Published : 30 Jun 2026, 10:59 PM
পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে আশুরার তাজিয়া মিছিলের গিয়ে পরিচ্ছন্নতা কর্মী জাকির হোসেনের খুন হওয়ার ঘটনা মেনে নিতে পারছেন না পরিবারের সদস্য আর এলাকাবাসী।
তারা বলছেন, জাকির ছিলেন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, তার আচরণ ছিল শিশুদের মত। কখনো কারো সঙ্গে ‘ঝামেলায় যেতেন না’। যে যখন যে কাজের কথা বলত, হাসিমুখে করে দিতেন। তাকে কেন খুন করা হবে?
মঙ্গলবার কথা হয় জাকিরের পরিবারের সঙ্গে। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে জাকির ছিলেন সবার বড়। আজিমপুর এলাকায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন তিনি। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের লালবাগ এলাকায় ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের অস্থায়ী পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে চাকরি করতেন জাকির। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হলেও এলাকার সবার সঙ্গে তার ছিল ‘ভালো’ সম্পর্ক।
জাকিরের ছোট ভাই মো. শুভ বলেন, “আমার ভাইটা ছিল প্রতিবন্ধী। দুধের বাচ্চার মত তার মন ছিল পরিষ্কার। কী অপরাধ ছিল আমার প্রতিবন্ধী ভাইটার, এভাবে তাকে মেরে ফেলতে হবে?”
গত ২৬ জুন আশুরার দিন বিকালে বাংলাবাজার পি কে রায় সড়কে একটি ভবনের নিচে ৩১ বছর বয়সী জাকির হোসেনকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ স্থানীয়দের সহায়তায় উদ্ধার করে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় নিহতের ভাই শুভ পরদিন সূত্রাপুর থানায় মামলা করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সূত্রাপুর থানার এসআই লোকমান হোসেন বলেন, “এখন পর্যন্ত ৭ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা সবাই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। আসামিদের মধ্যে পাঁচ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। মামলার তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে খুনের আসল রহস্য জানা যাবে। ঘটনায় জড়ি অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
যদিও ২৭ জুন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এক সংবাদ সম্মেলনে জাকির হত্যা রহস্য উদঘাটনের দাবি করেন লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান।
তিনি বলেন, “তাজিয়া মিছিলে থাকা ডুলির (প্রতীকী কাঠামো) রশি ধরাকে কেন্দ্র করে জাকিরের সঙ্গে হামলাকারীদের বাকবিতণ্ডা এবং হাতাহাতি হয়। এক পর্যায়ে হামলাকারীরা ধাওয়া করলে আত্মরক্ষার্থে জাকির পি কে রায় সড়কের ইস্পাহানি ভবনের নিচে আশ্রয় নেন। সেখানেই হামলাকারীরা জাকিরকে ছুরিকাঘাত করে।”
সংবাদ সম্মেলনে ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ভিডিও দেখে তিন কিশোরসহ ৪ জনকে গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি সুইস গিয়ার, একটি চাপাতি, ঘটনার সময় পরনে থাকা জামা উদ্ধার করা হয়।
মামলার বাদী জাকিরের ভাই মো. শুভ বলেন, “আমার ভাইটা কোনো ঝামেলায় ছিল না। সে এমন ছিল, টাকাটাও গুনতে পারত না। যেখানে চাকরি করত, সেখানকার লোক এসে বেতনের টাকা আমার পরিবারের কাছে দিয়ে যেত। এলাকার সবার সাথে ভালো সম্পর্ক ছিল তার।”
ওইদিনের ঘটনা তুলে ধরে শুভ বলেন, “আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। মা এসে বলে তোর ভাইকে খুন করা হয়েছে। পরে খালাত ভাইকে নিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালে গিয়ে ভাইয়ের লাশ শনাক্ত করি। আমার ভাই আগে কখনো এলাকার বাইরে মিছিলে যায়নি। কেউ তাকে পরিকল্পনা করে নিয়ে গেছে কিনা সন্দেহ হচ্ছিল।
“পরে খবর নিয়ে জানতে পারি তার সঙ্গে ত্যানা নামে একজন, তার ভাগ্নি একা ও রানা যায়। তাদের কাছে ঘটনার বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম। তারা বলেছে, এসএস পাইপ দিয়ে একজন বারি মারে। মাগো, বাবাগো বলে চিৎকার করতে থাকে আমার ভাই। দৌড়ে একটা বিল্ডিংয়ের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে যায়। ওই সিঁড়ি দিয়ে নাকি আরও ৩/৪ জন উঠেছে। কাউকে কিছু বলল না। শুধু আমার ভাইকে মেরে ফেলল।”
ডুলির রশি ধরাকে কেন্দ্র করে বাকবিতণ্ডার জেরে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে বলে পুলিশের দাবির বিষয়ে শুভ বলেন, “ওই দিন তো অনেকে ছিল। সিসিটিভি আছে রাস্তার আশে-পাশে, বাসা-বাড়িতে। ওইটা চেক করে দেখুক না রশি ধরা নিয়ে আমার ভাইকে মেরেছে কি না। আমার ভাই তো একা যায়নি। তার সঙ্গে তো আরও তিনজন ছিল; তারাও রশি ধরেছিল। তাহলে তাদের মারল না কেন?
“আমার ভাই রাত ২/৩টা পর্যন্ত কাজ করত। কোনো রাজনৈতিক লোক হোক বা বাইরের কারো এমন কোনো ঘটনা সে হয়তে দেখে ফেলেছিল কি না; যার কারণে তাকে পরিকল্পনা করে হত্যা করা হল?”
জাকির হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে শুভ বলেন, নিরাপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়।
পুরনো খবর
তাজিয়া মিছিলে ‘রশি ধরা নিয়ে বিতণ্ডার’ জেরে জাকিরকে কুপিয়ে হত্যা, গ্রেপ্তার ৪