Published : 30 Apr 2026, 05:31 PM
প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক কর্মকর্তা মাঞ্জিল হায়দার চৌধুরী রিমান্ডের মধ্যে চুল কাটা ও দাড়ি কামানোর আবেদন করলেও তা পূরণ না হওয়ায় আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তার আইনজীবী।
এ বিষয়ে পুলিশের বক্তব্যে উষ্মা প্রকাশ করে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলম বলেছেন, মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে ‘সমস্যা কোথায়’? বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও ‘এরকম কষ্ট’ দেওয়া হয়েছিল।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানকে ২০০৭ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় ১৮ মাস কারাগারে কাটানোর সময় তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।
অভিযোগ রয়েছে, ওই সময়ে তাকে ‘নিষ্ঠুর অমানুষিক নির্যাতন’ করা হয়েছিল, এবং ডিজিএফআইয়ের কিছু কর্মকর্তা তাতে জড়িত ছিলেন।
গত ৯ এপ্রিল মহাখালীর ডিওএইচএস এলাকা থেকে মাঞ্জিল হায়দারকে গ্রেপ্তার করা হয়। জুলাই আন্দোলনের সময় ব্যবসায়ী আব্দুল ওয়াদুদ নিহতের ঘটনায় নিউ মার্কেট থানার মামলায় তাকে তিন দফায় ১২ দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ।
পরে ২২ এপ্রিল রমনা মডেল থানার সন্ত্রাস বিরোধী আইনের মামলায় তাকে পাঁচ দিন এবং ২৬ এপ্রিল আরও চার দিনের রিমান্ড পাঠায় আদালত।
দুই দফায় ৯ দিনের রিমান্ড শেষে বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে হাজির করে ৬ কারণ দেখিয়ে পুনরায় সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা রমনা জোনাল টিমের পরিদর্শক মো. আমজাদ হোসেন তালুকদার।
আবেদনে বলা হয়, “আসামি ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত তারিক সিদ্দিকির ঘনিষ্ঠজন হওয়ার সুবাদে ৫ অগাস্টের আগ পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে ভূমিকা রেখেছেন। (অভ্যুত্থানের পর) সরকারবিরোধী কার্যক্রমকে গতিশীল করার জন্য এবং সরকারকে অস্থিতিশীল করা ও অন্তবর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
“তিনি সরকারবিরোধী ষড়ন্ত্রে জড়িত মর্মে তথ্য রয়েছে এবং তার নির্দেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ও তার সকল সহযোগী অঙ্গসংগঠন সরকার উৎখাতের জন্য ব্যানারসহ মিছিল করেছে বলে জানা যায়। এ আসামি নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামীলীগ ও তাহার সকল সহযোগী অঙ্গসংগঠনকে অস্ত্র, গোলা বারুদ, অর্থ ও পরামর্শ প্রদান করেছেন বলে জানা যায়। তার দেওয়া অর্থ ও পরামর্শ গ্রহণকারী পলাতক আসামিদের নাম-ঠিকানা বিষয়ে তিনি আংশিক/অসম্পূর্ণ তথ্য দিয়েছেন।”
পলাতক আসামিদের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা জানতে তাকে আবার রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন বলে যুক্তি দেওয়া হয়েছে আবেদনে।
মাঞ্জিল হায়দারের পক্ষে অ্যাডভোকেট কামাল হোসেন রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিন আবেদন করেন। তিনি বলেন, "২১ বছর তিনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন। ১৭ বছর মেজর পদে। ডিজিএফআইয়ের অ্যাডমিন এবং উইংয়ে ছিল। আসামি যদি অসৎ অফিসার হতেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে চলে যেতেন।
“গত বছরের ১৫ নভেম্বর তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আর মামলার ঘটনা গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর। তখন আসামি ডিজিএফআইয়ে ছিল। তার বিরুদ্ধে এ ধারার অভিযোগ তা যায় না। কারণ ঘটনার সময় আসামি সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিল। তিনি পরিবেশ, পরিস্থিতির শিকার।"
রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, "এ আসামি তারিক সিদ্দিকির ঘনিষ্ঠ সহচর। তার দেওয়া তথ্যে তারিক সিদ্দিকির গাড়ি চালক ও কেয়ারটেকারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মূল ঘটনার সহায়তাকারী হিসেবে তার (মাঞ্জিল হায়দার) নাম এসেছে। এক আগারোর কুশীলব। এক এগারো থেকে ড. ইউনূস সরকার পর্যন্ত যত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তারা জড়িত। ইলিয়াস আলী গুমের সাথে তারা জড়িত এমন তথ্য এসেছে।''
তিনি বলেন, "হাসিনা হুট করে আসমান থেকে ফ্যাসিস্ট হয়নি। তাকে ফ্যাসিস্ট করতে এরা সহায়তা করেছে। তার সর্বোচ্চ রিমান্ডের প্রার্থনা করছি।"
এ সময় বিচারক বলেন, “আসামি তারেক সিদ্দিকের ঘনিষ্ঠ হলে ১৭ বছর কেন মেজর পদে থাকবেন? উনার তো প্রোমোশন হওয়ার কথা।"
জবাবে শামছুদ্দোহা সুমন বলেন, "এটা তাদের ইন্টারনাল পলিটিক্স। তারা তাকে দিয়ে সুবিধা নিত।"
অ্যাডভোকেট কামাল হোসেন এরপর মাঞ্জিল হায়দারের চুল কাটা ও শেভ করার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, "গত ২৬ এপ্রিল তার চুল কাটা ও শেভ করার আবেদন করা হয়। তবে তা করা হয়নি।"
এ সময় তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে বলেন, "এমন কোনো নিয়ম নেই।"
তখন বিচারক বলেন, "চুল কাটা, শেভ করার আদেশও কি কোর্টের দিতে হবে! এগুলো তো বেসিক জিনিস। কী খাবে, টয়লেটে যাবে, এমন আদেশও কি দিতে হবে?"
তখন তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, "এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলব।"
বিচারক তখন বলেন, "মামলা হচ্ছে, রিমান্ড হচ্ছে। এটা করতে প্রবলেম কী? আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও তো এরকম কষ্ট দেওয়া হয়েছিল।"
পরে আদালত মাঞ্জিল হায়দার চৌধুরীকে আরো তিন দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।
মামলার বিবরণে বলা হয়, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের সদস্যরা গত ১২ সেপ্টেম্বর রূপায়ন টাওয়ারের সামনে মিছিল করে। সরকারবিরোধী বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিয়ে তারা তাদের নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কার্যক্রমকে ‘গতিশীল করা, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রের ক্ষতি সাধনের লক্ষ্যে অপপ্রচার’ করছিলেন।
একপর্যায়ে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে আসামিরা পালানোর চেষ্টা করে। এসময় কয়েকজনকে সেখান থেকে আটক করা হয়।
ওই ঘটনায় রমনা মডেল থানায় সন্ত্রাসী বিরোধী আইনে এ মামলা করেন এসআই আওলাদ হোসেন।