Published : 06 Oct 2025, 01:22 AM
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের যে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সেগুলোর বিষয়ে দুদফায় তথ্য-উপাত্ত চাওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ে সেগুলো মেলেনি।
সবশেষ দফায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে পাঠানো দুদকের চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান ১৯ জন কর্মকর্তা এবং রিজার্ভ চুরির ঘটনা খতিয়ে দেখার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই বিদেশি পরামর্শকের বিষয়েও তথ্য চাওয়া হয়।
দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, আতিউর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগের অনুসন্ধান এবং রিজার্ভ চুরি সংশ্লিষ্ট নতুন আরেকটি অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের অংশ হিসেবে গত ৯ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দুদক ওই চিঠি দিয়েছিল। এতে ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তথ্য সরবরাহের অনুরোধ করা হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত দুদক সব তথ্য পায়নি।
রোববার দুদকের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দ্বিতীয় দফায় ওই চিঠি পাঠানোর তথ্য দিলেও এটির অগ্রগতির বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি।
কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কিছু তথ্য পাওয়া গেলেও গুরুত্বপূর্ণ অনেক নথি এখনও সরবরাহ করা হয়নি।”
নাম প্রকাশ না করে আরেকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “এর আগেও এসব তথ্য-উপাত্ত চেয়ে গভর্নরের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সব তথ্য সরবরাহ না করার কারণে নতুন করে আবারও তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। এবার তথ্য চাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।”
‘ক্ষমতার অপব্যবহার’, ‘বিভিন্ন অনিয়ম’ এবং ‘অন্যদের জন্য ঋণ জালিয়াতির সুযোগ সৃষ্টি’সহ একগুচ্ছ অভিযোগে সাবেক গভর্নর আতিউরের বিরুদ্ধে গত জুনে তদন্ত শুরু করে দুদক।
কর্মকর্তারা বলেন, এর সঙ্গে রিজার্ভ চুরি সংক্রান্ত নতুন একটি অভিযোগ যুক্ত করে অনুসন্ধানের কাজ করছে তিন সদস্যর অনুসন্ধান দল।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দুই মেয়াদে সাত বছর বাংলাদেশের গভর্নরের দায়িত্বে থাকা আতিউর রহমানের বিরুদ্ধে গত ১৫ বছরে ব্যাংক খাতকে ধ্বংস করার অভিযোগে অনুসন্ধানেরি সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। এ জন্য গত জুনে প্রথম দফায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিভিন্ন তথ্য চেয়েছিল সংস্থাটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, দুদক থেকে যেসব তথ্য চাওয়া হয় সবসময় সেগুলো সরবরাহ করা হয়। তবে কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে সময় লাগে।
“এজন্য আমরা দুদকের কাছে অন্তর্বর্তীকালীন উত্তর দিয়ে সময়ের জন্য অনুরোধ করি। আমরা একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আর তারা অন্য একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। আমাদের মধ্যে সহযোগিতা না করার কথা নয়, অবশ্যই সহযোগিতা করা হয়।“
বিষয়টি আসলে ‘অসহযোগিতার’ কারণে নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, বরং যদি বিলম্ব ঘটে, তখন সময় চাওয়া হয়, যা স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য।
উদাহরণ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, “দুদক যদি আমাদের দুই মাস সময় দেয়, আমরা কখনো তিন মাসের অনুরোধ করতে পারি।
“কিন্তু কখনও কখনও দুদক মনে করতে পারে যে সময়ের জন্য অনুরোধ বেশি করা হয়েছে। তখন তারা পাল্টা চিঠিতে বলবে যে, দুই মাসের মধ্যে ১৫ দিনের মধ্যে তথ্য সরবরাহ করতে হবে। এটি স্বাভাবিক বিষয়। একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আরেকটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা করবে, বিশেষত দুর্নীতি দমনের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে। আমরা অবশ্যই দুদকের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করি এবং এটি আমাদের দায়িত্বেরই অংশ।”
২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জালিয়াতি করে সুইফট কোডের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। স্থানান্তরিত এসব টাকা ফিলিপিন্সে পাঠানো হয়েছিল।
পরে ওই বছরের ১৫ মার্চ রাজধানীর মতিঝিল থানায় মামলা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা। তবে অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনের ওই মামলায় সরাসরি কাউকে আসামি করা হয়নি।
মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডি। কিন্তু দফায় দফায় সময় নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পারেনি সংস্থাটি। এ নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধান শুরুর তথ্য দিয়েছে দুদক।
অপরদিকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে গভর্নরের দায়িত্ব পাওয়া আতিউরের বিরুদ্ধেসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’, বিভিন্ন ‘অনিয়ম’, ঋণ খেলাপিদের ছাড় দিয়ে নীতিমালা জারি, রিজার্ভ চুরি, হলমার্ক জালিয়াতি, এস আলম গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি এবং বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতির সুযোগ দিয়ে গত ১৫ বছরে ব্যাংক খাতকে ধ্বংস করার অভিযোগ আনা হয়। এ জন্য অনুসন্ধান করতে তিন সদস্যের দলও গঠন করা হয়।
এ অনুসন্ধানের জন্য তথ্য-উপাত্ত ও নথি চেয়ে ৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে দুদকের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, অনুসন্ধানের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও রেকর্ডপত্র দ্রুত পর্যালোচনার জন্য সরবরাহ করা একান্ত প্রয়োজন।
তিন সদস্যের ওই অনুসন্ধান দলের নেতৃত্বে রয়েছেন দুদকের উপপরিচালক মো. মোমিনুল ইসলাম। সদস্য হিসেবে আছেন উপপরিচালক রণজিৎ কুমার কর্মকার ও উপসহকারী পরিচালক মো. ইয়াছিন মোল্লা।
যেসব তথ্য-নথি চায় দুদক
গভর্নরের কাছে পাঠানো চিঠিতে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যেকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও রেকর্ডপত্র সরবরাহের জন্য অনুরোধ করা হয়। চিঠিতে মোট ১৬টি বিষয় সংক্রান্ত নথি চাওয়া হয়েছে।
২০০৯-২৪ সালের মধ্যে খেলাপি ঋণ নিয়মিতকরণের জন্য জারি করা সব নীতিমালার সত্যায়িত ফটোকপি এবং এসব নীতিমালা প্রণয়ন ও জারির নথিপত্রের সত্যায়িত অনুলিপি চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক পরিদর্শন সংক্রান্ত জারি করা নীতিমালার সত্যায়িত ফটোকপি এবং নীতিমালা প্রণয়ন ও জারির নোটশিটসহ সম্পূর্ণ নথির অনুলিপিও চাওয়া হয়েছে।
চিঠিতে হলমার্ক ঋণ জালিয়াতি, এস আলম গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি, অ্যাননটেক্স গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি, বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি এবং বেসিক ব্যাংক জালিয়াতি সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন এবং এসব বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপের বিস্তারিত তথ্য এবং নোটশিট ও পরিপত্র চাওয়া হয়।
গভর্নর আতিউরের মেয়াদে অনুমোদন পাওয়া নয়টি ব্যাংকের অনুমোদন সংক্রান্ত নথি ও তথ্য, যার মধ্যে রয়েছে নোটশিট, অনুমোদন নথি, পরিপত্র ও প্রজ্ঞাপন, চাওয়া হয়েছে।
রিজার্ভ চুরি সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য, অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও সিআইডি প্রদত্ত তদন্ত প্রতিবেদনসহ সত্যায়িত কপি এবং সবশেষ হালনাগাদ তথ্যও চাওয়া হয়।
এছাড়া সাবেক গভর্নর ফজলে কবিরের সময়কালে জারিকরা সব ঋণ নীতিমালার সত্যায়িত কপি এবং খেলাপি ঋণমুক্ত থাকার পদ্ধতি চালু করার নীতিমালার সত্যায়িত কপিও অনুরোধ করা হয়েছে।
এরপর দায়িত্বে থাকা সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সময়কালে রিজার্ভ থেকে ব্যবসায়ীদের ডলার সরবরাহ সংক্রান্ত নোটশিট ও নথি এবং এ বিষয়ে যদি কোনো অভ্যন্তরীণ তদন্ত হয়ে থাকে সেগুলোর প্রতিবেদনের সত্যায়িত কপিও চাওয়া হয়।
একগুচ্ছ অভিযোগে সাবেক গভর্নর আতিউরের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে দুদক
সাবেক ৩ গভর্নর ও ৪ ডেপুটি গভর্নরসহ ৯ জনের ব্যাংক হিসাব তলব
এছাড়া সাবেক ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু কুমার (এস. কে.) সুরের কার্যকালে অনুমোদিত ব্যাংকগুলোর অনুমোদন সংক্রান্ত নথি ও তথ্য, যার মধ্যে নোটশিট, নথিপত্র, পরিপত্র ও প্রজ্ঞাপন চাওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস. এম. মনিরুজ্জামানের কার্যকালে ব্যাংক পরিদর্শন সংক্রান্ত নোটশিট, নথি, পরিপত্র ও প্রজ্ঞাপনের কপিও চাওয়া হয়।
এছাড়া বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত সেন্ট্রাল ব্যাংক স্ট্রেংদেনিং প্রজেক্ট (সিবিএসপি) সংক্রান্ত সম্পূর্ণ তথ্যের ফটোকপি এবং রিজার্ভ চুরি সংক্রান্ত তানভীর দোহা, সাইবার সিকিউরিটি উপদেষ্টার অনুসন্ধান প্রতিবেদনের কপিও চাওয়া হয়।
যে ১৯ কর্মকর্তার তথ্য চাওয়া হয়
একই সঙ্গে দুদকের চিঠিতে তিন গভর্নর ও পাঁচ ডেপুটি গভর্নরসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান ১৯ জন কর্মকর্তা এবং রিজার্ভ চুরির ঘটনা খতিয়ে দেখার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই বিদেশি পরামর্শকের বিষয়েও তথ্য চাওয়া হয়।
তাদের মধ্যে আছেন সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান, ফজলে কবির ও আব্দুর রউফ তালুকদার; সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস. কে. সুর চৌধুরী, এস. এম. মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান, আবু ফরাহ মো. নাছের ও আহমেদ জামাল; সাবেক বিএফআইইউ প্রধান মাসুদ বিশ্বাস ও কাজী সায়েদুর রহমান; নির্বাহী পরিচালক দেবদুলাল রায়, মেজবাউল হক ও শুভঙ্কর সাহা; পরিচালক তফাজ্জল হুসাইন; অতিরিক্ত পরিচালক মসিউজ্জামান খান ও মাসুম বিল্লাহ; আইসিটি বিভাগের কর্মকর্তা রাহাত উদ্দিন; এবং ভারতীয় নাগরিক নীলা ভান্নান ও রাকেশ আস্তানা, যারা রিজার্ভ চুরির পরে এ বিষয় খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশ ব্যাংকে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন।
তাদের সবার কার্যকাল, দায়িত্ব, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, এবং এনআইডি, পাসপোর্ট ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের সত্যায়িত ফটোকপি বাংলাদেশ ব্যাংককে সরবরাহ করতে বলা হয়।