Published : 28 May 2026, 11:45 PM
বছর ঘুরে আবার এসেছে ঈদ, কিন্তু সেই আনন্দ নেই এক বছর আগে এই দিনে রাজধানীর পল্লবীতে খুন হওয়া নাজমুল আহসান পাপ্পুর পরিবারে।
একমাত্র ছেলে ও তার স্ত্রীর করুণ পরিণতি আজও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে পাপ্পুর বাবা আবুল কালাম আজাদকে। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি বলেন, “ছেলে খুন হওয়ার পর তিনটা ঈদ গেছে। কিন্তু ছেলে খুন হওয়ার পর আমাদের আর ঈদ হয়নি।”
পুলিশের প্রতিবেদন অনুসারে, ‘পরকীয়া সম্পর্কের’ জেরে গত বছরের ২৮ মে পল্লবীতে পাপ্পু ও তার স্ত্রী দোলন আক্তার দোলা খুন হন। দোলা নিজের বিয়ের কথা গোপন রেখে সৌদি প্রবাসী গাউস মিয়ার সঙ্গে ‘প্রেমের সম্পর্কে’ জড়িয়ে পড়েছিলেন। পরে দেশে ফিরে দোলা বিবাহিত জানার পর ক্ষিপ্ত হয়ে গাউস মিয়া ওই দম্পতিকে কুপিয়ে হত্যা করেন।
পাপ্পুর বাবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ এ ঘটনায় গাউস মিয়াকে আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা করেন। পুলিশ গাউস মিয়াকে গ্রেপ্তার করলে আদালতে তিনি দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।
মামলাটি তদন্ত করে গত বছরের ৩০ নভেম্বর গাউসকে একমাত্র আসামি করে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই সেলিম হোসেন। মামলাটি বর্তমানে ঢাকার পারিবারিক আপিল আদালত-২ এর বিচারক রুকন উদ্দিনের আদালতে অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে রয়েছে।
সর্বশেষ গত ২৭ এপ্রিল বিষয়টি শুনানির জন্য ছিল। তবে ওইদিন কারা কর্তৃপক্ষ আসামিকে আদালতে হাজির করেনি। এ জন্য বিচারক আগামী ২৪ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের শুনানির পরবর্তী দিন রেখেছেন।
সেদিন আসামিকে আদালতে হাজির করতে ‘প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট’ জারি করা হয়েছে বলে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী জামাল হোসেন।
বরগুনা থেকে পাপ্পুর বাবা আবুল কালাম আজাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মামলার চার্জশিট আদালতে দেওয়া হয়েছে। হত্যাকারীর সঠিক বিচার চাই। ছেলেটা নিজে হত্যার কথা স্বীকার করেছে, বিচারটা যেন দ্রুত হয়।”
ছেলের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “কীভাবে যে একটা বছর চলে গেল বোঝাতে পারব না। একটাই ছেলে ছিল। ঈদ বা যে কোনো উৎসবে বাড়ি মাতিয়ে রাখত। এক বছর হল ও নেই। এমন কোনো দিন নাই ছেলের কথা মনে না পড়ে। চোখ দিয়ে পানি ঝরে। আবার ঈদ এসেছে, কিন্তু আমাদের তো ঈদ নেই। ছেলেটা খুন হওয়ার পর আমাদের আর ঈদ হয়নি।
“আমার ছেলেটা গত বছরের ২৮ মে খুন হয়। আর এ বছর কোরবানির ঈদ হচ্ছে ২৮ মে। মেয়েটা কোরবানি দিতে নিষেধ করেছে। বলেছে, আমার ভাই ওই দিনে মারা গেছে। কোরবানি যেন না দেয়। আমাদের আর ঈদ নেই। ও মারা যাওয়ার পর তিনটা ঈদ গেছে। কিন্তু আমাদের ঈদ হয়নি। ছেলে হত্যার বিচার হলে বাঁচব।"
সেই ঘটনা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে দোলার পরিবারকেও। বরগুনা থেকে দোলার মা শাহনাজ বেগম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ওই ছেলেটা (গাউস) বরগুনার একটা ছেলের কাছে টাকা পায়। কেমনে কেমনে আমার মেয়ের সঙ্গে ফেইসবুকে যোগাযোগ করে। তিন মাস ওদের কথাবার্তা হয়।
“পুলিশ দোলার মোবাইল চেক করে এমন কিছু পায়নি যে খুন করবে। ওই ছেলেকে কেউ শেখায়ে দিছে, না কেউ পাঠায়ছে খুন করতে আল্লাহ জানেন।”
খুনের দিনের স্মৃতি তুলে ধরে শাহনাজ বেগম বলেন, “দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দোলা আমাকে ফোন করল জামাইয়ের মোবাইল থেকে। অনেক কথাবার্তা হয়। দুই দিন ডাক্তার দেখাল, কি না কি বলছে ডাক্তার। ‘রান্না করতে যাব’ বলে ফোন রেখে দিল।

“দুপুর পৌনে ২টার দিকে আবার ফোন এল। তখন ফোনের অপর ওপাশ থেকে বলল, ‘আপনার মেয়ে, মেয়ের জামাইকে খুন করেছি’। প্রথমে বুঝি নাই। পরে বলছি, তুমি কে? ফোন দিছ কেন? পরে ম্যাসেঞ্জারে ওদের লাশের ছবি পাঠাইছে। আমি চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছি।”
কাঁদতে কাঁদতে শাহনাজ বেগম বলেন, “ওই কথা মনে পড়লে নিজেকে স্থির রাখতে পারি না। ওর বিচার চাই। সর্বোচ্চ সাজা চাই।”
আসামি গাউসের বাড়ি গোপালগঞ্জে। তার ভাই শাহিদুর রহমান ফোনে বলেন, “ভাইটাকে ঋণ করে সৌদি পাঠিয়েছিলাম। আকামা না থাকায় তাকে পাঠিয়ে দেয়। আবার দুই বছর পর যেতে পারত। ঢাকায় এসে কনস্ট্রাকশন সাইটে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করত।
“বিদেশে থাকায় অবস্থায় ওই মেয়ের পিছনে ৫/৭ লাখ টাকা নষ্ট করছে। আমরা জানতাম, একটা মেয়ের সঙ্গে ওর সম্পর্ক ছিল। কিন্তু আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়নি। মেয়েটাকে বিয়ে করার কথা ছিল। কিন্তু সে ওকে ধোকা দিছে।”
শাহিদুর বলেন, “ওই ঘটনায় পরিবারে বাজে একটা ইফেক্ট পড়েছে। ওর কাছে জানতে চেয়েছি, ও খুন করছে না দুর্ঘটনা? কিছু বলে না। ও খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, মেয়েটা বিবাহিত। তারপরও ওর সঙ্গে সম্পর্ক করে, টাকা পয়সা নষ্ট করে। যেদিন ঘটনা ঘটে ওইদিনও মেয়েটার কাছে ওর ধারের ৮০ হাজার টাকা আসে।
“ওদের কিছু ছবি ছিল। ছবিগুলো গাউস মেয়েটার স্বামীকে দেখাতে গিয়েছিল এবং বিচার চাইতে যায়। এরপর তো এ ঘটনা। ও পরিষ্কার কিছু বলছেও না। বিষয়টা নিয়ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। পরিবারের অবস্থা খুব খারাপ।”
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, পাপ্পু বরগুনাতে একটি বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। দোলা ঢাকায় উত্তরা ইউনির্ভাসিটিতে আইন বিষয়ে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন। বার কাউন্সিলের পরীক্ষার জন্য ঢাকার ফার্মগেটে কোচিং করতেন তিনি। সে সুবাদে দোলা পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনে একটি বাসায় সাবলেট থাকতেন।
২০২৪ সালের শেষ দিকে ফেইসবুকের মাধ্যমে দোলার সঙ্গে গাউস মিয়ার সম্পর্ক গড়ে উঠে। দোলা তার বিয়ের কথা প্রবাসী গাউসের কাছে গোপন রাখেন।
তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, ২০২৫ সালের জানুয়ারির মাসে গাউস দেশে আসার পরও তাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল। এমনকি স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে তারা বাসাও ভাড়া নিয়েছিলেন দোলার সাবলেট বাসার পাশে।
শেষ পর্যন্ত সেই সম্পর্ক হত্যাকাণ্ডে গড়ায় বলে উপসংহারে পৌঁছেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।