Published : 25 Jul 2025, 10:03 PM
বিমানবন্দরের ‘ফ্লাইং অ্যাপ্রোচ জোন’ থেকে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, মসজিদ, ঈদগাহর মত জনসমাগমের স্থাপনা ধীরে-ধীরে স্থানান্তর করার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)।
তা না হলে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মত মর্মন্তিক ঘটনার ঝুঁকি ‘থেকেই যাবে’ বলে সতর্ক করেছে সংগঠনটি।
‘মাইলস্টোন স্কুলে বিমান দুর্ঘটনা: জননিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের দায় ও করণীয়’ শিরোনামে এক ‘তাৎক্ষণিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে’ এ বিষয়টি তুলে ধরেছে বিপিআই।
শুক্রবার রাজধানীর বাংলামোটরে প্ল্যানার্স টাওয়ারে সংবাদ সম্মেলন করে এ প্রতিবেদনের বিষয়ে তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই বিআইপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ তামজিদুল ইসলাম অনুসন্ধানের কিছু তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, মাইলস্টোন স্থায়ী ক্যাম্পাসের অবস্থান শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের ইনার অ্যাপ্রোচ এলাকায়; যা বিমানবন্দরের কার্যকারিতা, নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধা দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকির জন্য দায়ী (যেমন: অতিরিক্ত শব্দদূষণ, ভারী কার্বন নিঃসরণ)।

বিমানবন্দরের রানওয়ের পর ৫০০ ফুট এলাকায় কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা যায় না। এর পরের ১৩ হাজার ফুট বা প্রায় ৪ কিলোমিটার অঞ্চলকে অ্যাপ্রোচ এরিয়া বলা হয়, যেখান দিয়ে বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণ করে।
তামজিদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবচিক) যাত্রীবাহী বিমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবনের উচ্চতা সংক্রান্ত নিয়ম উল্লেখ করলেও, জমির কার্যকর ব্যবহার বা কী ধরনের স্থাপনা বা প্রতিষ্ঠান ওই এলাকায় থাকা উচিত নয়-সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ দেয় না।
ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেল্পমেন্ট এরিয়া বা ডিএমডিপি ও বিশদ পরকিল্পনা অঞ্চল বা ড্যাপে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশের সংবেদনশীল এলাকাগুলোর জন্য জননিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে জমির ব্যবহার সম্পর্কিত কোনো নীতিমালা বা বিধি-নিষেধ দেয়নি।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক অনুশীলন অনুযায়ী, বিমানবন্দরের রানওয়ের ‘ইনার অ্যাপ্রোচ’ এলাকার জমিতে আবাসিক এলাকা, স্কুল, কমিউনিটি সেন্টার, হাসপাতাল, ও বাণিজ্যিক ভবন—এসব স্থাপনাকে অনুৎসাহিত করা হয়, যা বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোতে লক্ষ্য করা যায় না।
বিআইপির সাধারণ সম্পাদক শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, ১৯৯৫ সালে প্রণীত ডিএমডিপিতে বিমানবন্দরের স্থানগুলোকে প্রাকৃতিক অবস্থায় বা জলাধার হিসেবে সংরক্ষিত রাখার পরামর্শ দেয়। স্যাটেলাইট ইমেজ পর্যালোচনা করেও দেখা যায়, শাহজালালের আশপাশের ওই এলাকা আগে জলাধার ছিল। সময়ের সাথে তা পরিবর্তন হয়ে যায় এবং প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
“এই স্থাপনা নির্মাণে অবশ্যই রাজউকের অনুমোদন লাগে এবং এই দায় রাজউক এড়াতে পারে না। এর পাশাপাশি বেবিচকের অনাপত্তিপত্র ছাড়া রাজউক এই অনুমোদন দিতে পারে না বা দেয় না। অথচ বিমানবন্দরের রানওয়ে টেক অফ এবং ল্যান্ডিংয়ের অ্যাপ্রোচ জোনে সরাসরি মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ অবস্থিত, যা বেবিচক এবং রাজউকের সমন্বয়হীনতার প্রকাশ।”
তার ভাষ্য, “বেবচিকের পক্ষ থেকে এই ধরনের অনাপত্তিপত্র দেওয়ার আগে অবশ্যই পরিকল্পনাগত বিশ্লেষণ করেই অনুমতি দেওয়া উচিত।”

সোমবার দুপুরে বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসের একটি ভবনে বিধ্বস্ত হয়।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই সামরিক বিমান দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত যে ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, তাদের বেশির ভাগই শিশু।
ওই ঘটনার পর বিমানবন্দরের ফ্লাইং অ্যাপ্রোচ জোনে মাত্র এক কিলোমিটারের মধ্যে একটি স্কুলের অবস্থান এবং জনবহুল এলাকায় প্রশিক্ষণ ফ্লাইট চালানোর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিআইপির সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দেশের জনবহুল কোনো এলাকায় প্রশিক্ষণ বিমান ওড়ার কোনো সুযোগ নেই। নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বিমান উড্ডয়নের পথ সবসময় নিরাপদ রাখতে হয়, যে কারণে উন্নত বিশ্বে বিমানবন্দর শহরের থেকে তুলনামূলক দূরত্বে থাকে এবং শহর ও বিমানবন্দরের মাঝে ‘বাফার জোন’ থাকে।
শহর উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিমানের ফ্লাইং অ্যাপ্রোচ জোন বাদ দিয়ে নগরায়ন প্রয়োজন ছিল মন্তব্য করে এই পরিকল্পনাবিদ বলেন, “১৯৯৫ সালের ডিএমডিপি অনুযায়ী বর্তমান মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এলাকা জলাভূমি এলাকা ছিল; যা বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাহলে রাজউক কার স্বার্থে কিংবা কোন উদ্দেশ্যে ডিএমডিপি অনুসরণ না করে ফ্লাইং অ্যাপ্রোচ জোনে শহর উন্নয়নের অনুমোদন দেয়?”
মাইলস্টোনের দুর্ঘটনার ব্যাপারে তিনি বলেন, “তাদের সকল ভবন রাজউক ও বেবিচকের অনুমোদিত কিনা এটি খতিয়ে দেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটির বারান্দা গ্রিল দিয়ে আটকানো ছিল এবং একটি মাত্র প্রবেশ বা বহির্গমন পথ ছিল; যা উদ্ধারকাজকে ব্যহত করে এবং কোমলমতি শিশুদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাড়ায়।”
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক শেখ মেহেদী হাসান বিআইপির পক্ষ থেকে বেশ কিছু প্রস্তাব ও কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন।
>> সরকারের উদ্যোগে দুর্ঘটনা কবলিত এলাকায় এবং ফ্লাইং অ্যাপ্রোচ জোনে ও ফানেলের এলাকার নির্ধারিত সীমানায় অধিক জনসমাগম হয় এমন কি কি স্থাপনা আছে এবং টেকনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট করে সেখানের কোন-কোন ভবনের অনুমোদন নেই, তা নির্ণয় করে যথাযথ ব্যাবস্থা গ্রহণ করা। এ ধরনের কাজে বিআইপি স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী।
>> পরবর্তী কর্মপরিকল্পনায় ঢাকা শহরে পরিকল্পনা সম্পর্কিত যে সকল ব্যত্যায় আছে, তা নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা এবং এর প্রেক্ষিতে কার্যক্রম গ্রহণ করা।
>> যেই ব্যাক্তি ড্যাপ, ডিএমডিপি-এর অনুমোদিত ভূমি ব্যবহারের ব্যত্যয় ঘটিয়ে স্কুল পরিচালনা করছেন, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যাবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়, রাজউকসহ যে সকল প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রণালয়গুলোর দায় আছে, তাদের দায় নিশ্চিত করে ব্যাবস্থা নেওয়া।
>> মহাপরিকল্পনাসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রণয়নে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট মহলের অবৈধ প্রভাব বন্ধ করা এবং বল প্রয়োগকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।
>> পরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে নগর ও উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট সরকারী সংস্থাসমূহে পরিকল্পনাবিদদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা।
>> মহাপরিকল্পনাসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা ও আইনের বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ী, শিল্প কারখানার মালিক, রাজনীতিবিদ, আমলা, স্বার্থসংশ্লিষ্ট পেশাজীবী, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি সংস্থাসমুহের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।
অন্যদের মধ্যে বিআইপির সহ-সভাপতি শাহরিয়ার আমিন, কোষাধ্যক্ষ পরিকল্পনাবিদ মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান এবং বোর্ড সদস্য আবু নাঈম সোহাগ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।