Published : 30 Aug 2025, 11:10 PM
শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক জমায়েত, গোষ্ঠী ও ভিন্নমতের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের’ অভিযোগ তুলে সভা-সমাবেশ-মিছিল নিয়ন্ত্রণে তাদের গণতান্ত্রিক পথ অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন দেশের শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার অঙ্গনের ৪০ নাগরিক।
বুয়েট শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক কর্মসূচি ও গণঅধিকার পরিষদ নেতাদের কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাঠিপেটার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তারা বলেছেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জনবান্ধব করে গড়ে তোলার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।”
শনিবার তাদের এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মানবিক ও গণতান্ত্রিক আচরণ জনগণের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা হলেও ‘বাস্তবে পরিস্থিতি উলটো’।
“একদিকে জনগণের জানমাল, ধর্মীয় স্থাপনা, বিনোদনের জায়গা, জাতীয় সম্পদ, পাবলিক প্লেসের নিরাপত্তায় দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবহেলা করার অভিযোগ রয়েছে। আবার অন্যদিকে নিরস্ত্র শিক্ষার্থী রাজনৈতিক জমায়েত, গোষ্ঠী, ভিন্নমতের লোকদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করতে দেখা যাচ্ছে তাদের। মব নিয়ন্ত্রণেও তারা ব্যর্থ, যা বেদনাদায়ক।
“আমরা মনে করি, জুলাই অভ্যুত্থানে জনগণের ত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সভা-সমাবেশ-মিছিল নিয়ন্ত্রণে গণতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন করবে। মানবাধিকার নীতির প্রতি অনুগত থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে বিরত থাকবে এবং জনগণের ব্যক্তিগত, ধর্মীয় সম্পদ ও প্রতিষ্ঠান রক্ষায় সজাগ থাকবে। পাশাপাশি অবশ্যই জাতীয় ও প্রাকৃতিক সম্পদের নিরাপত্তায় তাদের সক্রিয় থাকতে হবে।”
কথাসাহিত্যিক সালাহ উদ্দিন শুভ্র বিবৃতিটি গণমাধ্যমে পাঠিয়েছেন।
বিবৃতি দাতাদের মধ্যে রয়েছেন, কবি কাজল শাহনেওয়াজ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রায়হান রাইন, লেখক ও নৃবিজ্ঞানী সায়েমা খাতুন, অর্থনীতিবিদ জিয়া হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জি এইচ হাবীব, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আ আল মামুন, লেখক ও সংগঠক নাহিদ হাসান, নির্মাতা আশফাক নিপুন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সৌভিক রেজা, মানবাধিকারকর্মী রেজাউর রহমান লেনিন, লেখক ও সম্পাদক রাখাল রাহা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক আর রাজী।
বিবৃতিতে বলা হয়, “প্রতিপক্ষ বা বিরোধীদের দমনের পদ্ধতি ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের আমলের কথা মনে করিয়ে দেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সভা-মিছিলে অন্যায্য হামলা, আওয়ামী আমলের বিতর্কিত মামলায় বিভিন্ন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের অভিযোগ রয়েছে।
“কখনো দেখা গেছে মব তৈরি করে ভিন্নমতের লোকজনকে পেটানো হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিগ্রহের শিকার ব্যক্তিদের আটক বা গ্রেপ্তার করছে। মব যারা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির আমাদের সামনে নেই। অনেক প্রাণ ও রক্তের বিনিময়ে জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পাওয়া নতুন বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা শুধু অনাকাঙ্ক্ষিত নয়, জুলাই শহীদদের অবমাননার শামিল।”
বিবৃতিতে বুয়েট শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলে বলা হয়, “কিছু দাবি নিয়ে মিছিল করার সময় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে ওই মিছিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার গ্যাস এবং ‘পিলেট বুলেট’ ছুড়েছে। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। একই ইস্যুতে রাস্তায় নামা ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীদের ওপরও হামলা হয়।
“যদিও বুয়েট শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে সমালোচনা করা হয়। ডিএমপি কমিশনার দুঃখ প্রকাশ করেন। এ ঘটনা তদন্তে কমিটি করার ঘোষণাও দেন তিনি। তবে সরকার ও পুলিশ কর্মকর্তার আশ্বাস দ্রুতই হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।”
বুয়েটের প্রসঙ্গ ছাড়াও শুক্রবার গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে মারধরের প্রসঙ্গও টানা হয়েছে বিবৃতিতে। সেখানে বলা হয়, “নুরের ওপর যৌথ বাহিনী নির্মম হামলা চালিয়ে তাকে রক্তাক্ত করেছে। দলটির অন্যান্য নেতাকর্মীদের নির্মমভাবে পেটানো হয়। তাদের কার্যালয়ে গিয়েও হামলা চালানো হয়।
“জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একজন নেতা ও তার দলের ওপর এ ধরনের হামলায় আমরা শঙ্কিত। প্রধান উপদেষ্টাও এ বিষয়ে অবগত বলে খবর বেরিয়েছে। তিনি দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা সেই অশ্বাসের বাস্তবায়ন দেখতে চাই দ্রুত।”
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্য হামলা, গায়েবি মামলা, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনে ‘যুক্ত ছিল’ অভিযোগ তুলে বিবৃতিতে বলা হয়, "সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী-জনতা মরণপণ লড়াই করে। সেই লড়াইয়ে টিকতে না পেরে শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, এমপি, নেতারা নন; আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্যও পালিয়ে যান।”
লেখক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন, শিক্ষক মোশরেকা অদিতি হক, সংগীতশিল্পী অমল আকাশ, এএইচ চঞ্চল, মারুফ মল্লিক, গবেষক পাভেল পার্থ, কবি চিনু কবির, মাহবুব সুমন, মীর হুযাইফা আল মাহমুদ, ফেরদৌস আরা রুমী, সায়মা আলম, মাহাবুব রাহমান, সাঈদ বারী, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক এহসান মাহমুদ, আবুল কালাম আল আজাদ, গাজী তানজিয়া, কবি মোহাম্মদ রোমেল, অস্ট্রিক আর্যু, মোহাম্মদ আরজু, ইসমাইল হোসেন, তুহিন খান, পলিয়ার ওয়াহিদ, সালাহ উদ্দিন শুভ্র, সাদিক মাহবুব ইসলাম, শাহাদাৎ স্বাধীন, পারভেজ আলম, নকিব মুকশি, হাসান জামিল, অর্বাক আদিত্য, উৎসব মোসাদ্দেক, আরাফাত রহমান, দীপক কুমার রায়, মিসবাহ জামিল, রাহুল বিশ্বাসও বিবৃতি দাতাদের মধ্যে রয়েছেন।