Published : 11 Aug 2025, 09:13 PM
বাংলাদেশ চাইলে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দিতে পারে মনে করছেন তিন বিশেষজ্ঞ।
তাদের মতে, এটি কঠিন কোনো প্রক্রিয়া নয়; বরং অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বেশির ভাগ এলডিসি দেশই এই সুযোগ ব্যবহার করেছে।
সোমবার রাজধানীর প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) সেমিনার কক্ষে এক আলোচনা সভায় তারা এ মত দেন।
‘স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রভাব ও চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামে এ সভা আয়োজন করে মানবাধিকার সংস্থা ‘নাগরিক উদ্যোগ বাংলাদেশ’। কারিগরি সহায়তায় ছিল আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান থার্ড ওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক।
অনুষ্ঠানে এলডিসি ও উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি নিয়ে তিনজন বিশেষজ্ঞ বক্তব্য দেন। তারা হলেন— বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান থার্ড ওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্কের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক সানিয়া রিড স্মিথ ও রঞ্জা সেনগুপ্ত এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মেধাস্বত্ব আইন বিশেষজ্ঞ তাসলিমা জাহান।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি বিশ্লেষক সানিয়া রিড স্মিথ বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় তিনটি ধাপ রয়েছে— জাতিসংঘের ডেভেলপমেন্ট পলিসি কমিটির মূল্যায়ন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) অনুমোদন এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের চূড়ান্ত অনুমোদন। এ তিন ধাপের যেকোনো পর্যায়ে বিলম্বের আবেদন করা সম্ভব এবং অতীতে বহু দেশ এ সুযোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, “অনেক দেশ এলডিসি উত্তরণের সময় পিছিয়েছে; কেউ কেউ দীর্ঘ সময় নিয়েছে। যেমন, ভানুয়াতু প্রায় দেড় দশক পেছাতে সক্ষম হয়েছে। আবার মিয়ানমার ও তিমুরসহ কয়েকটি দেশ জাতিসংঘের কমিটি পর্যায়ে মানদণ্ড পূরণ করেও রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণ দেখিয়ে উত্তরণ বিলম্ব করেছে।”
সানিয়া রিড স্মিথ বলেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উত্তরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল আগের সরকারের সময়ে। পরে দেশি-বিদেশি রাজনীতি ও বাণিজ্যে বড় পরিবর্তন আসে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি গত ২০০ বছরের মধ্যে বৈশ্বিক বাণিজ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এসব পরিবর্তন তখন জানা ছিল না, যা এখন বাংলাদেশের জন্য এলডিসি উত্তরণ বিলম্বের যৌক্তিকতা তৈরি করেছে। ফলে এখন সরকারের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা সময় পেছাতে চান কি না।”
তিনি আরও বলেন, এলডিসি উত্তরণ বিলম্বের প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে শুধু একটি চিঠি পাঠালেই হয়। অনেক দেশ শেষ মুহূর্তেও আবেদন করেছে। যেমন, অ্যাঙ্গোলা নির্ধারিত সময়ের কাছাকাছি এসে আবেদন করে এবং অনুমোদন পায়।
“জাতিসংঘ সাধারণত সদস্য রাষ্ট্রের ইচ্ছাকে সম্মান করে এবং প্রস্তুত নয় বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানালে খুব বিরল ক্ষেত্র ছাড়া সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে না।”
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সুবিধা হারাবে বলেও সতর্ক করে দেন এ বিশেষজ্ঞ।
তিনি বলেন, “এলডিসিতে থাকার কারণে মেধাস্বত্বের বিধিনিষেধ ছাড়াই নতুন ওষুধ উৎপাদন ও রপ্তানি সম্ভব হচ্ছে; কিন্তু উত্তরণের পর এসব ওষুধে পেটেন্ট বাধ্যতামূলক হবে, যা বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারে।
“উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেলেও কোনো বাড়তি আর্থিক সহায়তা পাওয়া যাবে না, বরং শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা ও মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত ছাড় হারাতে হবে।”
আরেক বিশেষজ্ঞ রঞ্জা সেনগুপ্ত বলেন, গত এক দশকে অন্তত নয়টি দেশ এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়েছে। এর মধ্যে কিছু দেশ দুই থেকে তিন বছর, আর কিছু দেশ পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় বাড়িয়েছে।
“উত্তরণ মানে শুধু মাথাপিছু আয়ের মানদণ্ড পূরণ নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্ক সুবিধা হারানোর পর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে কিনা, সেটি বিবেচনা করাও জরুরি। তাই প্রস্তুতি না থাকলে তাড়াহুড়া করে উত্তরণে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।”
বাংলাদেশের জন্য এলডিসি থেকে উত্তরণ একটি ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ মন্তব্য করে রঞ্জা সেনগুপ্ত বলেন, “এ সাফল্য যেন স্থিতিশীল অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি নষ্ট না করে, সে জন্য সময়, পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
তার মতে, যদি বাংলাদেশ প্রমাণ করতে পারে যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, জলবায়ু ঝুঁকি ও বাজার প্রতিযোগিতার কারণে সময় বাড়ানো প্রয়োজন, তাহলে আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়া সম্ভব।
মেধাস্বত্ব আইন বিশেষজ্ঞ তাসলিমা জাহান বলেন, এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ মেধাস্বত্ব (আইপিআর) ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ শিথিলতা বা ছাড় পেয়ে আসছে। কিন্তু এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এসব সুবিধা ধীরে ধীরে সীমিত বা বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আইপিআরের কঠোর বিধিনিষেধ কৃষি, ওষুধসহ বাণিজ্য ও উৎপাদন খাতে প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, “দেশে আইপিআর-সংক্রান্ত অবকাঠামো ও মান এখনও পুরোপুরি শক্তিশালী নয়। তাই এ পরিবর্তনের চাপ আমরা কতটা মোকাবিলা করতে পারব, তা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে।”
উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক সংকেত যাবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সানিয়া রিড স্মিথ বলেন, “ইতিবাচক সংকেত গেলেও সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে না। কারণ, বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের গবেষণায় দেখা গেছে, বিনিয়োগ আসে মূলত বড় বাজার, প্রাকৃতিক সম্পদ, দক্ষ শ্রমশক্তি, উন্নত অবকাঠামো ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর ভিত্তি করে; দেশের ‘লেবেল’ দেখে নয়।”