১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

খায়রুল হক: ছিলেন শীর্ষ এজলাসে, এখন কাঠগড়ায়

বেশ কিছু আলোচিত মামলার রায় আসে খায়রুল হকের আদালত থেকে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে রায়ের কারণে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।

খায়রুল হক: ছিলেন শীর্ষ এজলাসে, এখন কাঠগড়ায়
সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক।

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 25 Jul 2025, 07:38 AM

Updated : 26 Aug 2026, 01:26 PM

এই প্রথম কোনো সাবেক প্রধান বিচারপতিকে আসামির কাঠগড়ায় দেখল বাংলাদেশ। 

হত্যা মামলার আসামি হয়ে কারাগারে যেতে হল দেশের ঊনবিংশতম প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে।

এর আগে দেশের আর কোনো প্রধান বিচারপতিকে আসামি হয়ে কারাগারে যেতে হয়নি।

দুর্নীতির দায়ে দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার ১১ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে ঠিকই, কিন্তু দেশে না থাকায় তাকে আদালতে দাঁড়াতে হয়নি, জেলেও যেতে হয়নি। 

এই দুই প্রধান বিচারপতিই বিচারাঙ্গনের চূড়ায় বসেছিলেন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে। 

কিন্তু এস কে সিনহার নামে ‘দণ্ডিত অপরাধীর’ তকমা লাগে আওয়ামী লীগের সময়েই, যিনি সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের তোপের মুখে ছুটি নিয়ে বিদেশ পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়েছিলেন। 

খায়রুল হকের প্রেক্ষাপট অবশ্য ভিন্ন। বলা চলে, এস কে সিনহার বিপরীত ভূমিকার কারণে এখন তাকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। 

খায়রুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তার অনেক রায়ের কারণে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ‘গুম, খুন, লুণ্ঠনসহ সব অপকর্মের লাইসেন্স’ পেয়ে গিয়েছিল। 

আওয়ামী লীগের শাসনামলে এক যুগের বেশি সময় দেশের বিচার বিভাগের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন সাবেক এ প্রধান বিচারপতি। 

প্রধান বিচারপতি পদের পর তিন বছরের জন্য তিনি হন আইন কমিশনের প্রধান। কিন্তু দফায় দফায় মেয়াদ বাড়ানোয় আওয়ামী লীগ সরকারের পতন পর্যন্ত কমিশনে থেকে যান তিনি। 

জুলাই আন্দোলনের সময় যুবদলের এক কর্মীকে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এ বি এম খায়রুল হককে বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করা হয়।

জুলাই আন্দোলনের সময় যুবদলের এক কর্মীকে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এ বি এম খায়রুল হককে বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করা হয়।

বিচারাঙ্গনে চার দশক

১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি নেয়ার পর ১৯৭৫ সালে লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে বার অ্যাট ল' করেন খায়রুল হক।

১৯৪৪ সালের ১৮ মে মাদারীপুর জেলার রাজৈর থানায় জন্ম নেয়া খায়রুল হক আইন পেশায় পা রাখেন ১৯৭০ সালে। কাজ শুরুর পর ১৯৭৬ সালে হাই কোর্টে এবং ১৯৮২ সালে আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন তিনি। 

খায়রুল হক হাই কোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান ১৯৯৮ সালের ২৭ এপ্রিল। স্থায়ী হন ২০০০ সালের ২৭ এপ্রিল। 

এরপর ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। পরের বছরের ১ অক্টোবর থেকে ২০১১ সালের ১৭ মে পর্যন্ত বসেন প্রধান বিচারপতির এজলাসে। 

হাই কোর্টে থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা ছাড়াও সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা, স্বাধীনতার ঘোষণা ও ঘোষক সম্পর্কিত মামলা, রেসকোর্স ময়দানে স্বাধীনতার স্মৃতি সংরক্ষণ, ঢাকার চার প্রধান নদী রক্ষা ও ঢাকার ট্যানারি স্থানান্তরের মামলার রায় আসে তার আদালত থেকে।

এরপর আপিল বিভাগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ফতোয়াসহ বিভিন্ন আলোচিত মামলার রায় তার আদালত থেকেই আসে।

তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে রায়ের কারণেই সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েন সাবেক এ প্রধান বিচারপতি।

তার নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ ২০১১ সালের ১০ মে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেয়। তাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবৈধ হয়ে যায়।

এ মামলায় বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হক, বিচারপতি এস কে সিনহা ও সৈয়দ মাহমুদ হোসেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। 

অন্যদিকে বিচারপতি আব্দুল ওয়াহাব মিঞা, নাজমুন আরা সুলতানা ও ঈমান আলী রায় দেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল রাখার পক্ষে।

খায়রুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ‘সরকারের কর্তা-ব্যক্তিদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে’ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে কাস্টিং ভোট দেন।

ফলে রায়টি আপিল বিভাগের বিচারপতিদের চার-তিনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যায়।

আইন কমিশনে এক দশক

এ বি এম খায়রুল হক ২০১১ সালের ১৭ মে পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এরপর ২০১৩ সালের ২৩ জুলাই তাকে তিন বছরের জন্য আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। ওই মেয়াদ শেষে কয়েক দফা পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয়।

আইন কমিশন মূলত বিদ্যমান আইনি সংস্কারের বিষয়ে সরকারকে নানা ধরনের পরামর্শ দিয়ে থাকে।

গুরুত্বপূর্ণ এই সংস্থায় এর আগে দায়িত্ব পালনকারীদের প্রায় সবাই অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি ছিলেন। বিচারপতি এফ কে এম এ মুনেম, বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেন, বিচারপতি মোস্তফা কামাল, বিচারপতি এ টি এম আফজালের মতো ব্যক্তি এ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। 

তবে অন্যদের তুলনায় খায়রুল হক এ পদে বেশি সময় দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান। 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আট দিন পর ১৩ অগাস্ট আইন কমিশন থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। 

যে অভিযোগে কাঠগড়ায়

এখন পর্যন্ত তিনটি মামলা হয়েছে সাবেক এই প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে। এর মধ্যে যে হত্যা মামলায় তাকে কারাগারে যেতে হল, সেটি করা হয় ৬ জুলাই।

জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে যুবদল কর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদকে হত্যার অভিযোগে এ মামলা হয়, যেখানে শেখ হাসিনাসহ আসামি করা হয় ৪৬৭ জনকে। 

এর আগে আরও দুটি মামলায় আসামি করা হয় খায়রুল হককে। দুটি মামলাই হয় গত বছরের অগাস্টে; আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মাসে। 

প্রথম মামলাটি হয় ২৫ অগাস্ট; নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায়। বাদী আব্দুল বারী ভূঁইয়া ফতুল্লা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। 

ওই মামলায় সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় পরিবর্তন ও জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। 

দ্বিতীয় মামলাটি হয় ২৭ অগাস্ট। দুর্নীতি ও রায় জালিয়াতির অভিযোগে মামলাটি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন।

খায়রুল হকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। ‘বিধিবহির্ভূতভাবে প্লট নেওয়ার’একটি অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, “রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক বিধিবহির্ভূতভাবে একটি প্লট গ্রহণ করেছেন- এমন একটি অভিযোগ অনুসন্ধানে নথিপত্র চেয়ে পাঠানো হয়েছে।”

এ অভিযোগ অনুসন্ধানে দুদকের উপপরিচালক মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি অনুসন্ধান দলও গঠন করা হয়েছে। 

ক্ষোভের প্রকাশ

খায়রুল হককে গ্রেপ্তার করায় অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘ধন্যবাদ’ জানিয়েছে একাধিক রাজনৈতিক দল। তারা সাবেক এ প্রধান বিচারপতির ‘দৃষ্টান্তমূলক’ শাস্তির দাবিও তুলেছেন। 

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলছেন, “বিলম্বে হলেও এতদিন পরে তার (এবিএম খায়রুল হক) বিরুদ্ধে যে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, সেজন্য আমি সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

‘‘সঠিকভাবে তার তদন্ত হবে সব বিষয়গুলোর এবং সঠিকভাবে তার বিচার কার্য সম্পন্ন হবে, সেটাই আমরা আশা করি।”

খায়রুল হক দেশের ‘বিশাল ক্ষতি’ করেছেন বলেও মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব। 

তিনি বলেন, “আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাতে চাই যে, বাংলাদেশের একজন বড় শত্রু, যিনি বাংলাদেশের একটা বিশাল ক্ষতি করেছেন একটা বিরাট পদে থেকে।

“তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে ‘শর্ট’ যে রায় দিয়েছিলেন, সেটা এবং পরে পূর্ণাঙ্গ যে রায়, যাতে আকাশ-পাতাল তফাৎ ছিল।”

প্রধান বিচারপতিদের মধ্যে খায়রুল হকই ‘দেশের সবচেয়ে বড় ক্ষতি’ করেছেন বলে মনে করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।

‘অপেক্ষাই রইলাম…’ শিরোনামে নিজের ফেইসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “এবিএম খায়রুল হক ফ্যাসিস্ট আমলে প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে ছিলেন। নাহ, কোনোমতেই তিনি তার দায়িত্বের মর্যাদা উপলব্ধি করেননি এবং আমানত রক্ষা করেননি।

“এ মর্যাদাপূর্ণ চেয়ারে বসে ইতিপূর্বে কেউ দেশ ও জাতির এত বড় ক্ষতি করেনি। তার হঠকারী রায়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক মাফিয়াদের হাতে গুম, খুন, লুণ্ঠনসহ সব অপকর্মের লাইসেন্স ও হাতিয়ার তুলে দেওয়া হয়েছিল।” 

খায়রুল হকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি জয়নুল আবেদীন।

সাবেক প্রধান বিচারপতির গ্রেপ্তারের খবর সামনে আসার পর তিনি বলেন, “এই খায়রুল হকের কারণে বিগত একটি নির্বাচনও সুষ্ঠু হয় নাই। শুধু তাই নয়, এই খায়রুল হকের কারণে আয়নাঘর হয়েছে; এই খায়রুল হকের কারণে হাজার মায়ের কোল খালি হয়েছে; এই খায়রুল হকের কারণে লাখ লাখ অবৈধ মামলা হয়েছে। 

“তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সম্পর্কে কটাক্ষ করেছেন। এই খায়রুল হক এক কাপড়ে খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। এর জন্য খায়রুল হক দায়ী। এই দায় খায়রুল হক এড়াতে পারেন না।”

বিএনপিপন্থি এ আইনজীবী সরকারপ্রধানকে উদ্দেশ করে বলেন, “অনতিবিলম্বে এবং সব কিছুর আগে খায়রুল হকের বিচার এমনভাবে করবেন, যেন জনতা বুঝতে পারে, এ দেশে অবিচার করলে, বিচার বিভাগকে ধ্বংস করলে কী হয়!”

আরও পড়ুন

'হত্যার আসামিহয়ে কারাগারে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক

বিচারপতি খায়রুল হক 'প্লট দুর্নীতিকরেছেনঅনুসন্ধানে দুদক

সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক গ্রেপ্তার