখলাম, যে এখানে আমার দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ কোনো কাজ নেই।”
সরকারি কার্যপদ্ধতির কারণে ব্যক্তিগতভাবে তেমন কাজ করার সুযোগ না থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আপনারা জানেন যে, সরকারি যে কাজ, এটাতো একটা সিস্টেমের মধ্যে চলে, সেই সিস্টেম ভালো কি মন্দ, সেটা অন্য হিসেব।
“কিন্তু সেটাকে ব্রেক করে আপনি অনেক কিছু করতে পারবেন না। কিছু হয়ত করতে পারবেন, কিন্তু খুব বেশি কিছু করার সুযোগ এখানে নেই।
এভাবে কাজ না থাকার কারণে ‘অলমোস্ট ডিপ্রেশনে’ চলে যাওয়ার মত দশা হওয়ার কথা তুলে ধরে আকবর হোসেন বলেন, “যে আমি একসময় ১০ ঘণ্টা ১২ ঘণ্টা কাজ করতাম প্রতিনিয়ত, হঠাৎ করে আমি এসে দেখলাম যে প্রতিদিন আমি দুই ঘণ্টাও কাজ করছি না।
“কোনো কোনো দিন আমি এক ঘণ্টোও কাজ করছি না। একটা সময় আমার যেটা মনে হচ্ছিল যে, আমার যে ব্রেইন এটা মনে হয় ননফাংশনাল হয়ে যাচ্ছে। আমি ক্রিয়েটিভলি কোনো কিছু চিন্তা করতে পারছি না।”
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “আরেকটা বড় রিজনতো, সেটা আমি নিজেই ব্যাখ্যা করেছি যে, আমার পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত কারণে এখানে আমার থাকতে হবে, ঢাকায়।”
পেশাদার সাংবাদিকদের জন্য এই কাজ উপযোগী না হওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এখন আমার কাছে যেটা মনে হয় যে, এই প্রেস মিনিস্টার রোলটা বাইরে থেকে দেখে এটা অনেক কিছু মনে হয়। এটা একটা গালভরা পদবী, শুনতে অনেক ভালো লাগে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এখানে কাজটা কী?
“যারা অ্যাক্টিভ জার্নালিস্ট, যারা সত্যিকার অর্থে সাংবাদিকতার মাঠে থাকে বা সাংবাদিকতা করে, ইম্প্যাক্টফুল জার্নালিজম করে, তাদের জন্য এই পোস্টে এখানে কাজ করাটা সুইটেবল না।”
বাইরে থেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ না দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ‘মিডিয়া ট্রেইনিং কোর্স’ দিয়েই প্রেস মিনিস্টারের কাজ চালানো সম্ভব বলে মনে করছেন আকবর হোসেন।
তিনি বলেন, “আমার যে এক্সপেরিয়েন্স, সেটা আমি দেখলাম যে, ফরেন মিনিস্ট্রিতে যারা কাজ করেন, তাদেরকে একটা মিডিয়া ট্রেনিং কোর্স যদি অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তারা যখন প্রথমে কাজ করেন এবং টাইম টু টাইম যদি তাদের ট্রেনিং মডিউলটাকে আপডেট করা হয়, এই কাজটা তারাই করতে পারেন।
“ইট ইজ ভেরি সিম্পল। এখনকার দিনে আপনারা জানেন যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের যে উত্থান এবং অন্যান্য বিষয়গুলো, এটার জন্য আসলে আমাদের আগের সিস্টেমে আর কাজ করলে চলবে না। সো গভার্নমেন্ট সিস্টেমতো এখনও সে পুরনোতে রয়ে গেছে। কিন্তু এটাকে অনেক বেশি রিফর্ম করতে হবে। তো সব মিলিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে যে, এই জায়গাটা আমার না।”
পুরনো খবর-
দিল্লি ও লন্ডনে নতুন প্রেস মিনিস্টার