সপ্তমীর পূজায় বনানীতে ‘জলজ’ দেখতে উপচানো ভিড়
প্রধানমন্ত্রী রোববার রাত ১০টার দিকে মণ্ডপ পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি আয়োজকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং তাদের সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা বলেন।
ঘূর্ণায়মান বিশাল বৃত্তের ভেতর অবিরাম ঝরছে জলের ফোয়ারা, তার ওপারে সাদা শঙ্খের থিম পেছনে রেখে সৌম্য রূপে দাঁড়িয়ে দশভূজা দেবী দুর্গা।
জলা-বাংলার চিরন্তন অনুসঙ্গ হিসেবে উপর থেকে ঝুলছে গ্রামবাংলার বিলুপ্তপ্রায় অসংখ্য মাছ ধরার খাঁচা আর ঝুড়ির মোটিফ। সঙ্গে আছে আলোর ঝলকানি আর পূজার বাদ্যও।
ঢাকার বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কে এ বছর ‘জলজ’ থিমের এই দুর্গাপূজার আয়োজন এবার তুমুল সাড়া ফেলেছে। রোববার সপ্তমীর দ্বিতীয় দিনেও বিকাল থেকে বনানীর এ মণ্ডপে ভিড় জমান শিশু, তরুণ, নারী ও বয়োজ্যেষ্ঠসহ নানা বয়সের মানুষ। তবে রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে বিকাল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মণ্ডপে জনসাধারণের প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়।
রাত ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রী মণ্ডপ পরিদর্শনে আসেন। এ সময় তিনি আয়োজকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং তাদের সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা বলেন।
রাত ১০টা ২৬ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর মণ্ডপ আবার সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
জল ও জীবনকে ঘিরে তৈরি এ মণ্ডপে ঋগ্বেদের নাসদীয় সূক্তে সৃষ্টির পূর্বে সর্বত্র আচ্ছন্ন অসীম জলরাশি কিংবা পুরাণের কারণসমুদ্রের রূপককে শিল্পের ভাষায় তুলে এনেছেন স্থপতি অমিতি কুন্ডু ও শিল্পী-গবেষক পার্থ প্রতিম সাহা।
মণ্ডপের প্রধান আকর্ষণ গতিশীল শিল্পকলা বা ‘কাইনেটিক আর্ট’। সম্মুখভাগে স্থাপিত ২৪ ফুট ব্যাসের একটি বৃত্তাকার কাঠামো অবিরাম ঘুরে চলেছে। সেই ঘূর্ণায়মান কাঠামোর ভেতরের জলপ্রপাতসদৃশ অবিরত জলপর্দা ভেদ করে দেখা মিলবে দেবী দুর্গার সৌম্য প্রতিমা। বৃত্তের ঘূর্ণন ও জলধারার প্রবাহ স্থাপত্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে চলমান দৃশ্যের অভিজ্ঞতা।
মণ্ডপটির বাইরের আবরণে জুড়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পরিবেশবান্ধব লোকজ কারুশিল্প। বাঁশ, বেত, কাঠ, চট ও প্রাকৃতিক তন্তুসহ ৩৬ ধরনের স্বতন্ত্র উপাদান দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে পুরো অবয়ব। চার প্রজাতির বাঁশ ও পাঁচ প্রকার বুননশৈলীর ব্যবহারে তৈরি হয়েছে ঢেউখেলানো বক্ররেখীয় কাঠামো, যা দেখলে মনে হয় থমকে থাকা এক বিশাল জলতরঙ্গ। বহুস্তরীয় এই বিন্যাসে চলমান ঢেউ যেন মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে আছে।
এ তো গেল মণ্ডপের বাইরের দৃশ্য, ভেতরে ঢুকলে আরেক আবহ। ওপরের দিকে চোখ মেললেই দেখা যায়, মাথার ওপর যেন ঝুলছে সারি সারি শ্যাওলা, সঙ্গে মাছ ধরার খলই আর কাদা তোলার ঝুড়ি। ছাদের চাঁদোয়ায় ঝুলছে উপকূলীয় চট্টগ্রাম থেকে সাতক্ষীরা পর্যন্ত অঞ্চলে মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত ১৩ ধরনের বিলুপ্তপ্রায় বাঁশের চাই ও দুয়াইর।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে সন্ধ্যায় মণ্ডপে জনসাধারণের প্রবেশ বন্ধ থাকলেও মানুষের আগ্রহের কমতি ছিল না। বনানীর দুই পাশের রাস্তা জুড়ে হাজার হাজার মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। লাইনে দাঁড়িয়েই ভিতরে ঢোকার অপেক্ষা করছেন অনেকে। কেউ কেউ বাইরে থেকেই উঁকি দিয়ে ভিতরের পরিবেশ বোঝার চেষ্টা করেছেন।
মণ্ডপসজ্জার পাশাপাশি এবার বনানীর পূজার প্রতিমা দর্শনের ব্যবস্থাও বিশেষ নজর কেড়েছে। সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে সুনির্দিষ্ট আলাদা প্রবেশপথ, যা দিয়ে সহজে দূর থেকে প্রতিমা দর্শন করা যাচ্ছে। অন্যদিকে ভিআইপি ও কার্ডধারীদের জন্য রয়েছে সামনে গিয়ে প্রতিমা দর্শনের বিশেষ সুবিধা।
আয়োজকরা বলছেন, ভিড় সামলানো ও দর্শনার্থীদের স্বাভাবিক যাতায়াত নিশ্চিত করতেই এই দুই স্তরের প্রবেশ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ছাড়াই সবাই প্রতিমা দেখতে পারেন।
পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা থেকে বাংলাদেশে পূজা দেখতে এসেছেন অমিত সেন। রোববার সকালে মহাসপ্তমীর দ্বিতীয় দিনের পূজায় অংশ নিয়েছেন। সন্ধ্যায় আরতি ও অনুষ্ঠান উপভোগ করতে আবারও এসেছিলেন তিনি।
পূজা মন্ডপ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এত সুন্দর পূজা দেখার জন্যই কলকাতা থেকে এখানে এসেছি। সত্যি বলতে, এখানে যে এত বড় পরিসরে এমন চমৎকার একটি আয়োজন হয়, তা আগে ভাবতেই পারিনি। এবারই প্রথম এলাম, আর এসে খুব ভালো লাগছে। এখানকার পরিবেশ এক কথায় দারুণ, কোনো ঝামেলা ছাড়াই সবাই মিলে সকালে মহা সপ্তমীর আনন্দ উপভোগ করতে পেরেছি।”
তবে সন্ধ্যায় মণ্ডপের ভিতরে প্রবেশ করতে পারেননি অমিত।
পুরান ঢাকার ওয়ারী থেকে এসেছিলেন দুই বোন আঁখি ও শিমু। সন্ধ্যা ৬টা থেকে দুই ঘণ্টা ধরে মণ্ডপে ঢোকার অপেক্ষায় ছিলেন তারা। দুই বোন বলেন, “ভিআইপি নিরাপত্তার কারণে মণ্ডপে প্রবেশ কিছু সময় বন্ধ রাখা হয়েছে, তাই অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই। নিরাপত্তাজনিত কারণেই তো এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমরাও চাই না এত সুন্দর একটা অনুষ্ঠানে কোনো অপ্রীতিকর বা বিব্রতকর কিছু ঘটুক। কষ্ট হলেও অপেক্ষা করছি, যত রাতেই হোক ভিআইপি গমনাগমন শেষে মণ্ডপ দেখে তবেই বাড়ি ফিরব।”
নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকা থেকে চার বছর বয়সি ছেলেকে নিয়ে মণ্ডপ দেখতে এসেছিলেন জয় সরকার। তিনিও অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষায়। তিনি বলেন, “এই পূজা মণ্ডপ এই বছর খুব আলোচনায়। তাই ছেলেকে নিয়ে দেখতে এলাম। অনেকক্ষণ ধরে ভিতরে প্রবেশের জন্য অপেক্ষা করছি। শুনেছি প্রধানমন্ত্রী আসবেন পরিদর্শনে। এটা শুনে ভালো লাগছে। কষ্ট হলেও অপেক্ষা করছি।”
প্রতিবছরই বনানীর পূজায় আসেন স্থানীয় বাসিন্দা অনন্যা রায়। তিনি বলেন, “বনানী পূজা মণ্ডপের আয়োজনের বিশেষত্ব হল এদের থিম, যা প্রতিবারই একদম ইউনিক হয়। আমার মতে ঢাকার মধ্যে এই মণ্ডপের থিমটা সবচেয়ে আলাদা, আর তাই প্রতি বছরই এখানে আসি। আর এখানে ভিড় অনেক বেশি হয়।”
এবার দেবীর কাছে কী প্রার্থনা করেছেন প্রশ্নে অনন্যা বলেন, “আমরা যেন কোনো বৈষম্যের শিকার না হয়ে নিরাপদে থাকতে পারি। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে শান্তি ফিরে আসুক এবং সবাই যেন শান্তিতে ও নিরাপদে চলাফেরা করতে পারেন।”
গুলশান–বনানী সর্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক বিনয় গোপাল রায় বলেন, “আমাদের এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী আসছেন। সকাল থেকেই ভিড় দেখা যায়। সন্ধ্যার পর প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে আমরা কিছুটা ব্যস্ত আছি, বাইরে দর্শনার্থীদের ও অনেক ভিড়। সাময়িক অসুবিধা হচ্ছে। তবে সেটা সাময়িক।”
সভাপতি অলক সাহা বলেন, “প্রতিদিন পূজা সমাপনান্তে পুষ্পাঞ্জলি ও ভোগ পরিবেশন করা হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যায় অভ্যাগতদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আরতি পরিবেশনা হয়, আর রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত থাকে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।”
