অষ্টমীর কুমারী পূজায় মাতৃশক্তির বন্দনা

শাস্ত্র মতে, মানববন্দনা, নারীর সম্মান ও মর্যাদার প্রতিষ্ঠা এবং ঈশ্বরের আরাধনাই কুমারী পূজার শিক্ষা।

মেহেরুন নাহার মেঘলাবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 3 Oct 2022, 09:39 AM
Updated : 3 Oct 2022, 09:39 AM

নারীতে ‘পরমার্থ দর্শন ও পরমার্থ অর্জন’-এই বিশ্বাস নিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের অষ্টমী তিথিতে কুমারী রূপে দেবী দুর্গার বন্দনা করলেন বাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা।

তাদের বিশ্বাস, যে ত্রিশক্তিতে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি-স্থিতি ও লয়ের চক্রে আবর্তিত হচ্ছে, সেই শক্তি কুমারীতে বীজ আকারে আছে। এই বিশ্বাসেই সনাতন ধর্মের মানুষ কুমারীকে দেবীদুর্গা হিসেবে আরাধনা করেন অষ্টমীতে। 

সাধক রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বহু বছর আগে নিজের স্ত্রী সারদা দেবীকে মাতৃজ্ঞানে যে পূজা করেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতায় উপমহাদেশের মিশন ও মঠগুলোতে কুমারী পূজা চলে। 

বলা হয়, মানববন্দনা, নারীর সম্মান ও মর্যাদার প্রতিষ্ঠা এবং ঈশ্বরের আরাধনাই কুমারী পূজার শিক্ষা। 

সোমবার ভোর থেকে ঢাকার গোপীবাগে রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠেও কুমারী পূজার আয়োজন শুরু হয়। আয়োজন হয় সারাদেশের অন্যান্য রামকৃষ্ণ মঠেও। পাঁচ দিনের দুর্গোৎসবে সাধারণত রামকৃষ্ণ মিশনগুলোই কুমারী পূজার আয়োজন করে।

মিশন ও মঠগুলোতে সকাল থেকে ঢাকের বাদ্য বেজে চলে বিরামহীনভাবে। সঙ্গে কাসর ঘণ্টা, ভক্তদের শঙ্খের আওয়াজ আর উলুধ্বনিতে মুখরিত হয় পূজা প্রাঙ্গন। সঙ্গে চলে ভক্তি গীতি। এছাড়া দেবী দুর্গার আরাধনায মণ্ডপে মণ্ডপে চলে পূজা আর চণ্ডিপাঠ।

গত দুই বছরে কোভিড মহামারীরর মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষায় কুমারী পূজার আয়োজন করা হয়নি। সোমবার সকালে বৃষ্টির কারণে ভিড় কিছুটা কম থাকলেও কুমারী দুর্গা বন্দনায় ভক্ত দর্শনার্থীর ভিড় বাড়তে থাকে। 

গোপীবাগে রামকৃষ্ণ মিশন মঠে এবার কুমারী পূজা পরিচালনা করেন ব্রহ্মচারী দুর্গাচৈতন্য, তন্ত্রধারী হিসেবে ছিলেন স্বামী স্তবনানন্দ। বেলা ১১টায় শুরু হয় পূজার আয়োজন। 

এ মিশনে এবার কুমারী দেবীর আসনে ছিল ছয় বছর বয়সী দেবদৃতা চক্রবর্তী, তার শ্রাস্ত্রীয় নাম হয়েছে ‘উমা’। 

প্রিয়াংকা চক্রবর্তী ও প্রণয় চক্রবর্তীর মেয়ে দেবদৃতা পড়ছে রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রথম শ্রেণিতে। 

পূজার আগে কুমারীকে স্নান করিয়ে নতুন লাল শাড়ি, গয়না, পায়ে আলতা, ফুলের মালা এবং অলঙ্কারে সাজানো হয় দেবীরূপে। পদ্মফুল হাতে দেবী পূজার আসনে বসার পর মন্ত্রোচ্চারণ আর স্তুতিতে তার বন্দনা করেন পূজারিরা।

পূজা শেষে কুমারী দেবী দেবদৃতা চক্রবর্তী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলে, “আমি আশীর্বাদ করছি, জগতের সকলের কল্যাণ হোক, সকলের মঙ্গল হোক। পৃথিবীর সব দুঃখ দুর্দশা দূর হয়ে যাক।" 

প্রসাদ বিতরণের সময় দেখা যায় পূণ্যার্থীদের দীর্ঘ কিউ। 

রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ বলেন, "মানুষ বিভিন্ন মানবীয়ভাবের অবলম্বনেই ঈশ্বর উপাসনা করতে প্রয়াস পায়। বিভিন্ন মানবীয়ভাবের মধ্যে মাতৃভাবে ঈশ্বরের উপাসনা সনাতন ধর্মে অতি প্রাচীন। 

“এইভাবে উপাসনার মধ্য দিয়ে জগতে বহু সাধক তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছেছেন। সাধকদের একান্ত বিশ্বাস, মাতৃভাবে ঈশ্বরের উপাসনায় চিত্ত দ্রুত শুদ্ধ হয়। কারণ মাতৃভাব সর্বাপেক্ষা শুদ্ধভাব।" 

স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ বলেন, “শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলতেন সব স্ত্রীলোক ভগবতীর এক একটি রূপ। শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর বেশি প্রকাশ।" 

তন্ত্রসার মতে, ১ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত বালিকারা কুমারী পূজার উপযুক্ত; তবে তাদের ঋতুমতি হওয়া চলবে না। সাধারণত ৫ থেকে ৭ বছরের কুমারীকে প্রতিমার পাশে বসিয়ে পূজা করা হয়।“ 

মেরুতন্ত্রে বলা আছে, “সর্বকামনা সিদ্ধির জন্য ব্রাহ্মণকন্যা, যশোলাভের জন্য ক্ষত্রিয় কন্যা, ধনলাভের জন্য বৈশ্য কন্যা ও পুত্র লাভের জন্য শূদ্রকুলজাত কন্যা কুমারী পূজার জন্য যোগ্য।" 

তবে ‘স্বত্ত্বগুণসম্পন্না, শান্ত, পবিত্র, সত্যশীলা’- এসব ‘দৈবী সম্পদের অধিকারিণী’ কুমারীকে দুর্গার প্রতিরূপ হিসেবে গ্রহণের বিধান রয়েছে বলে স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ জানান।

তিনি বলেন, “নারী জাতির প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা সমাজ ও জীবনকে মহৎ করে তোলে, কুমারী পূজা এ শিক্ষাই দেয়।" 

কুমারী পূজার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “কুমারীতে দেবীভাব আরোপ করে ঈশ্বরের আরাধনা করা হয়। এর মাধ্যমে সমগ্র নারীজাতির প্রতি সম্মান জানান হয়। কুমারীপূজা হলো মাতৃভাবে ঈশ্বরের আরাধনার অংশ।" 

শনিবার ষষ্ঠীতে দেবীর বোধনের পর রোববার নবপত্রিকায় প্রবেশ ও স্থাপনের পর শুরু হয়য় মহাসপ্তমীর পূজা। 

সোমবার সকালে কুমারী পূজা শুরুর আগে মহাঅষ্টমীর বিহিত পূজা হয়, বিকাল পৌনে ৫টায় হবে সন্ধিপূজা। 

মঙ্গলবার মহানবমীর সকালেও বিহিত পূজা হবে। বুধবার সকালে দর্পণ বিসর্জনের পর প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।

আরও পড়ুন

Also Read: দুর্গাপূজা: কলাবউ স্নান আর প্রকৃতির বন্দনা মহাসপ্তমীতে

Also Read: ষষ্ঠীতে শুরু দুর্গোৎসব

Also Read: মহাসমারোহে সাজছেন ত্রিনয়নী

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক