Published : 11 Jul 2025, 01:14 AM
’ক্ষমতার অপব্যবহার’ ও বিভিন্ন ‘অনিয়মের’ পাশাপাশি অন্যদের জন্য ’ঋণ জালিয়াতির সুযোগ’ তৈরিসহ একগুচ্ছ অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দুই মেয়াদে সাত বছর গভর্নরের দায়িত্বে থাকা আতিউরের বিরুদ্ধে বিগত ১৫ বছরে ব্যাংক খাতকে ধ্বংস করার অভিযোগও খতিয়ে দেখবে সংস্থাটি।
বৃহস্পতিবার দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এ অনুসন্ধান শুরুর বিষয়ে তথ্য দেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে পারেননি।
তবে সংস্থার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, সাবেক গভর্নর আতিউরের বিরুদ্ধে বিগত দেড় দশকে ব্যাংক খাতকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ঋণ খেলাপিদের ছাড় দিয়ে নীতিমালা জারি, রিজার্ভ চুরি, হলমার্ক জালিয়াতি, এস আলম গ্রুপের ঋণ জালিয়াতিসহ বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতির সুযোগ দেওয়া।
দুদক এসব অভিযোগ অনুসন্ধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে আগের দুই সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার ও ফজলে কবির, সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস. কে. সুর চৌধুরী, এস. এম. মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান ও আবু ফারাহ মো. নাসের, বিএফআইইউ’র সাবেক প্রধান মাসুদ বিশ্বাস ও কাজী সায়েদুর রহমানের দায়িত্ব পালনের সময়কার বিভিন্ন তথ্য চেয়ে পাঠিয়েছে।
পট পরিবর্তনের পর সাবেক গভর্নর আতিউরের বিরুদ্ধে গত ২০ ফেব্রুয়ারি দুদক জনতা ব্যাংকে অ্যাননটেক্সের ঋণ জালিয়াতি করে ২৯৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করে। এতে ওই সময় জনতা ব্যাকের চেয়ারম্যান আবুল বারকাতকেও আসামি করা হয়।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পাঁচ মাসের মাথায় ১ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের দশম গভর্নর হিসাবে চার বছরের জন্য দায়িত্ব পান আতিউর রহমান।
এরপর তাকে আরও এক মেয়াদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ দায়িত্বে রাখে। ২০১৬ সালের ২ অগাস্ট তার দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সমালোচনার মধ্যে সে বছরের মার্চে তাকে পদত্যাগ করতে হয়।
দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সাবেক গভর্নর আতিউরের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ অনুসন্ধানে
কমিশনের উপপরিচালক মো. মোহিনুল ইসলামকে দলনেতা করে তিন সদস্যের একটি দল গঠন করা হয়েছে।
অন্য দুজন হলেন- উপপরিচালক রনজিৎ কুমার কর্মকার ও উপসহকারী পরিচালক মো. ইয়াছিন মোল্লা।
দুদকের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেন, অনুসন্ধানের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে দুদক যেসব তথ্য চেয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- ২০০৯ সালের পূর্বের খেলাপি ঋণ নিয়মিতকরণ সংক্রান্ত নীতিমালার সত্যায়িত ফটোকপি। ২০০৯ সালের পর থেকে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার জন্য জারি করা নীতিমালা।
আরও যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছে, সেগুলো হল
>> ২০০৯ সালের পর খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার নতুন নীতিমালা জারি হওয়ার পর থেকে এ নীতিমালার সুবিধাপ্রাওয়া বেক্সিমকো গ্রুপ, রতনপুর গ্রুপ, কেয়া গ্রুপ, যমুনা গ্রুপ, থার্মেক্স গ্রুপ, শিকদার গ্রুপ, বিবিএস গ্রুপ, আব্দুল মোনেম গ্রুপ, অ্যাননটেক্স গ্রুপসহ যেসব গ্রুপ বা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি ওই সুবিধা পেয়েছেন এবং নামে-বেনামে যেসব ঋণ গ্রহণ করেছেন তাদের ঋণ যেসব ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠারে পাঠানো হয়েছে সেগুলো ও শাখার নাম।
>> একই সঙ্গে গ্রহণ করা ঋণের হিসাবের নাম, স্বত্বাধিকারীর নাম, প্রতিষ্ঠান এবং স্বত্বাধিকারীর বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানাসহ গ্রহণ করা ঋণের পরিমাণ, ঋণের বর্তমান অবস্থার তথ্য।
>> ২০০৯ থেকে ২৪ সাল পর্যন্ত খেলাপি ঋণের তালিকা।
>> ২০০৯ সালের পর জারি করা ব্যাংক পরিদর্শন সংক্রান্ত নীতিমালার সত্যায়িত ফটোকপি এবং ওই নীতিমালা প্রণয়ন ও জারির নোটশিটসহ নথিপত্রের সত্যায়িত কপি। হলমার্ক ঋণ জালিয়াতি সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন এবং এবিষয়ে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলোর নোটশিটসহ নথি ও পরিপত্র।
>> বেসিক ব্যাংক জালিয়াতি সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন এবং এ সংক্রান্ত পদক্ষেপের নোটশিট ও পরিপত্র।
>> আতিউরের সময় অনুমোদন পাওয়া নয় ব্যাংক (মেঘনা, মিডল্যান্ড, মধুমতি, এনআরবি, এনআরবি কমার্শিয়াল, এনআরবি গ্লোবাল, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার, ইউনিয়ন এবং ফার্মাস ব্যাংক) অনুমোদন সংক্রান্ত নোটশিটের কপি এবং পরিপত্র বা প্রজ্ঞাপন সংক্রান্ত তথ্য।
>> সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের পত্রের প্রেক্ষিতে ঋণ পুনর্গঠন সংক্রান্ত নীতিমালা (২০১৫) প্রণয়নের নোটশিটসহ নথি ও পরিপত্র। রিজার্ভ চুরি সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য এবং অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনের সত্যায়িত কপি ও সর্বশেষ তথ্য।
>> ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেনা বা মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নোটশিটসহ পরিপত্রের সত্যায়িত কপি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো অভ্যন্তরীণ তদন্ত হয়ে থাকলে সেটির প্রতিবেদনের সত্যায়িত কপি।
>> সাবেক গভর্নর ফজলে কবিরের মেয়াদকালে জারিকরা সব ঋণ নীতিমালার সত্যায়িত কপি। সুদের হার ৯ শতাংশ সম্পর্কিত সার্কুলার বা নীতিমালার সত্যায়িত কপি। খেলাপি ঋণমুক্ত থাকার পদ্ধতি চালু করার নীতিমালার সত্যায়িত কপি।
>> সাবেক এ গভর্নরের সময়কালে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ সংক্রান্ত তথ্য বা নীতিমালার সত্যায়িত কপি।
>> তার পরে দায়িত্বে আসা সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের কার্যকালে ব্যাংক বা আর্থিক খাতে বেনামি ও জালিয়াতি করা ঋণের বিভিন্ন তথ্য। এ সময়ে রিজার্ভ থেকে ব্যবসায়ীদের ডলার প্রদান সংক্রান্ত নোটশিটসহ নথি এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো অভ্যন্তরীণ তদন্ত হয়ে থাকলে সেই প্রতিবেদনের সত্যায়িত কপি।
>> সাবেক ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু কুমার (এস.কে.) সুর এর মেয়াদকালে অনুমোদিত ব্যাংকগুলোর (এনআরবিসি, ইউনিয়ন, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স, মিডল্যান্ড, মেঘনা ও এনআরবি ব্যাংক) সংক্রান্ত নোটশিট, নথি এবং পরিপত্র বা প্রজ্ঞাপন সংক্রান্ত তথ্য।
>> সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস. এম. মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান এর কার্যকালে ব্যাংক পরিদর্শন সংক্রান্ত নোটশিটসহ নথি এবং পরিপত্র বা প্রজ্ঞাপন সংক্রান্ত তথ্য।
>> বিএফআইইউ’র সাবেক প্রধান কাজী সায়েদুর রহমানের এর কার্যকালে ডলার বাজার বিশৃঙ্খলা সংক্রান্ত তথ্য।
>> কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবু ফারাহ মো. নাসের এর মেয়াদকালে জারি করা ঋণ নীতিমালা সংক্রান্ত নোটশিটসহ নথি এবং পরিপত্র, প্রজ্ঞাপন সংক্রান্ত তথ্য।
জনতা ব্যাংকের ২৯৭ কোটি টাকা 'আত্মসাৎ': আতিউর ও বারাকাতও আসামি