Published : 25 Jun 2026, 06:03 PM
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ‘বিক্রি করে’ কারো কারো জীবনযাত্রা বদলে গেছে বলে সংসদে মন্তব্য করেছেন মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান।
ময়মনসিংহ-১০ আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত এ সংসদ সদস্য বলেছেন, “আমরা জুলাই যুদ্ধ করেছি। আমি নিজেও করেছি। আমাদের এখানে যারা আছেন, অনেকেই জুলাই যুদ্ধ করেছেন, আমাদের সন্তানেরা করেছেন।
“কিন্তু অনেকেই জুলাই চেতনা বিক্রি করেন মাননীয় স্পিকার, আমরা জুলাই চেতনা বিক্রি করি না। আমরা জুলাইকে ধারণ করি।”
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে বাজেট আলোচনা হয়।
আখতারুজ্জামান বলেন, “জুলাই তো বিক্রি করার বিষয় না। যারা জুলাই চেতনা বিক্রি করেন, তাদের প্রতি একটি অনুরোধ জানাব, অনেকেই রিকশায় চড়তেন, এখন প্রাডো গাড়িতে চড়েন, আর জুলাই চেতনা বিক্রি করেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমি অনুরোধ করব, উনারা আগে কিসে চড়তেন এখন কিসে চড়েন? কোন বাসায় থাকেন উনারা, মাঝে মধ্যে লাইভ করেন, লাইভ করলে এই জাতি দেখত, উনারা আগে কোথায় ছিলেন, এখন পরিবর্তনটা কী রকম হয়েছে?”
বাজেটের প্রশংসা করে আখতারুজ্জামান বলেন, “বাজেট পেশের আগে মানুষ উৎকণ্ঠায় থাকত কোন জিনিসের দাম বাড়বে। এবার অর্থমন্ত্রী একের পর এক পণ্যের শুল্ক ও ভ্যাট কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
“নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি দ্রব্যের দাম কমানো হয়েছে। দাম বেড়েছে দুটি জিনিসের— সিগারেট ও মদ।”
বিরোধীদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “উনারা বলেন, চানাচুর মার্কা বাজেট। আমরা শুনেছি, চানাচুর বাচ্চারা খায়। আবার বড়রাও খায়, কখন? অন্য কিছু খাওয়ার পরে নাকি চানাচুর খায়। সেজন্য মন খারাপ কি না আমি জানি না।”
‘আওয়ামী লীগের ৫০ বছর ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ’
বাজেট আলোচনায় ময়মনসিংহ-৭ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, “আওয়ামী লীগ তিনটা প্রজন্মকে ‘ইনজুরড’ করেছে। একটা হচ্ছে স্কুল, আরেকটা কলেজ, আরেকটা ইউনিভার্সিটি। এটা হলো নিরাপদ সড়ক, কোটা আন্দোলন; পরে হাসিনা খেদাও আন্দোলন।”
তিনি বলেন, “এই তিনটা জেনারেশন আগামী ৫০ বছর জীবিত থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের বোধহয় ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।”
বাজেটকে ‘অসাধারণ’ আখ্যা দিয়ে মাহবুবুর রহমান শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রশংসা করেন। হার্টের স্টেন্ট, কিডনি ডায়ালাইসিসের রিএজেন্টসহ স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট খরচ কমানোর উদ্যোগ সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর কর নিয়ে আপত্তি জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ড পরিচালিত অলাভজনক প্রতিষ্ঠান; তাই এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ওপর কর থাকা উচিত নয়।
‘বড় ঋণখেলাপিদের ছাড়, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর কর’
ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল বাতেন বলেন, “বড় বড় ঋণখেলাপিদের ছাড় দিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর করের বোঝা চাপানো হলে তা কতটা সুফল দেবে, তা প্রশ্নের বিষয়।
“ভ্যাটের প্রভাব ধনী ও দরিদ্রের ওপর সমানভাবে পড়ে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষ।”
আব্দুল বাতেন মনে করেন, এই বাজেটে মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য খুব একটা ‘ভালো খবর’ নেই।
পটুয়াখালী-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, “বাজেটের সাফল্য আসলে এখানে টেবিল চাপড়ানোর উপর নির্ভর করে না। বাজেটের সাফল্য নির্ভর করে আমাদের মাঠ পর্যায়ের যারা আছেন, বাজারবাসী আছেন, সেখানকার লোকদের মুখের হাসিতে।”
বাজেট উপস্থাপনার ধরন নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। তার ভাষ্য, আধুনিক বিশ্বে বাজেট উপস্থাপনায় ইনফোগ্রাফিক, ভিজ্যুয়াল ড্যাশবোর্ড, তুলনামূলক চার্ট, সহজ টেবিল ও নাগরিক সংস্করণ থাকে।
“কিন্তু বাংলাদেশে বাজেট প্রণয়নে নাগরিক তো দূরের কথা, সংসদ সদস্যদেরও ভূমিকা রাখার সুযোগ কম।”
আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ‘নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্যজনক’। কিন্তু সে ঘটনায় হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।
“তাহলে ৩০০ শিশু হামে মারা গেল, আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগের চিন্তা করেছেন কি না?”
ক্যান্সার চিকিৎসায় ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল দাবি
চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ক্যান্সার রোগের আগাম শনাক্তকরণে উপজেলা পর্যায়ে স্ক্রিনিং মেশিন দেওয়ার দাবি জানান।
তিনি বলেন, দেশে বছরে দেড় লাখ থেকে দুই লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন; অধিকাংশ রোগী দেরিতে শনাক্ত হন।
“পরিবারগুলোকে পাঁচ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিজের পকেট থেকে খরচ করতে হয়।”
তার প্রস্তাব, ক্যান্সার রোগের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হোক এবং প্রতিটি উপজেলায় আগাম শনাক্তকরণের মেশিন বাধ্যতামূলক করা হোক।
ভোলা-২ আসনের সংসদ সদস্য হাফিজ ইব্রাহিম বলেন, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততায় ভোলার বহু পরিবার বসতভিটা ও জীবিকার উৎস হারাচ্ছে।
তার নির্বাচনী এলাকার অন্তত ১০টি ইউনিয়ন নদীভাঙনের সরাসরি ঝুঁকিতে আছে জানিয়ে তিনি উপকূলীয় ও চরাঞ্চলের জন্য পৃথক উন্নয়ন তহবিল গঠনের দাবি জানান।
তিনি জাতীয় এগ্রি-ভোল্টাইক বা এগ্রি-সোলার নীতি প্রণয়নের প্রস্তাব করেন। একই জমিতে কৃষি উৎপাদন ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানো সম্ভব বলে মত দেন তিনি।
কুটির শিল্প, পাট ও বৈকালিক স্কুলের প্রস্তাব
ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফ কুটির শিল্পকে সংগঠিতভাবে বাজারজাত করার জন্য কুটির শিল্প বাণিজ্য মেলার প্রস্তাব দেন।
জামদানি, মণিপুরি শাড়ি, টাঙ্গাইলের তাঁত, নকশিকাঁথাসহ দেশীয় কুটির শিল্পকে একই ছাতার নিচে আনার কথা বলেন তিনি।
ফরিদপুরে পাট উৎপাদনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কাঁচা পাট রপ্তানি না করে দেশে ‘ফিনিশড প্রোডাক্ট’ তৈরি করে রপ্তানি করলে কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আয় বাড়বে।
বয়স্কদের জন্য বৈকালিক স্কুল চালুর প্রস্তাবও দেন তিনি। তার ভাষ্য, গ্রামের যে জনগোষ্ঠী শিক্ষার আলো পায়নি, তাদের নিরক্ষরতা দূর করতে এ উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।”