Published : 28 Jun 2026, 06:28 PM
নিমতলী ট্র্যাজেডির ১৬ বছর পরও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাসায়নিক গুদাম, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও দুর্বল নগর ব্যবস্থাপনার কারণে একই ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন পরিবেশবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা।
তাদের ভাষ্য, নিমতলী, চুড়িহাট্টা, বনানীর এফআর টাওয়ার, সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপো কিংবা বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ড বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একই ধরনের নীতিগত ব্যর্থতা, দুর্বল তদারকি ও আইন প্রয়োগে শৈথিল্যের ধারাবাহিক প্রতিফলন।
রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) আয়োজিত ‘নিমতলী ট্রাজেডি: অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড থামবে কবে?’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলা হয়।
২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে ঘটা এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ‘নিমতলী ট্র্যাজেডি’ নামে পরিচিত। একটি ভবনের নিচতলার রাসায়নিক গুদাম থেকে এ আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং ১২৪ জন মানুষের মৃত্যু হয়।
বাপা সভাপতি অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদারের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবিরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আব্দুস সালাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক ছালেহ উদ্দিন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাপার যুগ্ম সম্পাদক ড. আহমেদ কামরুজ্জমান মজুমদার।
ডিএসসিসি পরিচালক আব্দুস সালাম বলেন, “আর্থিক লাভের আশায় অনেকেই আবাসিক এলাকায় কেমিক্যাল গুদামের জন্য ভবন ভাড়া দেন, যার পরিণতিতে নিমতলী বা চুড়িহাট্টার মত মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।”
এ জন্য স্থানীয় জনগণকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি ‘বিল্ডিং কোড’ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন তিনি।
ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, “ঢাকার নদীতীরে কেমিক্যাল ব্যবসা বিস্তারের কারণে বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীসহ বিভিন্ন নদীর দূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সঠিক নীতিমালার অভাবে বিদ্যমান পরিবেশ আইনও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। ঢাকাকে রক্ষা করতে সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের পাশাপাশি জনগণের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে।”
ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক ছালেহ উদ্দিন বলেন, “ভবন নির্মাণে অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করা হয় না। পাঁচ তলার অনুমোদন নিয়ে ১০ তলা নির্মাণের ঘটনাও ঘটে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। পুরান ঢাকায় অভিযানে গিয়ে অনেক সময় খাটের নিচেও কেমিক্যাল মজুত দেখতে পাই। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা ছাড়া এ সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়।”
মূল প্রবন্ধে ড. আহমেদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, “নিমতলী ট্র্যাজেডিকে শুধু একটি অগ্নিকাণ্ড নয়, বরং বাংলাদেশের রাসায়নিক নিরাপত্তা ও নগর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে মূল্যায়ন করা উচিত।”
আলোচনায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স পরিবেশবান্ধব ও জনবান্ধব নগর উন্নয়নের স্বার্থে ‘সিটি গভর্নমেন্ট’ ব্যবস্থা চালুর দাবি তোলেন। তিনি বলেন, “পরিবেশ ও জনবান্ধবতার কথা চিন্তা করে ঢাকাকে আর বাড়ানো উচিত হবে না। সিটি গভর্নমেন্টের আয়তায় ঢাকাকে আনতে হবে। পরিবেশ ও জনবান্ধব উন্নয়নশীল ঢাকা গড়তে সঠিক এবং পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া দরকার।”
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন স্থপতি ইকবাল হাবিব, ফায়ার সার্ভিসের সাবেক পরিচালক শাকিল নেওয়াজ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি হাজী মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম।
সেমিনার থেকে ভবিষ্যতে নিমতলীর মত দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ১১ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে- আবাসিক এলাকা থেকে সব রাসায়নিক গুদাম ও ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পকারখানা অপসারণ, জাতীয় রাসায়নিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রণয়ন, ফায়ার সার্ভিসের আধুনিকায়ন, বিল্ডিং কোড ও অগ্নিনিরাপত্তা আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন।
ডিজিটাল লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের জাতীয় ডেটাবেজ তৈরি, বাধ্যতামূলক ফিটনেস সার্টিফিকেট, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত জবাবদিহি, নিরাপদ নগরায়ণে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদি জাতীয় নগর অগ্নি ও রাসায়নিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন।