যুক্তরাষ্ট্র আর নিষেধাজ্ঞা দেবে না, সেটাও জানি না: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
“আমি প্রশ্ন করেছিলাম, তোমরা স্যাংশন দিয়ে কোন দেশে গণতন্ত্র এনেছ বলতো?”
বাংলাদেশের নির্বাচন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো নিষেধাজ্ঞা দেবে কি দেবে না, সে বিষয়ে ধারণা না থাকার কথা বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।
ব্যবসায়ীদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার খবর এবং নির্বাচনের আগে ‘নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনা নেই’ বলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের বক্তব্য প্রসঙ্গে বৃহস্পতিবার এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমি এসবের কিছুই জানি না। এবং তারা যে দেবে না, সেটাও জানি না।
“তবে, হ্যাঁ ওদের সাথে আমাদের অনেক আলোচনা হচ্ছে। নিয়মিতই ওরা আমাদের সাথে গল্পগুজব করতেছে। কিন্তু এগুলো থেকে আমি বলতে পারব না, স্যাংকশন দেবে, না দেবে।”
বাংলাদেশের আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই সরব যুক্তরাষ্ট্র। গত মে মাসে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন বাংলাদেশের জন্য নতুন ভিসা নীতি ঘোষণা করেন। এ নীতির অধীনে বাংলাদেশের ‘গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য দায়ী’ ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা না দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
এরপর প্রধানমন্ত্রীর নিউ ইয়র্ক সফরের মধ্যেই গত ২২ সেপ্টেম্বর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথু মিলার জানান, সেই ভিসা নীতি আরোপ শুরু করেছে তার দেশ। যাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে ক্ষমতাসীন এবং বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আছেন। এসব ব্যক্তির পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যরাও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অযোগ্য হতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ওই নিষেধাজ্ঞাকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ আখ্যা দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমি প্রশ্ন করেছিলাম, তোমরা স্যাংশন দিয়ে কোন দেশে গণতন্ত্র এনেছ বলতো? তোমাদের এই স্যাংশন, কোথায় তোমরা দিয়েছিলা… নাইজেরিয়ায়, কম্বোডিয়ায়, হাঙ্গেরি, কোথাও কি তোমরা সফল হয়েছ?
“বললো যে, তার কোনো প্রমাণ নাই। সুতরাং, এগুলো অকারণ, এগুলো হচ্ছে উত্তেজনা সৃষ্টি করার চেষ্টা।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, উন্নয়নের মাধ্যমে পৃথিবীর মধ্যে ‘ভালো অবস্থান’ করায়, ভৌগোলিকভাবে ‘কৌশলগত’ অবস্থান এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির কারণে বাংলাদেশ অনেকের ‘চক্ষুশূল’ হয়েছে।
“আর আমরা কোনো দলে নাই। আমরা কারও লেজুড় হতে চাই না। আমরা একটা স্বাধীন, সার্বভৌম ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্র নীতি মেনে চলি। এটা অনেকের চক্ষুশূল।“
বাংলাদেশের কাছে ‘জিনিসপত্র’ বিক্রি নিয়ে আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ‘ঝগড়া’ হচ্ছে মন্তব্য করে এয়ারবাস ও বোয়িংয়ের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রসঙ্গে টানেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ আগে বোয়িং কিনলেও বিমানের বহর ‘বহুমুখী’ করার জন্য এবার এয়ারবাস কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
“আমরা ভাবলাম, এয়ারবাস কিনব। আর যায় কোথায়? আরেক দল আমাদেরকে বলতেছে, হাফ প্রাইসে দেবে বোয়িং। উনারা এখন বলতেছে, হাফ প্রাইসে দেবেন, আগে যে প্রাইসে দিয়েছে। এটা ভালো।”
বোয়িং কেনার সমঝোতা স্মারক থেকে বাংলাদেশ যাতে বের না হয়ে যায়, সে অনুরোধ নিয়ে কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “একাধিক দেশের, যারা বোয়িং তৈরি করে।
“তারা বলছে, আল্লাহর ওয়াস্তে আপনারা এটা থেকে সরে যাবেন না, এই চুক্তিটা রাখেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এই মুহূর্তে আমাদের এত টাকাপয়সা নাই। আপনারা সুযোগ-সুবিধা দেন, তাহলে আমরা এটা দেখব। সুযোগ-সুবিধা মানে সস্তা করেন, কিছু গ্রান্ডট্র্যান্ড দেন। তাহলে আমরা সহজে নিতে পারি।”
আসছেন আফরিন আকতার, এজেন্ডায় নির্বাচন, রোহিঙ্গা সংকট
তিন দিনের সফরে ১৬ অক্টোবর ঢাকায় আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক উপ-সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরিন আক্তার।
তার সফরের এজেন্ডায় প্রধানত নির্বাচন ও রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ থাকার কথা বুধবার জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন।
সফরের আলোচ্যসূচির বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “রোহিঙ্গারা কী অবস্থায় আছে, ওদের যাওয়ার ব্যবস্থা ট্যাবস্থা হচ্ছে কি-না, কিংবা ওদের স্কিল ট্রেইনিং আমরা দিচ্ছি কি-না, ওদেরকে প্রত্যাবাসনের কোনো চিন্তাভাবনা করতেছি কি-না, এসব নিয়ে আমাদের সাথে আলাপ করবেন।”
নির্বাচন নিয়েও আলোচনা হবে জানিয়ে মোমেন বলেন, “আমাদের দেশের ইলেকশন নিয়ে আলোচনা করবেন। এটা অবাধ ও নিরপেক্ষ হওয়া তাদের উদ্দেশ্য।”
তবে সংঘাতমুক্ত নির্বাচন করতে পারার নিশ্চয়তা যে সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে দিতে পারছে না, সে কথাও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন।
“আমরা এ ব্যাপারে তাদেরকে বলেছি যে, আমরা এই এই কাজ করেছি। এবং সংঘাতমুক্ত কি-না, সেটা আমরা বলছি, কোনো গ্যারান্টি আমরা দিতে পারি না।
“সংঘাতমুক্ত হতে হলে সকল দল-মত সবার ঐকান্তিক ইচ্ছা, প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে। তা না হলে সংঘাতমুক্ত হওয়া সম্ভব না। সেটা উনাদেরকে বলেছি।”
বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এসে ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যোগদানসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে ওই বৈঠকের ফাঁকে আফরিন আকতার ও ব্রিটিশ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যান-মেরি ট্রেভেলিয়ানের সঙ্গে নির্বাচন ও মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “তারা স্বভাবতই নির্বাচন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তারা স্বভাবতই মানবাধিকার ইস্যু তুললেন। তো, তাদের আমরা আমাদের বক্তব্য তুলে ধরেছি। স্বচ্ছ নির্বাচন করার জন্য আমরা কী কী পদক্ষেপ নিয়েছি, সেগুলো উনাদের জানিয়েছি।”
মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর আদিলুর রহমান খানের দণ্ডের বিষয়ও তারা তুলেছেন জানিয়ে মোমেন বলেন, “আমি দুজনকেই বললাম, আপনাদের দেশে যদি এ রকম মিথ্যা প্রচার করতেন, আপনারা কি বিচার করতেন না?
“বললেন, অবশ্যই বিচার করতেন। ‘অবশ্যই আমাদের দেশে বিচার করতাম’। অ্যান ম্যারিও বললেন, আক্তারও বললেন।”
